kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

[ বাঙালির বিশ্বদর্শন ]

‘অপরাজেয়’ এক আফগান উপত্যকায়

আফগানিস্তানের ইতিহাসে পানশির উপত্যকা ছিল অপরাজেয়। আশির দশকে সোভিয়েত বাহিনী এবং নব্বইয়ের দশকে তালেবান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল পানশির। তালেবানের ক্ষমতা দখলের আগে উপত্যকাটি ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন আনিসুজ্জামান দীপক

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘অপরাজেয়’ এক আফগান উপত্যকায়

আফগান সহকর্মী, বন্ধু ফারহাদ যখন ওর সঙ্গে পানশির যাব কি না জিজ্ঞেস করল, দ্বিতীয়বার ভাবিনি। টলটলে পানশির নদী, তার ছোঁয়ায় বেড়ে ওঠা সবুজ উপত্যকা, নদীর সমান্তরালে বয়ে চলা অপূর্ব পাহাড় আর রাস্তা, সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আহমেদ শাহ মাসুদের বীরত্বগাথা—এত সব গল্পের দেশ পানশিরে যাব না তো কাবুলে বসে ভেরেন্ডা ভাজব?

যাওয়ার দিন যথারীতি ওর বাবার বিখ্যাত হলুদ-সাদা ট্যাক্সি নিয়ে ফারহাদ হাজির আমার সারে নাউয়ের গেস্টহাউসে। সঙ্গে সওয়ার আমাদের দুই সহকর্মী রুহুল্লাহ হাবিবজাদা আর ওয়াহিদুল্লাহ ওয়াজিরি। পানশিরের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেকটা কাশ্মীরের মতো। বিদেশি, এমনকি কাবুলের লোকজনকেও এরা সন্দেহের চোখে দেখে। কিন্তু সঙ্গে পানশিরি কেউ একজন থাকলে খুব একটা ঝামেলা হয় না।

কাবুল থেকে পানশিরে ফারহাদদের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। কাবুল থেকে চারিকার রোড হয়ে পানশির যাওয়ার রাস্তাটাও এক অন্যতম আকর্ষণ। কাবুল থেকে যতই দূরে যাচ্ছিলাম, আফগানিস্তানের আমার চেনা ছবিটা দ্রুতই বদলে যেতে লাগল। গাধার পিঠে বাজার করে ফেরা পথিক, একচালা সব মাটির ঘরবাড়ি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক-আশাক, অনাড়ম্বর দোকানপাট—মনে হলো যেন আছি এইজ অব দি অ্যাম্পায়ারসের পারসিয়ান সিভিলাইজেশন সেটিংসে। পাহাড়ের পাদদেশে গাদাগাদি করে থাকা গুচ্ছ গ্রামগুলোও বেশ দৃষ্টিনন্দন। দেখতে অনেকটা স্টেডিয়ামের গ্যালারির মতো। পেছনেরটা সামান্য একটু উঁচু, যেন পরতে পরতে গাঁথা। এরই মাঝে যাত্রাবিরতিতে রাস্তার ধারে শামিয়ানা টানানো দোকানে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসতে না বসতেই চলে এলো বোলানি, সঙ্গে সস আর পানীয় হিসেবে এলো বোরহানি জাতীয় কিছু একটা। বোলানি হচ্ছে আলু, ডিম, মরিচ, পেঁয়াজপাতার সবজি মিশিয়ে অনেকটা ডিম ভাজির মতো করে করা একটি খাবার। আমাদের দেশে ফুটপাতের শিঙাড়া-পুরির মতো লাইট স্ন্যাকস হিসেবে এখানে এটার বেশ আদর-কদর, খেতেও বেশ।

ঘণ্টা দুই চলার পর দেখা মিলল পানশিরের সীমানার প্রথম নিরাপত্তাচৌকি। ফারহাদ আমাকে রুহুল্লাহ আর ওয়াহিদের মাঝখানে বসিয়ে ভয় পেতে নিষেধ করে নরমাল থাকতে বলল। আমি তা-ই ছিলাম। কিন্তু বিধি বাম, আমার ধার করা পাস্তুন বেশভূষা আর মাথার সেমাঘ কোনো কাজেই দিল না। উর্দি পরা গার্ড গাড়িতে উঁকি দিয়েই ইশারা করল আমাকে নামার জন্য। আমার তখন প্রমাদ গোনা শুরু হয়ে গেছে। পরে ভেবে দেখেছি, এটার পেছনে গার্ড ভাইয়ের তেমন কেরামতি নেই, বরং দায়ী আমার বাদামি গাত্রবরণ। সেমাঘ আর কুর্তা দিয়ে যতই ঢাকি না কেন, তাজিক বংশোদ্ভূত পানশিরিদের ধবল গাত্রবরণ আমি কোত্থেকে পাব? ঘটনা অবশ্য বেশি দূর এগোলো না। আমাদের পানশিরি ফারহাদ চিনিগুঁড়া এক হাসি দিয়ে দু-একটা কথা বলতেই গার্ড ভাইয়ের ইস্পাত কঠিন চেহারা আবার অমায়িক রূপে ফিরল—আমাদের গাড়িকে ইশারা করল সামনে এগোনোর জন্য।

উপত্যকায় ঢোকার পথের প্রায় পুরোটাই বাঁ পাশে পাহাড় আর ডান পাশে মিষ্টি শব্দে বয়ে চলা নদী। একটু এগোতেই বাড়ল নদীর প্রশস্ততা, সঙ্গে দুই ধারের সবুজের আনাগোনা। সবজির বাগান ছাড়াও ফলের বাগান আর নানা জাতের গাছপালায় সয়লাব দুই পার আর সবুজ চড়ে বসেছে যেন পাহাড়ের মাঝখান অবধি। এই চেনা অনুভূতির রেশ না পেরোতেই ফারহাদ ইশারা করল বাঁ দিকের উপত্যকায় তাকাতে। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে থাকা রাশিয়ান ট্যাংক আর নানা মিলিটারি আইটেম, লোহালক্কড়ের এক বিশাল বধ্যভূমি। নব্বইয়ের দশকে আফগান-রাশিয়ান যুদ্ধে এখানেই চরম মূল্য দিতে হয়েছিল রাশান বাহিনীকে। তুমুল যুদ্ধের এক রাতেই নাকি ওদের হারাতে হয়েছিল চার হাজার সৈন্য আর শত শত ট্যাংক। আকাশ আর জলপথে লাগাতার আক্রমণ করেও কবজায় আনতে না পেরে একসময় শান্তিচুক্তি করে যুদ্ধে ক্ষ্যান্ত দেয় রাশানরা। বছর দশেক পরে নানা জাতপাতের গৃহযুদ্ধের ডামাডোলে তালেবানরা যখন ক্ষমতা দখল করে, পানশির তখনো অক্ষতই থেকে যায়। যোদ্ধাদের একত্র করা কিংবদন্তি নেতা আহমেদ শাহ মাসুদের গড়ে তোলা নর্দান অ্যালায়েন্স আবারও হয়ে যায় দুর্ভেদ্য দেয়াল। পানশির থেকে যায় অপরাজেয় সিংহ হিসেবেই। পানশির শব্দের মানেও হচ্ছে পাঁচ সিংহ।

ফারহাদের গ্রামের বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় দুপুর। বাড়ির কাছে নামতেই দেখি ওদের বাড়ির কেয়ারটেকার আপেল বাগান থেকে ফিরছে দুই খাঁচি আপেল নিয়ে। গপাগপ খেয়ে নিলাম একটা। দুপুরের খাবারের আয়োজনও বেশ এলাহি। খানাপিনার পর আশপাশের এলাকা ঘুরিয়ে দেখাল ফারহাদ। বাড়ি থেকে একটু দূরে সুপেয় পানির এক চমৎকার সঞ্চালন ব্যবস্থা দেখলাম। নদীর পানিকে কিভাবে যেন ওরা একটা ড্রেনেজ সিস্টেমের মাধ্যমে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছে। একটু পর পর ড্রেনের পাশে দেখা মেলে প্লাস্টিক মগের। যে কেউ যেন চাইলেই ড্রেন থেকে পানি তুলে খেতে পারে। আমি মগ দুয়েক চেখে দেখলাম—হৃদয় জুড়ানো শীতল পানি।

আমাদের পরের গন্তব্য পানশির নদী। উঁচু সব পাহাড়ের পাথুরে পারের মাঝখানে প্রবাহিত নদীর জায়গাটা খুব বেশি প্রশস্ত নয়। তবে মাঝখানে গভীর। বর্ষায় নাকি পানি প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। স্বচ্ছ, টলটল জলে গা ভেজানোর আকর্ষণ উপেক্ষা করতে পারলাম না।

নদী থেকে ফিরে এসে ওদের পোষা টার্কির ফার্মের পাশে গাছতলায় বসলাম। লম্বা আড্ডায় ফারহাদ তার প্রিয় আহমেদ শাহ মাসুদের বীরত্বের গল্প শোনাল। আরো শোনাল পানশিরের সোনালি অতীতের কথা, কাছের পাহাড়ে ফিরিঙ্গিদের স্কি করতে আসার গল্প। ফেরার তাড়া না থাকলে সেই গল্পগুলো কখন কোথায় গিয়ে ঠেকত কে জানে? কিন্তু সন্ধ্যার আগেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে কাবুলের পথ ধরতে হলো।

 

ছবি : লেখক ও সংগ্রহ



সাতদিনের সেরা