kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

নতুন দিনের জাহাজী

দেশের নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করে তোলার স্বপ্ন দেখছেন দুই তরুণ—অভিনন্দন জোতদার ও কাজল আব্দুল্লাহ। সেই লক্ষ্যে শুরু করেছেন ‘জাহাজী’র যাত্রা। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নতুন দিনের জাহাজী

২০১৬ সাল। অভিনন্দন জোতদার ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন নিজ জেলা খুলনায়। শুরু করেন বালু-পাথর জোগান দেওয়ার ব্যবসা। পুরোটাই হয় নদীপথে। আর তখনই জানতে পারেন এই ব্যবসার অদ্ভুত প্রকৃতি সম্পর্কে। বলেন, ‘এই ব্যবসায়ে নেমে আবিষ্কার করলাম, নদীপথে পণ্য পরিবহনের সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে মধ্যস্বত্বভোগীরা। আমার বেশির ভাগ খদ্দের ছিলেন চীনের। তাঁরা সময়ের খুব মূল্য দেন। কাজেই তাঁদের পণ্যবাহী জাহাজ কখন কোথায় আছে, সেটা জানানো ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তাঁদের কখনোই সঠিক তথ্য দিতে পারতাম না। মধ্যস্বত্বভোগীদের মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে জাহাজ ভাড়া করতে হতো। সেটা কোথায় আছে, কখন গিয়ে পৌঁছবে—এ বিষয়ে রীতিমতো অন্ধকারে থাকতে হতো। বারবার ফোন করে জানতে হতো এবং তাঁরা যে সব সময় সত্যি বলতেন, তা-ও নয়।’

পরের বছর কর্মসূত্রে খুলনায় যান অভিনন্দনের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সহপাঠী কাজল আব্দুল্লাহ। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের স্নাতক। কাজল যান ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’-এর সিইও হিসেবে। পুরনো বন্ধুত্বের সূত্রে নিয়মিত হতো আড্ডা। আলাপ হতো নদীপথে পণ্য পরিবহনের সংকট নিয়েও। তখনই তাঁদের মাথায় আসে ‘জাহাজী’র ভাবনা। কাজল বলেন, ‘প্রথমে আমরা শুধু অভিনন্দনের সমস্যা নিয়েই ভাবছিলাম। ওর ভাড়া করা জাহাজগুলো ট্র্যাক করার একটা পদ্ধতি দাঁড় করানো যায় কি না। পরে বুঝলাম, এটা ওর একার নয়, এই ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সমস্যা। কাজেই আমরা সবার জন্য জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের একটা সেবা প্রদানের চিন্তা শুরু করলাম।’

শুধু চিন্তা করেই বসে থাকেননি তাঁরা। প্রথমেই বাজার যাচাইয়ের কাজে লেগে যান কাজল। খুলনার পাশাপাশি জরিপ করেন বরিশাল ও ঝালকাঠির জাহাজ মালিকদের ওপর। ‘বুঝতে পারলাম, এই সেবা শুধু যাঁরা জাহাজ ভাড়া নিচ্ছেন তাঁদেরই নয়, জাহাজ মালিকদেরও প্রয়োজন। কারণ এই খাতে তাঁদের সবারই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে, বিশেষ করে তাঁদের জাহাজের নিরাপত্তার ব্যাপারও রয়েছে,’ বলেন কাজল।

কাজেই তাঁরা ঠিক করলেন একটা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বানানোর যেটা দিয়ে জাহাজ ট্র্যাকিং করা যাবে। তবে এই ব্যবসায়ে জাহাজের অবস্থান জানতে না পারাটাই একমাত্র সীমাবদ্ধতা নয়। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় তা ভালোভাবেই জানা ছিল অভিনন্দনের। বলেন, ‘জাহাজ ভাড়া করাটাও বেশ ঝামেলাপূর্ণ প্রক্রিয়া ছিল। কেননা জাহাজ মালিকদের থেকে সরাসরি ভাড়া করা যেত না। সেই ব্যবস্থাও আমরা জাহাজী অ্যাপে রাখলাম। সঙ্গে যুক্ত করলাম আরেকটি সেবা। জাহাজ থেকে সরাসরি পণ্য কেনারও একটা চল আছে। মৌসুমে অনেক জাহাজই নদীপথে ঘুরে ঘুরে বালু-সিমেন্ট কেনাবেচা করে। সেটাও রাখলাম অ্যাপে।’

প্রথমে তাঁরা সাধারণ স্মার্টফোনকেই ব্যবহার করেন ডিভাইস হিসেবে। কিন্তু তাতে দেখা দেয় সমস্যা। সারাক্ষণ ফোন চার্জে রাখতে হতো। এটা যেমন সমস্যা, পাশাপাশি তাতে ব্যাটারিও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তখন ব্যবহার করা শুরু করেন ট্র্যাকিং ডিভাইস। আনা হয় চীন থেকে। ‘সেটা করতে গিয়েও বেশ ঝামেলা হয়েছিল। প্রায় সব কম্পানি ট্র্যাকিং ডিভাইসের জন্য তাদের নিজস্ব সার্ভার ব্যবহার করে। কিন্তু আমরা তাতে রাজি ছিলাম না। কারণ বাংলাদেশের তথ্য আমরা বিদেশি কোনো কম্পানিকে দিতে চাইনি। শেষে চীনের একটি কম্পানি আমাদের সার্ভার ব্যবহার করে এই সেবা দিতে রাজি হয়,’ বলেন কাজল।

এর মধ্যেই তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন শেখ বাহাউদ্দিন রূপক। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। তিনি নিজে জাহাজ মালিক এবং অভিনন্দনের পুরনো ব্যবসায়ের সঙ্গী।

সেপ্টেম্বরেই সব প্রস্তুতি শেষ করে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে জাহাজি। তাঁদের সেবা গ্রহণ করতে শুরু করে অর্ধশতাধিক জাহাজ। কিন্তু তখনই সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে। ডিসেম্বর থেকেই তাঁদের ডিভাইসগুলো নষ্ট হতে শুরু করে। কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায় সবই। ব্যবসা শুরু হতে না হতেই বন্ধ হওয়ার জোগাড়! কারণ খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারেন, ভুল পথে হাঁটছেন তাঁরা। ‘প্রথমত, আমাদের নদীপথে আর্দ্রতা বেশি। কাজেই ডিভাইস দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, নদীপথের জন্য ডিভাইস হতে হবে মেরিন গ্রেড, যাতে সেগুলো নদীর আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং তৃতীয়ত, সড়কপথে গাড়িতে যেকোনো একটা ট্র্যাকার লাগিয়ে দিলেই হয়। কারণ সেখানে পুরো পথেই নেটওয়ার্ক থাকে। কিন্তু নদীপথে একেক জায়গায় একেক কম্পানির নেটওয়ার্ক থাকে। অনেক জায়গায় কোনো নেটওয়ার্কই নেই,’ বলেন কাজল।

বিদেশি কম্পানির ট্র্যাকারগুলো মূলত সারা বিশ্বের সাধারণ কিছু ব্যাপার মাথায় রেখে বানানো হয়; এ দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে নয়। কাজেই এবার নিজেরা সেটা বানানোয় মন দেন। এর মধ্যেই চলে আসে অতিমারি। লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়ে সব কিছু। সময়টা কাজে লাগান তাঁরা। হাত দেন দেশের প্রথম ভেসেল ট্র্যাকিং ডিভাইস বানাতে। বানানো হয় চারটি প্রটোটাইপ। এর মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হয় সেরাটা। জাহাজী নতুন করে প্রস্তুত হয় দেড় বছরের মাথায়। ‘কাজ করতে গিয়ে আমরা ট্র্যাকিং ডিভাইসের যত সীমাবদ্ধতা অনুভব করেছিলাম, সব মাথায় রেখেই নতুন ডিভাইসটা বানানো হয়। মেরিন গ্রেডের ডিভাইসগুলো আমাদের আবহাওয়ার উপযুক্ত। নেটওয়ার্কের সমস্যা দূর করতে রাখা হয়েছে ডুয়াল সিমের ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, রাখা হয়েছে নেটওয়ার্ক অ্যাম্প্লিফায়ার। ফলে যেখানে নেটওয়ার্ক নেই, সেখানেও জাহাজটা যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে। যেমন ধরেন, জাহাজ যখন চট্টগ্রাম বা অন্য সমুদ্রবন্দরের বহির্নোঙরে যায় কিংবা সুন্দরবনে যায়, সেখানে কোনো নেটওয়ার্ক থাকে না; কিংবা প্রটোকলের জাহাজ যখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যায়, সেখানে আমাদের দেশের কোনো নেটওয়ার্ক নেই। কিন্তু আমাদের ডিভাইস সেখানেও তাদের ট্র্যাক করতে পারে; এমনকি ডিভাইসে ৬০ দিন পর্যন্ত সব তথ্য সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও আছে। যেন কোনোভাবে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্যুত হলেও ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, জাহাজ বিপদে পড়লে তা জানানোর জন্য রাখা হয়েছে এসওএস বাটন’, বলেন অভিনন্দন। কাজল যোগ করেন, ‘ডিভাইসগুলো বানিয়েছি জিএসএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ফলে খরচ কমে গেছে। মাসে মাত্র এক হাজার টাকায় এই সেবা দিতে পারছি আমরা। ডিভাইসের খরচ মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা।’

২০২১ সালের জুনে চূড়ান্ত করা হয় নতুন ডিভাইস ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। বসানো শুরু হয় জুলাই থেকে। এরই মধ্যে ডিভাইস বসানো হয়েছে ১২০টি জাহাজে। এর মধ্যে পিএনএন শিপিংয়ের আছে ১১টিতে। জাহাজী অ্যাপ ব্যবহারের অভিজ্ঞতার কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও ক্যাপ্টেন সাইখুল ইসলাম, ‘আন্তর্জাতিক নৌপথে আগে থেকেই এ ধরনের সেবা থাকলেও অভ্যন্তরীণ নৌপথে জাহাজীই প্রথম। আমার দুটিরই অভিজ্ঞতা আছে। সে হিসাবে বলতে পারি, জাহাজীর সেবার মান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’ এর বাইরে আরো ২০০ জাহাজের জন্য প্রি-অর্ডার নেওয়া আছে জাহাজীর। সে জন্য কাজ চলছে নিয়মিত। এমনকি কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে গেছে নৌপথ নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি সংস্থা—ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং, বিআইডাব্লিউটিএ ও বিআইডাব্লিউটিসির সঙ্গেও। কাজল বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগে সরকারি সমর্থন পাওয়াটা জরুরি। নৌপরিবহনমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সমর্থনও পাচ্ছি। এরই মধ্যে আইসিটি ডিভিশন থেকে পেয়েছি ১০ লাখ টাকার অনুদান। বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্র্যান্ট প্রতিযোগিতায় সরাসরি গালা রাউন্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এসবই আমাদের কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণ।’

তবে জাহাজীর লক্ষ্য আরো বড়। শুধু জাহাজ ট্র্যাকিং, ভাড়া ও পণ্য কেনাবেচায় নিজেদের সীমাবদ্ধতা রাখছেন না। তাঁরা এখন কাজ করছে দেশের নৌপথের একটি সুসজ্জিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার লক্ষ্যে। এই যেমন সম্প্রতি প্রবল স্রোতে পদ্মা সেতু পার হওয়া নিয়ে নৌযানগুলো রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। নিয়মিত ধাক্কা লাগছে পিলারে। এ নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে জাহাজী। অ্যাপসে আলাদা করে চিহ্নিত করা আছে এই সেতুর পিলারগুলো।

কোনো জাহাজ পিলারের বেশি কাছে চলে গেলে নোটিফিকেশন চলে যাবে অ্যাপসে। ফলে চালক আগে থেকেই সতর্ক হতে পারবেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের আওতাধীন জাহাজগুলো কোনটা কখন পদ্মা সেতু অতিক্রম করছে, কোন পিলারগুলোর মাঝ দিয়ে অতিক্রম করছে, জাহাজগুলোর গড় গতিবেগ কত, আর সেতু অতিক্রমের সময়ের গতিবেগ কত—এসব তথ্য সংরক্ষণ করছেন তাঁরা; যেন সেগুলো বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায় আসল চিত্র। ‘আমরা আসলে এই ব্যবসার সব তথ্যের একটা ভাণ্ডার তৈরি করছি। সে জন্য আমরা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের পাশাপাশি ওয়েব প্যানেলেও সেবা দিচ্ছি এবং সেখানে আরো অনেক বেশি তথ্য পাওয়া সম্ভব। যেন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা আমাদের থেকে সেসব নিয়ে বিশ্লেষণ করে তাঁর ব্যবসার জন্য সঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে পারেন। একই সঙ্গে সরকারও যেন সেসব তথ্য ব্যবহার করে সঠিক নীতিনির্ধারণ করতে পারে’, বললেন কাজল।



সাতদিনের সেরা