kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

রুবাইয়াত একদিন অস্কার আনবেন

কাজী রুবাইয়াত হাবীবের পুরস্কারের ঝুলিতে সর্বশেষ সংযোজন ৭১তম অ্যামি অ্যাওয়ার্ড। অ্যাডোবি রিসার্চের ‘ক্যারেক্টার এনিমেটর’ সফটওয়্যারের জন্য টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাটাগরিতে দলগতভাবে পেয়েছেন এ পুরস্কার। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পুরস্কারটি পেলেন। অনেকের আশা রুবাইয়াতের হাত ধরে অস্কারও আসবে বাংলাদেশে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রুবাইয়াত একদিন অস্কার আনবেন

জন্ম চট্টগ্রামে। বাবা কাজী বেলায়েত আলী চিকিৎসক। কাজের সূত্রে প্রায়ই তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। সেই সুবাদে রুবাইয়াতের শৈশব কেটেছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায়। রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে এসএসসি এবং নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির শখ। ১৯৯৬ সাল। তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। বাবা দিল্লি থেকে ড্রয়িং শেখার বই আনলেন। দেখে খুব বিরক্ত হলেন রুবাইয়াত। মনে মনে বললেন, ‘দিল্লিতে কি চকোলেটও পাওয়া যায় না?’ কিন্তু বইয়ের পাতা ওল্টানোর পরই বিরক্তি হাওয়া! বিস্ময়কর স্কেচগুলো দেখে ভীষণ অভিভূত হলেন—এত সুন্দর আঁকা! সেই থেকে ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা। কৈশোর কেটেছে কমিকস ও এনিমেশনের ঘোরে।

ভাগ্যিস, ধমক খেয়েছিলেন

ইচ্ছা ছিল স্থপতি হবেন। ২০০২ সালে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় আর্কিটেক্টে প্রথমও হলেন। কিন্তু অনেকটা হুজুগে পড়ে শেষমেশ কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হলেন। অবশ্য ঘোর কাটতে বেশিদিন লাগেনি। প্রথম দিকে প্রগ্রামিংয়ের সঙ্গে নিজের প্যাশন—আর্টস, কমিকস, এনিমেশনের কোনো যোগসূত্র খুঁজে পেলেন না। একবার তো বিভাগ পরিবর্তনেরও চেষ্টা করলেন। স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে ভর্তির জন্য আবেদনপত্র নিয়ে গেলেন কম্পিউটার সায়েন্সের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবুল কাশেমের কাছে। তিনি তখন ধমক দিয়ে রুম থেকে বের করে দিয়েছিলেন রুবাইয়াতকে! কী আর করা, কম্পিউটার সায়েন্সেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হলো। পাশাপাশি কার্টুন, কমিকস ইত্যাদি আঁকাআঁকিও চলতে থাকল।

রাক্ষস নয় ভাক্ষস

কার্টুনিস্ট হিসেবে রুবাইয়াতের প্রথম উপার্জন ৩০০ টাকা। ২০০৫ সালের দিকে কম্পিউটার টুমরো নামের একটি ম্যাগাজিন থেকে পেয়েছিলেন। বললেন, ‘আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ইত্যাদি অবলম্বনে একটি কমিকস করার। চতুর্থ বর্ষে থাকাকালে মেহেদী হক, জাহিদ হোসেন ও জি এম তানিমের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস কাজ করে প্রথম কমিকস প্রকাশ করলাম।’ পরে সেটি ‘উন্মাদ’ থেকে ২০০৭ সালে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। নাম ‘ভাক্ষস’। এরপর চেয়েছিলেন কার্টুনিস্ট হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে। কিন্তু এক পর্যায়ে বুঝলেন, দেশে সেই সুযোগ কম। পরে পাড়ি জমালেন বিদেশে।

মেহেদী হক, জাহিদ হোসেন ও জি এম তানিমের সঙ্গে রুবাইয়াতের আঁকা প্রথম কমিকসের প্রচ্ছদ

 

ড্রয়িংগুলোতে প্রাণ দিতে গিয়েই

পিএইচডি করতে গেলেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে। গবেষণার মূল বিষয় ছিল কী করে কম্পিউটার এনিমেশনকে স্কেচিংয়ের মতো সহজে এবং সুলভে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনো যায় তা দেখা। বললেন, ‘একজন আঁকিয়ে হিসেবে কমিকসের প্রতিটি চরিত্র আমার কাছে বাস্তব। এদের প্রত্যেকেরই অনুভূতি আছে, স্বপ্ন আছে। কিন্তু যখন এগুলো আঁকতাম, দেখতাম চরিত্রগুলোর আবেগ-অনুভূতিগুলো নিয়ে যেভাবে ভাবি সেভাবে প্রকাশ করতে পারছি না। কারণ ছবি তো স্থির। কিন্তু আমার চিন্তা বা কল্পনা তো ডাইনামিক। সেসময় ভাবতাম—আমার ড্রয়িংগুলোকে কি কোনোভাবে জীবন্ত করে তোলা যায়? এটাই আমাকে পিএইচডি গবেষণায় অনুপ্রাণিত করল।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই অসংখ্য এনিমেটেড কনটেন্ট দেখি—কার্টুন, ফিল্ম, কম্পিউটার গেম ইত্যাদি ফর্মে। কিন্তু অনেক সময় এই ডাইনামিক মিডিয়ায় নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করতে পারি না। কেন? এ নিয়েই আমার ভাবনার শুরু। ফল হিসেবে কম্পিউটার এনিমেশন নিয়ে করা আমার বিভিন্ন গবেষণার কাজ নানা সময়ে নতুন প্রডাক্ট হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে।’

কমিকস আকারে থিসিস

২০১৩ সালে পিএইচডি সুপারভাইজারকে কথাচ্ছলেই বললেন, ‘পিএইচডি থিসিসটা কমিকস আকারে লিখলে কেমন হয়?’ শুনে সুপারভাইজার তো একবাক্যে রাজি। তবে সাধারণ কমিকস আর পিএইচডি থিসিস যে এক জিনিস নয়, এটা বুঝতে বেশিদিন লাগেনি। কিন্তু সুপারভাইজার নাছোড়বান্দা। অগত্যা থিসিসটা কমিকস আকারেই লিখে ফেললেন। সম্ভবত সেটাই কমিকস আকারে লেখা কম্পিউটারবিজ্ঞানের প্রথম পিএইচডি থিসিস। শিরোনাম ‘ডিজাইনিং ডিজিটাল আর্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন টুলস ইন্সপায়ার্ড বাই ট্র্যাডিশনাল ক্রাফট’। রুবাইয়াত বললেন, ‘এখনো বিভিন্ন জায়গায় গেলে প্রায়ই শুনতে পাই, আপনার থিসিসটা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। উপস্থাপনভঙ্গির কারণেই হয়তো লোকে থিসিসটা পড়ছে। এর মানে বিজ্ঞান যদি সঠিক মাধ্যমে, সহজে উপস্থাপিত হয়, তাহলে তার আবেদন অনেক বেড়ে যায়।’

অ্যাপলের বর্ষসেরা অ্যাপ

পিএইচডিতে রুবাইয়াতের প্রথম প্রজেক্ট ছিল স্যান্ড ক্যানভাস। প্রজেক্টটির জন্য ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর থেকে এন্টারপ্রেনারশিপ গ্র্যান্ট পেয়েছিলেন। সেই অর্থ দিয়ে একজন প্রগ্রামার নিয়োগ দিলেন। একটি আইপ্যাড অ্যাপও চালু করেছিলেন। পরে বুঝতে পারলেন, উদ্যোক্তা হওয়া অথবা গবেষণা—যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। রুবাইয়াত বেছে নিলেন শেষেরটিকে। পিএইচডির সময় ‘মাইক্রোসফট রিসার্চ এশিয়া ফেলোশিপ ২০১১’ও পেয়েছিলেন। এশিয়া থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি করা সেরা ১০ শিক্ষার্থীকে এই ফেলোশিপ দেওয়া হয়।

পিএইচডির সময় একবার অটোডেস্ক রিসার্চের কানাডা অফিসে গেলেন গবেষণার কাজে। সেখানেই বানালেন একটি সফটওয়্যার—স্কেচবুক মোশন। এটি একটি ড্রয়িং অ্যাপ, যাতে স্কেচিংয়ের মাধ্যমে খুব সহজে এনিমেশন করে ছবিগুলোকে জীবন্ত করে তোলা যায়। রিলিজ পাওয়ার পর এটি দারুণ সাড়া ফেলল। অ্যাপল প্রতিবছর এক লাখ অ্যাপের মধ্যে একটি অ্যাপকে বেস্ট অ্যাপ হিসেবে নির্বাচন করে। ২০১৬ সালে রুবাইয়াতের স্কেচবুক মোশন অ্যাপটি ‘অ্যাপল আইপ্যাড অ্যাপ অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়। সেবার অভিনন্দন বার্তা পেয়েছিলেন অটোডেস্কের সিইওর কাছ থেকেও। ২০১৭ সালে যোগ দিলেন আমেরিকায় অ্যাডোবি রিসার্চে। এখন সেখানে তিনি সিনিয়র রিসার্চ সায়েন্টিস্ট।

অ্যামি এলো ঘরে

এবার ক্যারেক্টার এনিমেটর সফটওয়্যারের জন্য দলগতভাবে পেলেন ৭১তম অ্যামি অ্যাওয়ার্ড। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাটাগরিতে পুরস্কারটি পেলেন রুবাইয়াত। এই অ্যামি অ্যাওয়ার্ড প্রযুক্তিবিশ্বের যুগান্তকারী অবদানগুলোকে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৯ সালের শেষ দিকে এসেছিল ঘোষণাটি। কথা ছিল ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু করোনার কারণে তা হয়নি। ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের পর চলতি বছরের শুরুতেই পুরস্কারটি হাতে পেয়েছে রুবাইয়াত ও তাঁর দল।

ক্যারেক্টার এনিমেটর সফটওয়্যারটি দিয়ে যেকোনো কার্টুনকে ক্যামেরার সামনে জীবন্ত করে তোলা যায়! রুবাইয়াত জানালেন, ‘ক্যারেক্টার এনিমেশনের শুরুটা বছর ছয়েক আগে। অ্যাডোবি রিসার্চ গ্রুপ থেকে। থ্রিডি এনিমেশন ইন্ডাস্ট্রিতে পুরনো হলেও এটির জন্য অনেক বিশেষায়িত ইকুইপমেন্ট ও সফটওয়্যার দরকার। শুধু ওয়েবক্যাম দিয়ে টুডি আর্টওয়ার্ককে এনিমেট করার অনেক টেকনিক্যাল ও নকশাগত চ্যালেঞ্জ আছে। বেশ ব্যয়বহুলও। সেসব চ্যালেঞ্জ দূর করছে আমাদের সফটওয়্যারটি। এর সাহায্যে হাতে আঁকা ড্রয়িংকে ক্যামেরার সামনে অ্যাক্টিংয়ের মাধ্যমে এনিমেট করতে পারেন শিল্পীরা।’

আমারও কিছু করার আছে

শুরু থেকেই পরিবারের সমর্থন পেয়ে আসছেন বলে জানালেন রুবাইয়াত। ধন্যবাদ দিলেন স্ত্রী তাসনিয়াকেও। কৃতজ্ঞ সিনিয়রদের কাছেও। বললেন, ‘যখন পিএইচডি শুরু করি, তখন হিউমান কম্পিউটার ইন্টার-অ্যাকশনে (HCI) হাতে গোনা দু-তিনজন বাংলাদেশি ছিলেন। এখন সংখ্যাটা উল্লেখ করার মতো। তাঁরা মেধা ও যোগ্যতায় বিশ্বের সেরা ইউনিভার্সিটি ও রিসার্চ ল্যাবগুলোতে স্থান করে নিচ্ছেন। কারণ সিনিয়ররা শুধু বিশ্বমানের গবেষণাই করেননি, জুনিয়রদের নিয়মিত পরামর্শ, উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। ফলে আমারও কিছু করার আছে নতুনদের জন্য। গবেষণার পাশাপাশি সেটিও করে যেতে চাই।’

সেই দিনটির অপেক্ষায়

রুবাইয়াতের কাছে এই এনিমেটেড ড্রয়িং একটি নতুন মাধ্যম, নতুন ভাষা। এখন এনিমেশনের কমিউনিকেটিভ ক্ষমতাকে টিভি ও ফিল্মের বাইরেও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গবেষণা করছেন। কাজ করছেন নতুন ধরনের প্রেজেন্টেশন ও স্টোরিটেলিং টেকনিক নিয়েও। বললেন, ‘এমন একটি দলের সঙ্গে কাজ করছি, যারা অ্যাডোবির ডিজাইনিং ও পেইন্টিং টুলসে নতুন নতুন কর্মক্ষমতা নিয়ে আসতে পারে। আমার বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে এনিমেটেড ড্রয়িং হবে সর্বজনীন। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।’ আর আরেক খ্যাতিমান বাংলাদেশি প্রকৌশলী, লেখক ও নির্মাতা ওয়াহিদ ইবনে রেজার মতো আমরাও অপেক্ষায় আছি ভিন্ন কিছুর; যেমনটা রেজা লিখেছেন তাঁর ফেসবুক ওয়ালে, ‘আমি মোটামুটি নিশ্চিত রুবাইয়াত অস্কারও পাবে।’

রুবাইয়াতের ঘরে দেশ থেকে নেওয়া স্মারকের সঙ্গে অ্যামি অ্যাওয়ার্ড



সাতদিনের সেরা