kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

[ আরো জীবন ]

৭১ বছর বয়সেও প্রতিদিন নারকেলগাছে

আবেদ আলী এবার একাত্তরে পা রেখেছেন। এই বয়সেও প্রতিদিন গড়ে ৩০টি নারকেলগাছে ওঠেন। ডাব নিয়ে বিক্রি করেন স্থানীয় বাজারে। বরিশালের গৌরনদীর মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন আহছান উল্লাহ

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৭১ বছর বয়সেও প্রতিদিন নারকেলগাছে

বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড। রাস্তার ধারে ডাব বিক্রি করছেন এক বৃদ্ধ। খালি গা। পরনে লুঙ্গি। একজন জিজ্ঞেস করলেন, ডাব কত?

—একদাম ৪০ টাকা।

—এই সাইজের ডাব ৪০ টাকা?

—ছোট দেহাইলে কী ওইবে? তিন গেলাস পানি ওইবে। মুই এই বয়সে গাছে উইঠা ডাব পাইরা আনি। কেনাই পড়ে প্রায় ৩০ টাকা। মোরে ১০টা টাকা বেহার (লাভ) দেবেন না?

এই ডাব বিক্রেতার নাম আবেদ আলী সরদার। বয়স ৭১ বছর। আরো অবাক হলাম যখন জানলাম, এই বয়সেই তিনি প্রতিদিন গড়ে ৩০টি নারকেলগাছে ওঠেন। ডাব সংগ্রহের জন্য তাঁকে হাঁটতে হয় ৮-৯ মাইল। একটি ভ্যান, দা আর দড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ডাব পারেন। পরে সেগুলো ভ্যানে করে বিক্রি করেন। এ কাজে তাঁকে সঙ্গ দেন স্ত্রী শরুফা বেগম। ডাবভর্তি ভ্যান নিয়ে যখন বাজারের পানে ছোটেন, শরুফা বেগম তখন পেছন থেকে ভ্যানটি ঠেলে সাহায্য করেন আবেদ আলীকে।

আবেদ আলীর বাড়ি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বিল্বগ্রামে। রোজগার করার মতো এক ছেলে আছে তাঁর। ছেলে দিনমজুর। ছেলেকে সহযোগিতা করতেই পুরনো পেশা আঁকড়ে রেখেছেন। তিনি একসময় ইটভাটায় কাজ করতেন। একদিন তাঁর ভুলে কিছু কাঁচা ইট নষ্ট হয়ে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইটভাটার সর্দার আবেদ আলীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। খুব মন খারাপ হয় তাঁর। পরে রাগ করে চলে আসেন বাড়িতে। কিন্তু বাড়িতে এসে কোনো কাজ জুটল না। একসময় এক প্রতিবেশী তাঁদের গাছের নারকেলগুলো পেড়ে দিতে বলেন। ডজনখানেক গাছ থেকে নারকেল পাড়ায় দেড় শ টাকার মতো মজুরি পেয়েছিলেন। পরে এটাকেই পেশা হিসেবে নেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারকেলগাছও পরিষ্কার করতে লাগলেন। বেশ কয়েক বছর হলো আর গাছ পরিষ্কার করতে পারেন না। এখন কেবল নারকেলগাছে উঠে ডাব পারেন। সেই ডাব বিক্রি করে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মতো আয় হয়। তা দিয়েই সংসার চলে।

শরুফা বেগমকে সঙ্গী করে সকালে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ছোটেন গ্রামের পর গ্রাম। গৌরনদীর প্রতিটি গ্রামের পথঘাট, অলিগলি তাঁর চেনা; অনেক বাড়ির গৃহবধূরাও এই দম্পতিকে চেনেন। এ গ্রাম-সে গ্রাম ঘুরে ৫০ থেকে ৬০টি ডাব কিনে এনে বাজার কিংবা বাসস্ট্যান্ডে বিক্রি করেন। বিক্রি শেষে কোনো দিন সন্ধ্যা, কোনো দিন রাতে বাড়ি ফেরেন। নারকেলগাছের সঙ্গে তাঁর সখ্য ৩০ বছরের। বললেন, এই ৩০ বছরে কোনো দিন কোনো দুর্ঘটনায় পড়েননি। এই বয়সে উঁচু উঁচু নারকেলগাছে উঠতে হাঁপিয়ে যান না? এমন প্রশ্নের জবাবে এক গাল হাসলেন। রসিকতার সুরে বললেন, ‘আপনের চাইয়াও মোর শরীরে শক্তি বেশি! কোনো ওষুধের ধার ধারি না। মাঝে মাঝে শরীর ব্যথা করলে লতাপাতা ছেঁচে রস খাই।’ তবে মুখে যতই বলুন না কেন আগের মতো কুলিয়ে উঠতে পারেন না। আগে একের পর এক গাছে উঠে যেতেন। এখন একটা গাছ থেকে ডাব পারার পর কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেন। স্থানীয় বাউল সহিদ সরদার বলেন, ‘আবেদ চাচা ভালো মনের মানুষ। এই বয়সে তিনি যেভাবে নারকেলগাছে ওঠেন আমরা অনেক সময় ভয় পাই।’ আবেদ আলীর স্ত্রী শরুফা বেগম বললেন, ‘মাইনষের কাছে চাইয়া খাওয়ার চাইতে কর্ম কইরে খাওয়া ভালো।’ স্ত্রীর কথার সূত্র ধরে আবেদ আলী বললেন, ‘কারো কাছে হাত পাতুম না। শরীর যত দিন কুলায় তত দিন এই কাজ চালাইয়া যামু।’



সাতদিনের সেরা