kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

[ আরো জীবন ]

ওদের পেট ভরলে মন ভরে ফরিদার

নীলফামারীর সৈয়দপুরের ফরিদা বেওয়া। পেশায় দিনমজুর। স্বামী-সন্তানকে হারিয়েছেন অকালে। এখন পথের কুকুর-বিড়ালই তাঁর সঙ্গী। প্রতিদিন রাতে খাওয়ান ওদের। কাজটি করছেন প্রায় ২০ বছর ধরে। দেখে এসেছেন তোফাজ্জল হোসেন লুতু

১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ওদের পেট ভরলে মন ভরে ফরিদার

শুক্রবার। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টা। সৈয়দপুরের হাতিখানা সড়কের পাইকারি ফল মার্কেটের সামনে। খবরের কাগজের ওপর রাখা খাবার খাচ্ছে কয়েকটি কুকুর। পাশেই বসে আছেন এক বৃদ্ধা। একটু পর তিনি উঠে কুকুরগুলোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। খাওয়া শেষ হলে ওই বৃদ্ধা হাঁটা শুরু করলেন। সম্ভবত বাড়ির দিকে। কুকুরগুলোও তাঁর পিছু নিল। কৌতূহল জাগল মনে। দেখতে চাইলাম কুকুরগুলো কত দূর যায়। কিছুটা হাঁটার পর একটা বাড়িতে ঢুকলেন তিনি। এবার পেছন ফিরে তিনি ইশারা করলেন। কুকুরগুলো আবার ফিরে গেল। পরিচয় দিয়ে তাঁর সঙ্গে ঘরে ঢুকলাম। একটাই মাত্র রুম। ছোট একটা চৌকির ওপর কাপড়চোপড়। নিচে হাঁড়ি-পাতিল রাখা। দেখলাম, চৌকিতে চারটি বিড়াল। হাঁড়ি থেকে ভাত ও মাছ বের করে সেগুলোকেও খেতে দিলেন। কথায় কথায় জানা গেল, এই নারীর নাম ফরিদা বেওয়া। বয়স ৫০। সৈয়দপুরের হাতিখানা মহল্লায় রেললাইনের ধারে জরাজীর্ণ ঘরটিতে ভাড়ায় থাকেন। ফরিদার বাবার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায়। অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল নাটোরের ইসমাঈল হোসেনের সঙ্গে। স্বামী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় চাকরি করতেন। সেই সুবাদে সৈয়দপুরে চলে আসেন। দুই সন্তানের জননী। কিন্তু ফরিদার কপালে সুখ সইল না বেশিদিন। বড় ছেলে মাত্র চার মাস বয়সে বাবার বাড়ি মধুপুর থেকে চুরি হয়ে যায়। প্রসবের পরপরই মারা যায় ছোট ছেলে। প্রায় ৩০ বছর আগে স্বামীও মারা গেছেন। সেই থেকে একাকী জীবন। স্বামীর পেনশনের চার লাখ টাকা পেয়েছিলেন। বিশ্বাস করে এক প্রতিবেশীকে ধার দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে বুঝলেন, প্রতারণার শিকার হয়েছেন। হয়ে পড়েন নিঃস্ব। নিরুপায় হয়ে হোটেলে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শহরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হোটেলে মাছ-মাংস, ডাল-মসলা বাটা, শাক-সবজি কাটা-বাছা ও থালা-বাটি পরিষ্কারের কাজ করেন। পারিশ্রমিক প্রতিদিন ২২০ টাকা আর তিন বেলার আহার। মজুরির টাকা থেকে ঘর ভাড়ার জন্য রাখেন এক হাজার। বাকি টাকা দিয়ে চাল-ডাল, মাছ-মাংস কিনে রান্না করেন। তা প্রতি রাতে কুকুর-বিড়ালকে খাওয়ান। দীর্ঘ দুই দশক ধরে কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সৈয়দপুরের মানুষের কাছে এখন তিনি ‘বিলাই দাদি’ নামে পরিচিত।

কয়েক মাস আগের ঘটনা। প্রতিদিনের মতো বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে রাতে বেরিয়েছিলেন ফরিদা। শহরের বিমানবন্দর সড়কে কুকুরদের খাওয়াচ্ছিলেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন, এ জায়গায় কয়েক দিন ধরে সাতটি কুকুর খেতে আসত। সেদিন এসেছে ছয়টি। পরের রাতেও খাবার দিতে গিয়ে দেখেন একটি কুকুর কম। খোঁজাখুঁজি করলেন অনেক। পরে লোকমুখে জানলেন, একটি কুকুর সকালে ট্রাকচাপায় মারা গেছে। শুনে তিনি সেখানেই কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ ঘটনার পরদিন তিনি সৈয়দপুর থানা পর্যন্ত গিয়েছিলেন ট্রাক ড্রাইভারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে। পুলিশ পরে বুঝিয়েসুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছিল তাঁকে।

এখন শাহি কাবাব ঘর নামের একটি হোটেলে কাজ করেন। সেই হোটেলের প্রধান বাবুর্চি শাহিন বললেন, ‘ফরিদা বেওয়া সহজ-সরল মানুষ। প্রতিদিন হোটেল থেকে তাঁকে দুপুর ও রাতে খাবার দেওয়া হয়। সেই খাবার থেকেও বাঁচিয়ে তিনি কুকুরের জন্য নিয়ে যান। এমন পশুভক্ত দেখিনি জীবনে।’ হোটেল মালিক আশরাফ হোসেন বলেন, ‘দেখি প্রতিদিনই মজুরির টাকায় রাতে মাছ-তরকারি ও চাল-ডাল কিনে নিয়ে বাসায় ফেরেন ফরিদা। এরপর সেসব রান্না করে রাতে বেরিয়ে পড়েন কুকুরদের খাওয়াতে। টাকা-পয়সার প্রতি তাঁর কোনো রকম মোহ নেই।’  ফরিদা বেওয়া বললেন, ‘মানুষই আমাকে নিঃস্ব করেছে। এ শহরে আপন বলতে কেউ নেই আমার। তাই কুকুর-বিড়ালকেই সঙ্গী করেছি। এরা আমার সঙ্গে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। ওদের পেট ভরলেই মন ভরে আমার। কুকুরকে খাওয়াই, বাড়িতে বিড়াল নিয়ে থাকি বলে অনেকেই আমাকে বাসা ভাড়া দিতে চান না।’ তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এখনো বিধবা ভাতার কার্ড পাইনি। সরকার যদি একটা বাড়ি দিত তাহলে শেষ জীবনে নিজ আশ্রয়ে শান্তিতে থাকতে পারতাম।’                             ছবি : লেখক

 



সাতদিনের সেরা