kalerkantho

শনিবার । ৮ মাঘ ১৪২৮। ২২ জানুয়ারি ২০২২। ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

নামটা আছে, গ্রামটা নেই

জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলায় গ্লাসগোতে চলমান কপ-২৬ সম্মেলনের খবর রাখেন না খুলনার দাকোপ উপজেলার ঝুলন্তপাড়ার বাসিন্দারা। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কঠিন শব্দও বোঝে না এখানকার বয়সী মানুষগুলো। তাঁদের ছোটবেলায় এত ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনও দেখেননি। ক্রমাগত বসতভিটা বদলাতে বদলাতে ক্লান্ত তারা। পুরো গ্রামটাই এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। দেখতে গিয়েছিলেন গৌরাঙ্গ নন্দী

২ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নামটা আছে, গ্রামটা নেই

চারদিক পানিতে ঘেরা। কাঁচা রাস্তার দুই পাশের এই ঘরগুলোই টিকিয়ে রেখেছে ঝুলন্তপাড়ার অস্তিত্ব। কয়েক মাস আগে জোয়ারের সময় তোলা। ছবি : জাকির হোসেন চৌধুরী

জামালউদ্দিন গাজী। সত্তরের কাছাকাছি বয়স। পরনে সাদা পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি, মাথায় টুপি। জানতে চাইলাম, চাচা, আপনার বাড়ি কোথায়? হতাশার সুরে বললেন, ‘আমার আর বাড়ি!’ আসুন, বলে তিনি আহবান জানালেন।

বিজ্ঞাপন

তাঁকে অনুসরণ করি। সরু রাস্তা। তার দুই পাশে ছোট ছোট ঘর। ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে বাঁশ বা কাঠের খুঁটির ওপর। রাস্তাটি সরলরেখার মতো এগিয়েছে একেবারে নদী পর্যন্ত। আর বাড়িগুলোও রাস্তার দুই পাশে একইভাবে এগিয়েছে। কিছুটা এগোলে হাতের ডানে একটি ঘরে তিনি নিয়ে যান। ঘরটিতে একচিলতে বারান্দার মতো জায়গা। সেখানেই বসে কথার খই ফোটালেন জামাল। এই কালাবগি গ্রামেই তাঁর জন্ম। তখন শিবসা নদ ছিল মাইলখানেক পশ্চিমে। পূর্ব দিকের নদীটিও ছোট ছিল তখন। এটি মূলত নদীখাত, যাকে খাড়িও বলে। নদী পেরিয়ে তাঁর বাবা সুন্দরবনে যেতেন। একদিন বাঘ হামলে পড়ে। মারা যান তিনি। তার পর থেকেই জামালের কষ্টের জীবন। নদীতে মাছ ধরেছেন, সুন্দরবনে গোলপাতা, কাঠও কেটেছেন। এখন শরীর সায় দেয় না। চার ছেলে। তারাই মাছ ধরে সংসার চালায়। নদীর ভাঙন আগেও দেখেছেন। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় তাঁদের বসতি একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তার পর থেকে ভাঙনও বেড়েছে। শিবসা তাঁদের ভিটামাটি গিলে খেয়েছে।

 

ঝুলন্তপাড়ার বাসিন্দারা

খুলনা শহর থেকে দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের কালাবগির দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। ভাঙতে ভাঙতে কালাবগির নদীতীরের পাড়াগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মানুষগুলো এলাকা ছাড়ছে। এখনো পর্যন্ত জামালউদ্দিনের মতো কিছু মানুষ অনন্যোপায় হয়ে টিকে আছেন। ক্ষণে ক্ষণে তাঁরা শিবসার গর্জন শোনেন। একটু একটু করে মাটি খসে যেতে দেখেন। চেষ্টা করেন ঘরের খুঁটি মজবুত রাখার। একসময় সেই খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আবার কিছুটা দূরত্বে নতুন করে ঘর বাঁধেন। ঝুলন্তপাড়ার বসতি এখন আগেকার রাস্তা বরাবর। রাস্তাটুকুই যা উঁচু। ওটাই চলাচলের পথ। আর দুই ধারে খুঁটির ওপর বসতঘর।  

জামাল গাজী জানান, এখানকার গাজী বংশটি অনেক বড়, অনেক পরিবারের বাস ছিল। ২০০৯ সালের পর থেকে ভাঙনে বাড়িঘর গ্রাম বিলীন হওয়ায় এই বংশের লোকরা নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। কেউ কেউ গেছে চালনায় (দাকোপ উপজেলা সদর), কেউ গেছে খুলনায়, কেউ অন্যত্র। নতুন কোথাও গিয়ে কাজ জোগাড় করা এবং বসতি গড়ে তোলা অনেক ঝক্কি, টাকারও দরকার। যাদের সামর্থ্য আছে তারা চলে গেছে। যাদের নেই তারা রয়ে গেছে। জামাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার সময় এলেন ঠাকুরদাশ মণ্ডল। তাঁর কণ্ঠে একই সুর। প্রশ্ন ছুড়ে আবার নিজেই উত্তর দেন। ‘থাকার জায়গা, শোয়ার জায়গা, খাওয়ার পানি কিচ্ছু নাই, তবু কেন এখানে পড়ে আছি? আছি, কারণ আমাদের কোনো উপায় নেই। নদীতে চিংড়ি পোনা ধরি, কাঁকড়া ধরি, বিক্রি করে যা পাই তা দিয়ে কোনরকমে চলি। কোথায় যাব? সেখানে গিয়ে কী করব?’

রাস্তার ডান দিকে একটি ঘর তৈরি করতে দেখা গেল দুজনকে। স্বামী-স্ত্রী। পুরুষ মানুষটি হাত চারেক দূরে রাস্তার বাঁ দিকের ঘরটি দেখিয়ে বলেন, ‘ওটা একেবারে নদীর পাশে পড়েছে। নদীর ভাঙনে ঘরটিও ভেসে যাবে। তাই সরিয়ে এ পাশে করছি। ’ ভাঙন কি এ ঘর পর্যন্ত আসবে না? এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ভাঙন তো আসবে। এ পর্যন্ত কতবার ঘর পাল্টালাম, তার হিসাব নেই। ’ হাতের ইশারায় নদীর দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘আমাদের বাড়ি ছিল ওইখানে, নদী ছিল আরো দূরে। ভাঙতে ভাঙতে এই দিকে সরে এসেছে। ’

 

সমস্যার অন্ত নেই

একসময় এক হাজারেরও বেশি পরিবারের বাস ছিল যেখানে, এখন সেখানে শ দেড়েক পরিবার থাকে। আগে যেটি গ্রামে যাওয়ার রাস্তা ছিল, এখন সেই রাস্তার দুই পাশেই তাদের বসতি। নদীভাঙনের প্রকোপ, নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ঝুলন্তপাড়ার মানুষের সমস্যার অন্ত নেই। সরকার বা বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে কিছু সাহায্য তাঁরা পেয়ে থাকেন, তা ওই দুর্যোগের সময়ে। পরবর্তী সময়ে দু-একটা এনজিও এসে পানি রাখার জন্য প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়েছে; কিন্তু তা সবার ভাগে জোটেনি। ফলে এখনো অনেকেই প্রথাগতভাবে সেই মাটির মাইটে (মাটির তৈরি বড় পাত্র) বৃষ্টির পানি ধরে রেখে পান করেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘ঝুলন্তপাড়া হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ফলের বাস্তব রূপ। উপকূলে আগেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতো। তবে তা এখন কয়েক গুণ বেড়েছে। নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। মানুষ তার সহায়-সম্পদ হারাচ্ছে। বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এর মূল কারণ, উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন গ্যাস নিঃসরণ। ধনী দেশগুলোর কারণে আমাদের উপকূলে কত যে ঝুলন্তপাড়া তৈরি হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। ’

কপ-২৬ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর দুর্দশার কথা আমাদের প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন। উন্নত দেশগুলো ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য যে তহবিল গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিল, তাও হয়তো আলোচনায় আসবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রবল। সেটা না হলে জামালউদ্দিন গাজী কিংবা ঠাকুরদাশ মণ্ডলদের মতো আরো অনেকেই জলবায়ূ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবেন। উন্নত বিশ্বের অপরিণামদর্শী আচরণের কুফলে ভুগতে হবে বিশ্বের আরো অনেক মানুষকে।



সাতদিনের সেরা