kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

আপার কথা জানুক লোকে

সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ডস ২০২১ জিতেছেন বাংলাদেশি আলোকচিত্রী ফরিদা আলম। ‘মাই সিস্টার অ্যান্ড আই’ শিরোনামের প্রামাণ্যচিত্রের জন্য জেনারেল ভিডিও ক্যাটাগরিতে এই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। প্রামাণ্যচিত্রটির পেছনে রয়েছে তাঁর ক্যান্সার আক্রান্ত বোনের করুণ গল্প। সে গল্পই বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

২৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আপার কথা জানুক লোকে

দীপালি ইয়াসমিন, ছবি : ফরিদা আলম

দীপালি ইয়াসমিন। আমার চাচাতো বোন। ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি। খুব স্নেহ করতেন আমাকে। মাঝখানে দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না। ২০১৮ সালে এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে জানলাম, আপা অসুস্থ। তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। নম্বর জোগাড় করে ফোন দিলাম। ‘আমার ক্যান্সার!’—বলেই আপা চুপ। বুঝতে পারছিলাম ফোনের ওপাশে নীরবে চোখের জল ফেলছেন।

 

এত দিন পরে এলি?

মোহাম্মদপুরের শেখেরটেকে আপার বাসা। ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর। আপার বাসায় গিয়ে যা দেখলাম, সেটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। প্রথমে তো তাঁকে চিনতেই পারিনি। খুব সুশ্রী ছিলেন। পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। সেই প্রাণোচ্ছল মানুষ বিছানায় শুয়ে আছেন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন আমাকে দেখে। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জল—‘এত দিন পরে এলি?’ জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। কথায় কথায় জানলাম, স্তন ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। এরই মধ্যে আট বছর পার হয়ে গেছে। আগে বুঝতে পারেননি।

 

প্রথমে লজ্জায় কাউকে বলেননি

আপার হাজব্যান্ড দেশের বাইরে থাকতেন। দুটি ছেলে। বড় ছেলের বয়স ১৪ বছর, আর ছোটটার আট। যা হোক, বিয়ের বেশ কয়েক বছর পর হঠাৎ স্তনে একটা অস্বাভাবিকতা টের পান। প্রথমে খুব একটা পাত্তা না দিলেও একসময় চিন্তিত হন। কিন্তু লজ্জায় কাউকে বলতেও পারছিলেন না। পরে এক আত্মীয়কে বললেন। কিছুদিন পর চিকিৎসকের কাছে গেলেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানালেন, একেবারে লাস্ট স্টেজে এসেছেন। দুটি স্তনেই ক্যান্সার ছড়িয়েছে। বাঁচতে হলে একটা কেটে ফেলতেই হবে। তারপর আর দেরি করেননি। জানতে চাইলাম, ‘এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কি সহজ ছিল?’ ‘আমি যে মা, একটা মেয়ে, তার চিহ্ন আমার ব্রেস্ট। কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না আমার শরীরের একটা অংশ কেটে ফেলতে হবে। একা একা কাঁদতাম। চিকিৎসক অনেক বোঝালেন। একসময় শক্ত হলাম। তবে অপারেশনের পর আবার ভেঙে পড়লাম। তখন কাউন্সেলিং করেছি।’

আপার মনে কথার পাহাড়। আমাকে পেয়ে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন। অনেক গল্পের পর সেদিনের মতো বাসায় ফিরলাম।

 

তোমার কি সময় হবে?

এক দিন পর ফোন দিলেন। মুঠোফোনের ওপাশে দীর্ঘশ্বাস—তুমি কি আরেকবার আমার বাসায় আসবা? বললাম, যাব আপা। এর পর থেকে সময় পেলেই আপার কাছে হাজির হতাম। একদিন আমার বাসায় দাওয়াত দিলাম। এলেন। দিনভর ছিলেন। বললেন, ‘তোমার বাসা ভালো লেগেছে।’ এভাবে মাসখানেক গেল। হঠাৎ একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি করো কী?’ বললাম, ‘ছবি তুলি। দীপালি আপা নিজের ছবি তুলতে খুব পছন্দ করতেন। বললাম, আপা তুমি তো ছবি তুলতে খুব পছন্দ করতে। আমি তোমার ছবি তুলে দেব।’ বললেন, ‘এখন আর ইচ্ছে করে না।’ আরেক দিন বললেন, ‘তুমি ছবি কেন তোলো?’ বললাম, ‘ক্যামেরায় জীবনের গল্প বলতে ভালো লাগে, তাই।’ পরে আমার করা বেদে কমিউনিটির কাজগুলো দেখালাম তাঁকে। দেখে খুব মজা পেলেন। বললেন, ‘কাজটা করো কেন? এটা তোমার বিজনেস?’ বললাম, ‘না আপা, শখে করি। আমি গল্প বানাই। গল্প বলি।’ বললেন, ‘তাহলে তুমি আমার কাজটা করো না। আমার গল্পটা বলো না মানুষকে।’ প্রথমে বুঝতে পারিনি উনি কী বলতে চাইছেন। বললাম, ‘তোমাকে নিয়ে কী গল্প বানাব?’ ‘আমি যে এত কষ্টে আছি, তার পরও বাঁচতে খুব সাধ জাগে। আগে যদি জানতাম, তাহলে হয়তো এই দশা হতো না আমার। এই গল্পটা তুমি সবাইকে জানাও। আমি চাই না আর কোনো মেয়ের এই অবস্থা হোক।’ কথাটা মনে ধরল।

 

এক বছরের আনন্দ-বেদনা

তখন থেকে আপার যাপিত জীবনের ছবি তোলা এবং ভিডিও ধারণ শুরু করলাম। এ জন্য প্রায়ই তাঁর বাসায় যেতে হতো। সেখানে গেলে খুব কষ্ট লাগত। আপা হাসিমুখে রিসিভ করতেন। কিন্তু ফেরার সময় কান্না জুড়ে দিতেন! আমার জন্য রান্না করার চেষ্টা করতেন; যদিও পারতেন না। তাঁকে নিয়ে হাসপাতালেও গেছি অনেকবার। শেষের দিকে তো সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে পাঁচ দিন তাঁর বাসায় যেতাম। এক বছরের মতো এভাবে কেটেছে। একটা সময় দেখা গেল, আমিও আপার জীবনের অংশ হয়ে গেছি। সকালে হয় আমি, না হয় আপা ফোন দিতেন। বলতেন, ‘জানো, প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় মনে হয় হয়তো কালকের সকালটা আর দেখব না!’ মিরপুরে ডেল্টা হসপিটালে আপার চিকিৎসক পারভীন বানুর সঙ্গেও কথা বললাম। আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন তিনি। বললেন, ‘এত দিন এই মানুষটা একা একা আসত। ভালো হয়েছে আপনি এসেছেন।’

 

বাঁচার বড় সাধ ছিল আপার

ব্রেস্ট রিমুভের এক বছর পর হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন আপা। চেকআপের পর চিকিৎসক জানালেন, মস্তিষ্কে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে। খুব দ্রুত অপারেশন করতে হবে। তবে অপারেশনটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপা অপারেশনটা করিয়েছেন। জ্ঞান ফিরলে প্রথমেই তিনি হাত-পা নাড়াচাড়া করে দেখেছেন সব ঠিক আছে কি না। শেষের দিকে তাঁকে কেমো দেওয়া বন্ধ করে দিতে বলেছিলেন ডাক্তার। কারণ তাতে আপার অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। কিন্তু আপা বললেন, ‘কেমো দিলে তো আমি বেঁচেও যেতে পারি। আরেকবার চেষ্টা করে দেখি না।’ এটা আপার চলে যাওয়ার তিন মাস আগের ঘটনা। শেষের দিকে আপা গুছিয়ে বলতে পারতেন না। কিন্তু চাইতেন তাঁর কথাগুলো মানুষ জানুক। সময় সময় নানা কথা অল্প অল্প বলতেন। আঙুলের কর গুনে গুনে কথা বলতেন। যদি বলতাম, তোমার হাজব্যান্ড কতদিন ধরে বিদেশে? বলতেন—‘এক, দুই, আট, পাঁচ, ছয়, তিন, তারপর জানি কী?’ তাঁর বাসায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি। কারণ তাঁর অগোছাল কথাগুলো যেন অনুধাবন করতে পারি, বুঝতে পারি। তাঁকে হাতিরঝিলে বেড়াতে নিয়ে গেছি। চটপটি খেতে পছন্দ করতেন। খাইয়েছি। ঈদের সময় শপিং মলে নিয়ে গেছি। শেষের দিকে একদিন চায়নিজ খেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণের আর সময় দেননি।

 

আয়নায় ভয়

প্রথম দিকে খুব গুছিয়ে তাঁর হাজব্যান্ডের কথা বলার চেষ্টা করতেন। হাজব্যান্ডের সঙ্গে খুব ভালো রিলেশন, তিনি খুব সুখী ইত্যাদি। বলতেন, ‘তোমার ভাইয়া তো নিয়মিত ফোন করে। খুব আন্তরিক।’ কিন্তু ওখানে যেতে যেতে বুঝলাম, আসলে তিনি যা আশা করতেন স্বামীর কাছে, সেটার গল্পই করছেন। একদিন বললেন, ‘আয়নাটা হাতে নিতে খুব ভয় পাই। এখন আয়নায় যা দেখি সেটা তো আমি না।’ হাসপাতালে ক্যান্সার আক্রান্ত কিশোরীরাও আসত। আপা তাদের কাছে চলে যেতেন। কথা বলতে চাইতেন। মনে আছে, কুষ্টিয়া থেকে কিশোরী মেয়েকে নিয়ে এক মা এসেছিলেন। আপা সেই মায়ের কাছে গিয়ে বলতে চেষ্টা করছেন, দ্রুত চিকিৎসা করালে আপনার মেয়ে ভালো হয়ে যাবে। মানে তাঁর মধ্যে বাঁচার ও বাঁচানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আপা মারা যান। আগের দিন ফোনে বললেন, ‘কিচ্ছু ভালো লাগছে না। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।’ বললাম, আপা কালকে আসি। পরের দিন আপার বাসায় যাওয়ার পথে শুনলাম, তিনি আর আমার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকবেন না!

 

সিয়েনায় জমা দিলাম

বছর দেড়েকের মতো কাজ করেছিলাম আপাকে নিয়ে। হাজারখানেক ছবি তুলেছি। আর পাঁচ ঘণ্টার ভিডিও। সেসব থেকে চার মিনিট ৫৩ সেকেন্ডের ডকুমেন্টারি বানিয়েছি। শিরোনাম ‘মাই সিস্টার অ্যান্ড আই (আমার বোন এবং আমি)। সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটোতে জমা দিয়েছিলাম গেল বছরের ডিসেম্বরে। মাঝখানে একবার মেইলে কর্তৃপক্ষ জানাল, ভিডিওটি চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য মনোনীত হয়েছে। আর ২১ অক্টোবর জানলাম জেনারেল ভিডিও ক্যাটাগরিতে এটা সেরা হয়েছে। ভিডিওটি দেখতে পারেন ইউটিউবে : https://www.youtube.com/watch?v=H55pVVApePk&t=5s

 

 

সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ডস

আলোকচিত্রীদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ডস। বর্ষসেরা আলোকচিত্রীসহ মোট ২১টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। এবার হার্ডশিপ অব লাইফ শিরোনামের ছবির জন্য বর্ষসেরা আলোকচিত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন তুরস্কের মেহমেত আসলান। জেনারেল ভিডিও ক্যাটাগরিতে প্রথম হয়েছেন বাংলাদেশের ফরিদা আলম, দ্বিতীয় জার্মানির জুলিয়া স্কনস্তাদ এবং তৃতীয় হয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার অ্যালেক্স লিন্ডব্লুম।

 

একনজরে ফরিদা আলম

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকা থেকে ফটোগ্রাফির ওপর ডিপ্লোমা করেছেন। পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ এবং তাদের জীবনযাপন ক্যামেরাবন্দি করছেন। তাঁর এই কাজ লেন্স কালচার, ওয়ান টু ওয়ান ক্লিকস, সোশ্যাল ডকুমেন্টারি নেটওয়ার্কসহ (এসডিএন) বিভিন্ন ফটোগ্রাফি প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়েছে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে অর্জন করেছেন সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড। একই বছর পেয়েছেন ফটোফি বর্ষসেরা আলোকচিত্রী পুরস্কার। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির আজীবন সদস্য তিনি।

 


সাতদিনের সেরা