kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

[ মহাপৃথিবী ]

পানির জন্য যুদ্ধ

আল সানি   

১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পানির জন্য যুদ্ধ

বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার আশপাশে বাস করে কুয়েচুয়া, আইমারা, চিকুইতানো, মেস্তিজো জাতের বিপুল আদিবাসী। দিনে মাত্র দুই ডলার আয় করা এসব আদিবাসী শাসকদের কাছ থেকে বঞ্চনার শিকার হতে থাকে স্বাধীনতার প্রথম থেকেই। বলিভিয়ার বেশির ভাগ আদিবাসী বাস করে কোচাবাম্বায়। জায়গাটি বলিভিয়ার একেবারে মাঝে অবস্থিত। প্রথমদিকে এটি কেচুয়া নামে পরিচিত ছিল। কেচুয়া মানে চারদিকে হ্রদে পরিবেষ্টিত সমভূমি। প্রচুর হ্রদ আর সমভূমির কারণে এখানকার বেশির ভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষিকাজে প্রচুর পানির দরকার। তবে আন্দিজ পর্বতে বছরের বেশির ভাগ সময় পানির সংকট লেগে থাকে। বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে কোচাবাম্বার পানি সরবরাহের দায়িত্বে ছিল সরকারি সংস্থা—সেমাপা। পানির দাম তখনো বেশ কম ছিল। কিন্তু ঠিক সময়ে দরকারমতো পানি পাওয়া ছিল কঠিন। তখন ক্ষমতায় ছিলেন হুগো বাঞ্জের সুয়ারেজ। তিনি মোট দুই মেয়াদে দেশটি শাসন করেন। প্রথমবার ১৯৭১-১৯৭৮ আর দ্বিতীয়বার ১৯৯৭-২০০১ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে সামরিক শাসক সুয়ারেজ দেশটিতে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চালু করেন। তিনি তখন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরকে ব্যাপক আকারে বেসরকারীকরণ শুরু করেন। ওই সময় কোচাবাম্বার মেয়র ছিলেন ম্যানফ্রেড ভিয়া। ভিয়া পানি সমস্যার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব পাঠালেন সুয়ারেজের কাছে। কোচাবাম্বার উত্তর-পশ্চিমের মিসিকুনি নদীর ওপর ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ দিয়ে সেই পানি সরবরাহ করা হবে শহরে। সব দিক বিবেচনায় বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব পাস হলেও বিশাল বাঁধ নির্মাণের অর্থ আসবে কোথা থেকে, সেটা নিয়ে সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। তখন এগিয়ে এলো বিশ্বব্যাংক। তবে মিসিকুনি নদীতে নয়, বিশ্বব্যাংক চাইল করোনি লেক থেকে পানি সরবরাহ করতে। কারণ, তাদের মতে মিসিকুনি নদী থেকে পানি সরবরাহ বেশ ব্যয়বহুল। কিন্তু বলিভিয়া সরকার রাজি হয়নি। শেষমেশ বিশ্বব্যাংক মিসিকুনি নদী থেকে পানি সরবরাহ করতে রাজি হলো। তবে তাদের শর্ত—বলিভিয়ার পানি সরবরাহের পুরো দায়িত্ব তুলে দিতে হবে কোনো বেসরকারি সংস্থার কাছে। উপায়ান্তর না দেখে ১৯৯৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ব্যাখতেল করপোরেশনকে পানি সরবরাহের দায়িত্ব দেয় সুয়ারেজ সরকার। ৪০ বছরের জন্য। কথা ছিল, এই সময়ে ব্যাখতেল করপোরেশন বিশ্বব্যাংকের ঋণ শোধ করবে। কিন্তু ব্যাখতেল করপোরেশন প্রতি মাসে পানির দাম ধরল ২০ ডলার, যা আগের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি। যেখানে কোচাবাম্বার মানুষের গড়ে মাসিক আয় ছিল ৬০ থেকে ৮০ ডলার। কিন্তু পানি ছাড়াও তো তাদের চলবে না। ফলে পানির জন্য কোচাবাম্বার মানুষ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। শহরের শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত সবাই যোগ দেয় আন্দোলনে। ২০০০ সালের জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে শহরে চলল হরতাল আর অবরোধ। এদিকে রাস্তায় রাস্তায় বেধে যায় পুলিশ-জনগণ সংঘর্ষ। আহত হয় শত শত মানুষ। হাজার হাজার আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মার্চ মাসজুড়ে সরকার বিভিন্ন ধর্মীয় নেতার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করে। তবে সাধারণ জনগণ তা মেনে নেয়নি। ফলে আবার দ্বিগুণ বেগে আন্দোলন শুরু হয়। এপ্রিলে সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে রাজধানী থেকে সেনাবাহিনী পাঠানো শুরু করে বলিভিয়া সরকার। এবার সরকারের বিরুদ্ধে লেগে গেলেন পুলিশ সদস্যরা। তাঁদের দাবি—বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। নইলে তাঁরা পানি আন্দোলন দমনে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলে স্রেফ জানিয়ে দিয়ে ব্যারাকেই থেকে গেলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত মেনে নিল। পুলিশের বেতন বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় সেনাবাহিনীও একই পথে হাঁটল। শেষাবধি সরকার বাধ্য হলো তাদের বেতন বৃদ্ধি করতে। তবে এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের পুঁজি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও সরকারকে চাপ দিতে থাকেন বেতন বাড়ানোর। এপ্রিলের দিকে আন্দোলনের গতি কিছুটা কমে আসে। তবে বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, একজন সামরিক কর্মকর্তা গুলি করে এক কিশোরকে হত্যা করছেন। এই ঘটনা আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। পুলিশের টিয়ার গ্যাস শেল উপেক্ষা করে অসংখ্য মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। পরিস্থিতির অবনতি দেখে ব্যাখতেল করপোরেশন তল্পিতল্পা গুটিয়ে কোচাবাম্বা ত্যাগ করে। ইতিহাসে এই আন্দোলন ‘কোচাবাম্বা ওয়াটার ওয়ার’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

তবে এই আন্দোলন কোচাবাম্বায় পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ না দেখালেও দ্রুত কিছু রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটাতে সাহায্য করে। ওই সময় বামপন্থী দল মুভমেন্ট ফর সোশ্যালিজম পার্টি ও তাদের এক নেতা ইভা মোরালেস আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বলিভিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন। তবে কোচাবাম্বায় এখনো পানি সমস্যা প্রকট। তেল আহরণের কারণে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো দ্রুত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। এখনো সেখানে অর্ধেক মানুষ বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত।

সূত্র : দ্য নিউইয়র্কার, হিস্টরি ডিজাইন স্টুডিও, দ্য গার্ডিয়ান



সাতদিনের সেরা