kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

[ সুপ্রভাত বাংলাদেশ ]

আরুণির নতুন ধান

আমন ধানের নতুন ছয়টি জাত উদ্ভাবন করেছেন খুলনার কৃষক আরুণি সরকার। তাঁর উদ্ভাবিত ধানগুলো দুর্যোগসহিষ্ণু, ফলনও বেশি। লিখেছেন গৌরাঙ্গ নন্দী

৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আরুণির নতুন ধান

বলতে গেলে সারা দিন মাঠেই কাটতো তাঁর। ধানের সবুজ পাতায় নজর রাখা, আগাছা পরিষ্কার, ফুল আসছে কি না তা দেখা, ফুল এলে পরাগায়ণ ঘটানো, ফলন কেমন হচ্ছে, ধানের রং কী বদলে যাচ্ছে, ধান থেকে চাল কেমন আর সেই চালের ভাতই বা কেমন খেতে—সেসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে সময় চলে যেত। নাওয়া-খাওয়ার ঠিক নেই। এলাকার লোকজন তো তাকে ‘পাগল’ ভাবত। সেই পাগলামির ১০ বছর শেষে আমন ধানের নতুন ছয়টি জাত উদ্ভাবন করেছেন আরুণি সরকার। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার গঙ্গারামপুর গ্রামে বাড়ি তাঁর।

 

পাগলের কাছে

একসময়ে যারা ‘পাগল’ ভাবত সেই এলাকাবাসী এখন আরুণি উদ্ভাবিত ধান পেতে মরিয়া। উদ্ভাবনের বছর পাঁচেক পর থেকেই দু-একজন করে নতুন জাতের বীজ নিতে শুরু করেন। তাঁরা ভালো ফলনও পান। বিশেষত তিন বছর আগে এই অঞ্চলে আমন ধানে পোকা লাগে। বলা হয়, কারেন্ট পোকার আক্রমণ। এতে নষ্ট হয়ে যায় ফলন। কিন্তু আরুণির ধানবীজ সে ক্ষেত্রে ছিল উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তাঁর ধানে পোকা লাগেনি। পাশের ক্ষেতে পোকা লেগে সাফ হয়ে গেলেও আরুণির আমন ধানগুলো ছিল খাড়া, দৃঢ়। ফলনও ভালো। সেই থেকে আরুণির নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বীজের চাহিদা বাড়ে। বাড়তি চাহিদা মেটাতে গেল মৌসুমে তিনি এক বিঘা জমিতে শুধু বীজ ধানের চাষ করেন। ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু এক সকালে দেখেন প্রায় অর্ধেক জমির বীজ ধান চুরি হয়ে গেছে। আরুণির মতে, ‘এই চুরির দুটি কারণ হতে পারে। এক. যারা আমাকে পাগল বলত, হয়তো তারাই লজ্জায় চাইতে না পেরে চুরি করেছে। অথবা চাহিদামতো বীজের সরবরাহ দিতে পারব না ভেবে অত্যুৎসাহীরা চুরি করেছে।’

 

যেভাবে শুরু

আরুণির বাবা কৃষক ছিলেন। বাবার সঙ্গে ধানক্ষেতে যেতেন সেই স্কুলজীবন থেকেই। এসএসসির পর আর লেখাপড়া এগোয়নি। অন্যের জমিতেও কাজ করেছেন। ২০০৯ সালের দিকে বেসরকারি সংস্থা ‘লোকজ’ এর কৃষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। সংগঠনটি স্থানীয় জাতের ধান টিকিয়ে রাখতে বীজ সংরক্ষণে জোর দিত। ২০১০ সালে ওই সংগঠনের হয়ে তিনি পিরোজপুরে একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেন। প্রশিক্ষক ফিলিপাইনের কৃষিবিজ্ঞানী বং কায়বং। তিনি হাতে-কলমে ধানের গাছ, শীষ, পাতা, পাতার রং, ফুলসহ শীষ কাটা, পরাগায়ণ ঘটানো প্রভৃতির ওপর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল পরাগায়ণ বা সংকরায়ণের মাধ্যমে নতুন জাতের বিকাশ ঘটানো। প্রশিক্ষণ থেকে এসেই আরুণি শুরু করেন তাঁর ‘পাগলামি’।

 

১০ বছরের পরিক্রমা

দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি বিলুপ্তপ্রায় দেশি আমন ধানের ১০টি জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় আমন ধানের ১০টি জাতকে মাদার ও ১০টি জাতকে ফাদার করে ইমাসকুলেশন ও পলিনেশনের মাধ্যমে ব্রিডিং করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ছয়টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। নতুন এই ধানগুলো হলো—আলো ধান, লোকজ ধান, আরুণি ধান, গঙ্গা ধান, মৈত্রী ধান ও লক্ষ্মীভোগ ধান। স্থানীয় জাতের জটাই বালাম ও তেইশ বালাম সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত নতুন ধানের নাম ‘আলো’, সাহেবকচি ও কাঁচড়া সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ধানের নাম ‘লোকজ’, চাপশাইল ও কুমড়াগোড় সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ধানের নাম ‘আরুণি’, বেনাপোল ও ডাকশাইল সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ধানের নাম ‘গঙ্গা’, তেইশ বালাম ও জটাই বালাম সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ধানের নাম ‘মৈত্রী’ এবং বজ মুড়ি ও কুমড়াগোড় সংকরায়ণের ফলে উদ্ভাবিত নতুন ধানের নাম ‘লক্ষ্মীভোগ’। আমনের এই নতুন জাতগুলোর মাদার-ফাদার থেকে ফলন বেশি, গাঁথুনি ঘন, শীষ লম্বা ও দুর্যোগসহিষ্ণু।

 

কে কী বলছেন

স্থানীয় কৃষক দেবজ্যোতি মহালদার বলেন, প্রতি বিঘা (৫০ শতক) জমিতে যেখানে স্থানীয় জাতের আমন ধান সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ মণ উৎপাদিত হয়, সেখানে এই নতুন উদ্ভাবিত আমন ধানের ফলন বিঘাপ্রতি ২৪ থেকে ২৫ মণ। উপরন্তু এই ধানে কারেন্ট পোকার আক্রমণ হয় না। ১৩ দিন একটানা বৃষ্টির পানির তলায় থাকায় অন্যান্য জাতের ধানগাছ পচে গেলেও আরুণির ধানগাছ পচেনি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল ইসলামের মতে, ‘আরুণি যে কাজটি করেছেন, আমরা তাকে সংকরায়ণপদ্ধতি বলে থাকি।’

তবে সবাই আরুণির এই কাজ ভালোভাবে নেয়নি। বছর চারেক আগে বিরির (বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট) একদল প্রতিনিধি এসেছিল তাঁর ধানক্ষেতে। মাঠে এসে প্রশংসা করলেও এই দলের একজন বিজ্ঞানী (নাম প্রকাশ করা হলো না) ঢাকায় ফিরে আরুণিকে ফোনে বলেছেন, ‘এভাবে পাগলামি করতে থাকলে আপনার ঘরে বউ থাকবে না। আর এ কাজে সফল হলেও এই কৃতিত্ব আত্মসাৎ করবে লোকজ, আপনার কোনো কৃতিত্ব থাকবে না।’

 

স্থিরচিত্ত আরুণি

বিজ্ঞানীদের নিরুৎসাহে আরুণি কষ্ট পেয়েছেন, তবে হতাশ হননি। জানালেন, প্রশিক্ষণের সময় ফিলিপিনো সেই শিক্ষক তাঁদের বলেছিলেন, এই কাজে কেউ উৎসাহ দেবে না; কিন্তু লেগে থাকলে সাফল্য আসবে। বিজ্ঞানীরা জাত উদ্ভাবনের যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, তাতে কীটনাশক, সার প্রভৃতি প্রয়োগের একটি ব্যাবসায়িক দিক থাকে; কিন্তু এতে তা নেই। আমার উদ্ভাবিত আমনের এই জাতে পোকা লাগে না। ফলে কীটনাশকের খরচ নেই। সার লাগে না।

 

চান স্বীকৃতি

স্থানীয় জাতের আমন ধানে ফলন কম, উফশী ধানে (উচ্চফলনশীল) ফলন বেশি। তাই কৃষক উফশী জাতে আকৃষ্ট হচ্ছে, ধীরে ধীরে স্থানীয় জাতের বিলুপ্তি ঘটছে। এর বিরুদ্ধে আরুণির চেষ্টা এক সফল প্রতিবাদ। ধানের জাতগুলো সরকারি স্বীকৃতি পাবে এখন সে আশায় দিন গুনছেন আরুণি।       ছবি : লেখক



সাতদিনের সেরা