kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

[ সরেজমিন ]

ব্যাটের গ্রাম

ক্রিকেটকে বলা হয় ব্যাট-বলের লড়াই। সেই ব্যাট তৈরিতে সুনাম কুড়িয়েছে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলা থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের বিন্না গ্রাম। বেলুয়া নদীর পারের গ্রামটি দেখতে গিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম

২৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্যাটের গ্রাম

বিন্না গ্রামের পরিচিত দৃশ্য। ছবি : লেখক

কাঁচা রাস্তা, মাঝখানে খাল। এপার-ওপার জোড়া লাগিয়েছে কাঠের সেতু। গ্রামের সব ঘরে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। আধুনিকতার ছোঁয়াও লাগেনি সেভাবে। কিন্তু জেনে অবাক হলাম, প্রায় তিন যুগের বেশি সময় ধরে ক্রিকেটের ব্যাট তৈরি হচ্ছে এই গ্রামে। বেশির ভাগ বাড়িতে বসতঘরের অদূরে ব্যাটের কারখানা। কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রবেশ করলাম বিন্না গ্রামে। পথের দুই পাশে বিভিন্ন আকৃতির কাঠের স্তূপ। একটি-দুটি নয়, হাজার হাজার। আমাদের পাশ ঘেঁষেই যাচ্ছিলেন মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। কথায় কথায় জানা গেল তাঁর নাম সাইফুল ইসলাম। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে ব্যাট তৈরি করছেন তিনি। এই কাঠগুলো দিয়ে ব্যাট তৈরি হবে। আমড়া, কদম, ডুমুর আর ছাতিম কাঠ দিয়েই ব্যাট তৈরি হয়। সাতটি সাইজে বিভিন্ন স্তরে তৈরি হয় ব্যাট। সাইফুল বললেন, প্রথমে সমিলে সাইজমতো গাছ কেটে ব্যাটের মূল অংশটি তৈরি করা হয়। আর তিনটি অংশ একত্র করে তৈরি হয় ব্যাটের হাতল। পরে মূল অংশের ত্রিকোণ আকৃতির মাঝে হাতল লাগানো হয়। এরপর চলে ফিনিশিংয়ের কাজ। এভাবে ব্যাট তৈরি করে পাঠানো হয় ঢাকায়। আবদুল লতিফের বয়স ষাটের কোঠায়। ১৯৮৮ সালে বিন্না গ্রামে তিনিই প্রথম তাঁর বাড়িতে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন। বিন্না গ্রামটি এখন ব্যাটের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কথা হলো আবদুল লতিফের সঙ্গেও। জানালেন, এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কাঠের বাজার এ উপজেলায়। প্রচুর গাছগাছালি থাকায় কাঠ সহজলভ্য, শ্রমমূল্যও কম। ফলে এখানেই প্রসার ঘটেছে ব্যাট কারখানার। বিন্নাকে অনুসরণ করে কারখানাগুলো একে একে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের চামী, ডুবি, আদর্শ, বয়া, পঞ্চবেকী ও আউরবুনিয়া গ্রামে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে ব্যাট কিনে নিয়ে যান। এসব কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন কিশোর, তরুণ ও বাড়ির নারীরা। অনেক পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য এখন ব্যাট তৈরিকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন।

কয়েক বাড়ি পরেই শফিক গাজীর ব্যাট তৈরির কারখানা। শফিক গাজী বললেন, কারখানায় ফিনিশিংয়ের পর ব্যাটগুলো চলে যায় রাজধানী ঢাকায়। সেখানে কম্পানিগুলো নিজেদের স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করে ব্যাটগুলো। ১৫ ইঞ্চি, ২৪ ইঞ্চি, ৩০ ইঞ্চি, ৩৪ ইঞ্চিসহ বিভিন্ন সাইজের ব্যাট তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় ব্যাট তাঁরা ঢাকায় ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করেন। আমাদের পরের গন্তব্য নিলুফার ইয়াসমিনের বাড়ি। আবদুল লতিফ শুরু করলেও গ্রামে ব্যাটের কারখানার প্রসার ঘটিয়েছেন নিলুফার। এলাকার সবাই এক নামে চেনে তাঁকে। তখন দুপুর। গরুর জন্য শুকনা খড় নিয়ে খামারে ঢুকছিলেন নিলুফার। খামারের সামনেই কিছু ব্যাট হেলান দিয়ে রেখেছেন শুকানোর জন্য। আমাদের দেখে অনেকটা আফসোস ঝরে পড়ল নিলুফারের কণ্ঠে, ‘একসময় রমরমা অবস্থা ছিল। করোনা আমাদের পথে বসিয়েছে।’ তাঁর স্বামী কালাম হোসেন ঢাকার জুরাইনে ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রি করতেন। কিন্তু স্বামীর উপার্জনে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। তাই ভাবলেন, নিজেই কিছু করবেন। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যাট তৈরির কাজ শুরু করলেন। তিনি বাড়িতে ব্যাট তৈরি করতেন আর সেই ব্যাটগুলো ঢাকায় বিক্রি করতেন কালাম। এটা ২০০৫ সালের কথা। তখন নিলুফারের কারখানায় কাজ করতেন নারী-পুরুষ মিলিয়ে ২০ জন। প্রতি মাসে গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার ব্যাট তৈরি হতো নিলুফারের কারখানায়। তাঁর দেখাদেখি শুধু বিন্না গ্রামেই গড়ে উঠেছিল অর্ধশত কারখানা। কথার এক পর্যায়ে বললেন, ‘এসব কারখানার মালিকরা একসময় আমার কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।’ নিলুফারের সঙ্গে আলাপকালেই আবুল হোসেন, খায়রুল বাশারসহ আরো কয়েকজন কারখানার মালিক এলেন। তাঁদের কণ্ঠেও সেই একই আফসোস। জানালেন, করোনাকালে অনেক ব্যাট তৈরি করেছিলেন; কিন্তু সেগুলো বিক্রি করতে পারেননি। খায়রুল বাশার বলছিলেন, ‘করোনার শুরুর দিকে কিছু ব্যাট ঢাকায় পাঠিয়েছিলাম। দোকান মালিক সেই ব্যাট বিক্রি করতে না পারায় টাকা দেয়নি। দুই বছরে অনেক লোকসান গুনতে হয়েছে।’ নিলুফারের স্বামী আবুল কালাম বললেন, অনেক কারখানা আছে এই গ্রামে। সম্ভাবনাও আছে অনেক। তবে নেই কোনো বাস্তব পরিকল্পনা। সরকার চাইলেই কারখানার মালিকদের প্রণোদনা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারে।



সাতদিনের সেরা