kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

[ মহা পৃথিবী ]

সাতরঙা লেক

আকারে ছোট হলেও সৌন্দর্যে লেক বাকালা অতুলনীয়। এখানকার এক পানিতে দেখা মেলে সাতটি ভিন্ন রঙের! সেই সঙ্গে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো প্রাণের উপস্থিতি! তবে সেসব এখন পড়েছে হুমকির মুখে। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাতরঙা লেক

২০১৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। ৭.১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল মেক্সিকোর পুয়েবলা শহর। সেই ধ্বংসযজ্ঞের একজন সাক্ষী ক্লদিও দেল ভ্যালে। কোনোভাবেই বের হতে পারছিলেন না দুঃসহ স্মৃতি থেকে। শেষে শরণাপন্ন হলেন এক মনোবিজ্ঞানীর। তিনি পরামর্শ দেন লেক বাকালায় গিয়ে কিছুদিন থাকার। সে মোতাবেক ক্লদিও গেলেন তো গেলেন, আর ফিরলেন না সেখান থেকে। কেউ জানতে চাইলে বলেন, ‘এটা তো পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ! এখান থেকে আর কোথায় যাব!’ ক্লদিও একটুও বাড়িয়ে বলেননি। অনিন্দ্যসুন্দর লেকটার অবস্থান মেক্সিকোর দক্ষিণ-পূর্বে। বেলিজের সীমান্তের কাছে। বিছিয়ে আছে সুতার মতো। ৪২ কিলোমিটার লম্বা। তবে চওড়ায় কম। সবচেয়ে প্রশস্ত জায়গাটাও দুই কিলোমিটারের কম। গভীরতাও অল্প। তবে সৌন্দর্যে জুড়ি নেই। এখানে দেখা মেলে সাত রঙের পানির—হালকা ফিরোজা থেকে শুরু করে গাঢ় কোবাল্ট নীল পর্যন্ত। এর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে থেকে গেছেন ক্লদিও। বলেন, ‘এখানে প্রকৃতি অনন্য, সৌম্য, সুন্দর! পানি পরিষ্কার আর স্বচ্ছ! তার রঙে এত বৈচিত্র্য! বছরের পর বছর ধরে আমি এখানে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখছি। অথচ প্রতিবারই সব কিছু নতুন মনে হয়।’ সৌন্দর্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এখানকার জীববৈচিত্র্য। এখনো আছে অসংখ্য স্ট্রোমাটোলাইটস। দেখে মনে হয় দৈত্যাকার কতগুলো ফুলকপি। ‘আসলে এগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বয়সের জীবিত জীবাশ্ম বা ফসিল। এমনকি ডাইনোসরদের চেয়েও পুরনো! বয়স প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি বছর’, বলেন মেক্সিকোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাণু-বাস্তুবিদ্যাবিশারদ ড. লুইজা ফ্যালকন। স্ট্রোমাটোলাইটসকে এমনিতে দেখলে মনে হয় পাথর। আসলে একেকটা সায়ানোব্যাকটেরিয়ার ঢিবি। পানির এই ব্যাকটেরিয়া পৃথিবীতে আছে বহু আগে থেকে। গাছের মতো এরাও সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের খাবার তৈরি করতে পারে। সে জন্য প্রয়োজন হয় সূর্যের আলোর। সে কারণেই এরা ওপরের দিকে বাড়তে থাকে। পুরনো স্তরের ওপর তৈরি হয় সায়ানোব্যাকটেরিয়ার নতুন স্তর। এভাবেই মিলিমিটার করে বাড়তে থাকে স্ট্রোমাটোলাইটস। শুধু খাবার বানানোতেই নয়, গাছের সঙ্গে আরো একটা মিল আছে এগুলোর। পরিশুদ্ধ করে বাতাস। কার্বন ডাই-অক্সাইডের কার্বন নিয়ে জমা করে রাখে লেকের তলদেশের চুনাপাথরের স্তরে। এই স্তরটা স্ট্রোমাটোলাইটসের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার নিচে লুকিয়ে আছে লেক বাকালার আরেক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এর পানির উৎস ভূগর্ভস্থ নদী। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে ৪০০ কিলোমিটার গভীরে। আসলে অঞ্চলটা ইউকাতান উপদ্বীপের অংশ, যেখানে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক পানির গুহা ও টানেলের জাল। এই পানির উৎস যেমন লেক বাকালার প্রাণ, তেমনি বিপর্যয়ও আসছে সে পথেই। এর মাধ্যমে লেকটা আশপাশের সব পানির ধারার সঙ্গে যুক্ত। ফলে পানি আসে কৃষিজমি থেকেও। বিশেষ করে বর্ষাকালে। সঙ্গে আসে পলি, কীটনাশক ও সার। তাই বছর বছর বেড়ে যাচ্ছে নাইট্রোজেন ও অ্যামোনিয়ার মাত্রা। সেই সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত পর্যটন। ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একেক মৌসুমে এক লাখেরও বেশি পর্যটক আসেন এখানে। কিন্তু পরিবেশের সুরক্ষার জন্য নেই সেই মোতাবেক প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা’, বলেন ক্লদিও। অবশ্য ২০১৫ সালে মেক্সিকো সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা হয়েছে দূষণ সতর্কতা। লেক বাকালার প্রকৃতি সংরক্ষণ কাউন্সিলের সদস্য সিলভানা ইবারা বলেন, ‘বিশেষ করে সতর্ক করা প্রয়োজন পর্যটকদের, যেন তাঁরা কোনোভাবেই স্ট্রোমাটোলাইটস স্পর্শ না করেন। খালি পায়ে ঘোরেন। সানস্ক্রিন বা মেকআপ ব্যবহার না করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যতটা সম্ভব কম বর্জ্য ফেলা।’ দায়িত্ব আছে স্থানীয়দেরও। সে কথা বলেন ক্লদিও, ‘এখানে ঘরে ঘরে যন্ত্রচালিত নৌকা আছে। চেষ্টা করছি সবাইকে সাধারণ নৌকা ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে, দূরে যাওয়ার জন্য পেডাল নৌকা ব্যবহার করতে।’ তাঁর সেই চেষ্টায় এখনো খুব বেশি কাজ হয়নি। তবে তিনি আশাবাদী, ‘মাঝখানে তো লেকের পানি তার বিখ্যাত রংটাই হারিয়ে ফেলতে বসেছিল। গত কয়েক বছরে সেটার উন্নতি হয়েছে। আমিও তো একসময় জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। এই লেকটাই আমাকে নতুন করে বাঁচিয়েছে। নিশ্চয়ই সামনে সেই সময়ও আসবে, যখন মানুষই এই লেকটাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলবে।’           তথ্যসূত্র : বিবিসি ট্রাভেল



সাতদিনের সেরা