kalerkantho

বুধবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৮। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২১ সফর ১৪৪৩

[ ওরে বিহঙ্গ মোর ]

দিল্লির নীড়মানব

রাকেশ ক্ষত্রী। দিল্লির বাসিন্দা। ছিলেন আলোকচিত্রী, এখন হয়ে গেছেন পাখির বাসার কারিগর। এ পর্যন্ত বানিয়েছেন সোয়া লাখের বেশি বাসা। পেয়েছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দিল্লির নীড়মানব

এভাবেই শিশুদের পাখির বাসা বানানো শেখান রাকেশ

রাকেশের বাসা দিল্লির অশোকবিহার এলাকায়। সেখানেই বড় হয়েছেন। দেখেছেন কিভাবে একটু একটু করে কমে যাচ্ছে শহরে পাখির সংখ্যা। আগেকার দিনে প্রায় বাড়িতেই পাখির বাসা থাকত, বিশেষ করে চড়ুইয়ের। দেয়ালের ফাঁকে। ঘরের কোনায়। ‘তখন এগুলোকে শুভ লক্ষণ হিসেবেই দেখা হতো। পাখি বাসায় থাকলে জোরে ফ্যান দিতেও নিষেধ করতেন মুরব্বিরা। পাছে পাখায় লেগে পাখি কাটা পড়ে’, বলেন তিনি। আর এখন যেভাবে বাড়িঘর বানানো হয়, তাতে পাখির বাসা বাঁধার কোনো উপায় থাকে না। তাঁর নিজের বাড়িটিও তেমনি। বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে একটি ঘটনায়। তাঁর অফিসের পথে একটি বাড়ি পড়ত। তাতে ছিল প্রচুর পাখির বাসা। একদিন দেখেন ভাঙা হচ্ছে বাড়িটা। তিনি সোজা চলে যান বাড়ির মালিকের কাছে। তাঁকে অনুরোধ করেন। পরে আদালতে যাওয়ারও হুমকি দেন। সেদিনই ঠিক করে ফেলেন নিজের কর্তব্য। বলেন, ‘পাখির সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল ছোটবেলা থেকেই। সেই ঘটনার পরে ভাবতে থাকি, ওদের বাসা বানিয়ে দেব। কিন্তু সন্দেহ একটা ছিল। ওরা সে বাসায় থাকবে তো?’ প্রথমে বাসা বানানোর চেষ্টা করেন নারকেলের খোল দিয়ে। তার ভেতরে দিয়েছিলেন কাগজ। বেঁধেছিলেন চট। তারপর ঝুলিয়ে দেন বাড়ির বাইরে। কেটে যায় অনেক দিন। কিন্তু আসেনি কোনো পাখি। বুঝতে পারেন সে বাসা পছন্দ হয়নি পাখির। তাই নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি শুরু করে দেয় পাড়া-প্রতিবেশীরা। তবু দমে যাননি রাকেশ। আবার শুরু করেন নতুন করে। পদ্ধতি ও উপকরণ বদলে। এবার আগে বেত দিয়ে গোল একটা কাঠামো তৈরি করেন। তার ওপর চট বেঁধে বানান বাসা। ভেতরে দেন খড়। তারপর আবার দেন বাড়ির বাইরে ঝুলিয়ে। এক দিন, দুই দিন, তিন দিন। আসে না কোনো পাখি। আবারও হতাশ হয়ে পড়ছিলেন রাকেশ। চতুর্থ দিন শুনতে পান চড়ুইয়ের ডাক। গিয়ে দেখেন, এসেছে তাঁর বাসায়। শুরু করেছে থাকতে। ‘বুঝতে পারলাম, এই বাসা ওদের পছন্দ হয়েছে। আর সেই সাফল্যে বদলে যায় পড়শিদের দৃষ্টিভঙ্গিও। আগে ঠাট্টা-মসকরা করত। পরে তারাই আমাকে অনুরোধ করতে লাগল আরো বাসা বানাতে,’ বলেন তিনি। প্রথম দফায় বানিয়েছিলেন ২০টি। রাখা হয়েছিল অশোকবিহারের বিভিন্ন জায়গায়। দ্রুতই সেগুলো পাখিতে ভরে যায়। ঠিক করেন, এই বিদ্যা ছড়িয়ে দেবেন। শেখাতে শুরু করেন স্কুলপড়ুয়াদের। ওদিকে ছড়াতে শুরু করে তাঁর নাম। এগিয়ে আসতে থাকে করপোরেট সংস্থাগুলো। ২০০৮ সালে এটাকেই নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন রাকেশ; এমনকি কাজ করেন দিল্লির তখনকার মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতের একটি প্রজেক্টেও। সেই থেকে নিয়মিত পাখির বাসা বানানোর কর্মশালা করে যাচ্ছেন রাকেশ। সে জন্য নেন জনপ্রতি ৩৫০ রুপি। এ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। তাঁদের মধ্যে আছেন ৮০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ছয় বছরের শিশু পর্যন্ত। সব মিলিয়ে বাসা বানিয়েছেন অন্তত সোয়া লাখ। প্রতিটি বাসা বানাতে গড়ে খরচ পড়ে আড়াই শ রুপির মতো। এখন অবশ্য সে প্রক্রিয়ায় অনেক বদল এনেছেন। করছেন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তাঁর নিজের সবচেয়ে পছন্দ টেট্রা প্যাক দিয়ে বানানো বাসা। ফলের জুস প্যাকেটজাত করতে যেটা ব্যবহার করা হয়। বলেন, ‘এই বাসা দিয়ে পাখির আবাসন সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি পরিবেশদূষণও কমানো সম্ভব।’ এ কাজের জন্য দিল্লিতে তিনি বহুদিন ধরেই পরিচিত ‘নেস্টম্যান’ নামে। মিলেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। নাম উঠেছে ‘ওয়ার্ল্ড বুক অব রেকর্ডস’ ও ‘লিমকা বুক অব রেকর্ডস’-এ। প্রভাবশালী ব্রিটিশ প্রকাশনা সংস্থা ম্যাকমিলানের একটি শিশুতোষ বইয়ে তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে আস্ত একটা অধ্যায়। বিশেষ স্বীকৃতি দিয়েছে তাইওয়ান সরকার। পেয়েছেন লন্ডনের হাউস অব কমন্সের পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক ‘গ্রিন অ্যাপল’ সম্মাননা। তবে রাকেশের কাছে সবচেয়ে বড় তৃপ্তির জায়গা তাঁর কাজটাই। বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই যখন আমার বানানো কোনো বাসায় পাখি থাকতে শুরু করে। আপনি যখন কাউকে একটা থাকার জায়গা করে দিতে পারেন, তার চেয়ে তৃপ্তিদায়ক আর কিছু হতে পারে না।’

তথ্যসূত্র : আনন্দবাজার, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস