kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

৫০ বছর আগের এক রবিবার

আজ থেকে ৫০ বছর আগে। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট। রবিবার। সেদিন একটি স্বাধীন দেশের জন্মের সঙ্গে রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলানের মতো শিল্পীরা জড়িয়েছিলেন নিজেদের নাম। দর্শকরাও সেই আয়োজনে গভীরভাবে মিশে গিয়েছিলেন। তাঁদের একজন লিন্ডা এন্তোনোসি। এত বছর পর শামীম আল আমিন তাঁর দেখা পেয়েছিলেন

২৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



৫০ বছর আগের এক রবিবার

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির নর্থ হেলডান শহরে বাস করেন লিন্ডা এন্তোনোসি। পুরো নাম লিন্ডা ডি নোভা এন্তোনোসি। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম। তবে মা-বাবা এসেছিলেন ইতালির এভেলিনো শহর থেকে। ১৯৭১ সালে লিন্ডা ১৪ বছরের কিশোরী। তিনি তখন অষ্টম গ্রেডের শিক্ষার্থী। সামার ভ্যাকেশন চলছিল তখন। তাঁর বড় বোন ম্যারিয়ন ডি নোভা রুশো এসে তাঁকে জানালেন, তিনি নিউ ইয়র্কে একটি কনসার্ট দেখতে যাচ্ছেন। চাইলে লিন্ডাও সঙ্গী হতে পারেন। জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলানের নাম শুনে আর বেশি কিছু ভাবেননি। রাজি হয়ে যান।

 

ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে

ম্যানহাটানের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে পৌঁছে জানলেন বিশেষ এই আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই সম্ভবত প্রথম চ্যারিটি কনসার্ট। দিনটা ছিল ১ আগস্ট রবিবার। আর সেই কনসার্ট হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সহায়তার জন্য। এত বছর পর সেই স্মৃতি এতটুকু ম্লান হয়নি লিন্ডার মন থেকে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে সেদিন দাঁড়িয়েছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত সংগীততারকারা। ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি সেতারশিল্পী রবিশঙ্করের অনুরোধে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজন করেছিলেন ‘দ্য বিটলস’ খ্যাত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন। নোবেল ও অস্কার বিজয়ী বব ডিলানসহ অনেকেই অংশ নিয়েছিলেন মানবিক সেই আয়োজনে। সেদিন দুটি শো মিলিয়ে দর্শক হয়েছিল ৪০ হাজারেরও বেশি, যাঁদের বেশির ভাগই আমেরিকান। ছিলেন এই দুই বোনও।

কনসার্টের একটি মুহূর্তে জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলান

 

লিন্ডার সঙ্গে দেখা

লিন্ডা এখন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি মেডিক্যাল অফিসে কাজ করেন। খোঁজ নিয়ে হাজির হয়ে যাই সেখানে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরই এলেন তিনি। হাস্যোজ্জ্বল। বয়স ৬৫। কিন্তু বোঝার উপায় নেই। চেহারায় এখনো তারুণ্যের ছাপ। হাসতে হাসতে বসলেন সামনের চেয়ারটায়। অনেকটা আবেগের সুরেই বললেন, ‘ভাবতেই পারিনি, সেদিনের কনসার্ট দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে এত বছর পর কেউ এসে আমার ইন্টারভিউ নিতে চাইবে। সব কিছু যেন চোখের সামনে এখনো ভাসছে। মনে হচ্ছে, এই তো সেদিন।’ বললাম, ‘একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে যাচ্ছি। বইও লিখছি।’ শুনে খুব উৎসাহ জোগালেন। বললেন, ‘ইতিহাসের দায় মেটাতে হয়। তুমি সেটা করছ।’

 

তখনো বাংলাদেশের নাম জানতেন না

থেমে থেমে কথা বলেন তিনি। অনেকটা বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে। সেদিনের ঘটনা মনে আছে কি না জানতে চাইলে একটু থামলেন। এরপর বলা শুরু করলেন, ‘আমরা তিন বোন। সবার বড় জনের নাম ম্যারিয়ন। সে ছিল অনেক বড় মিউজিক ফ্যান। ম্যারিয়নই প্রথম কনসার্ট ফর বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারে। সে আমাকে কনসার্টে যাওয়ার অফার দেয়। সে জানত আমিও গান ভালোবাসি। এটাও জানত কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল একটা মহৎ উদ্দেশ্যে। পরিবার আমাদের শিখিয়েছে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তাই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইলাম।’ ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন বিশালাকৃতির একটি জায়গা। সেখানে গিয়ে দুই বোন দেখলেন, অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। স্কয়ারের ভেতরের বড় জায়গাটিকে অ্যারেনা বলা হয়। একসঙ্গে ২০ হাজার লোক বসতে পারে সেখানে।

লিন্ডা বলছিলেন, ‘আমরা নিউ জার্সি থেকে ম্যানহাটানে গেলাম। মনে আছে, অনেক ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। আমার বয়স তখন ১৪ বছর। সেখানে গিয়ে দেখি অসাধারণ পরিবেশ। জগত্খ্যাত শিল্পীরা জড়ো হয়েছেন। পুরো ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন ও আশপাশ তখন মানুষের কলরবে মুখর। এর আগে বাংলাদেশের নাম জানতাম না। আমার বড় বোন আমাকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলেছে। এরপর একটি দেশের মানুষের দুর্দশা ও কষ্ট আমি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করলাম। দুটি শো হয়েছিল। আমরা গিয়েছিলাম দুপুর আড়াইটার শোতে।’ একটু থেমে লিন্ডা আবারও স্মৃতি হাতড়ালেন, ‘পরিষ্কার মনে আছে, শুরুতে নীলরঙা শার্টের ওপর হাতাকাটা জ্যাকেটের মতো পরে প্রথমে মঞ্চে এলেন জর্জ হ্যারিসন। হাজারো মানুষের করতালিতে মুখর হয়ে উঠল গোটা আঙিনা। দুই হাত তুলে অভিবাদন জানিয়ে হ্যারিসন দর্শক-শ্রোতাদের ধন্যবাদ জানান। এরপর বললেন, ‘আপনারা জানেন, এটি একটি স্পেশাল বেনিফিট কনসার্ট। আমরা আপনাদের জন্য একটা ভালো শো সাজিয়েছি। শুরুতেই ভারতীয় মিউজিক, সেতার ও সরোদের যৌথ পরিবেশনা শুনবেন।’ এরপর তিনি মঞ্চে ডেকে নেন রবিশঙ্করকে।

লিন্ডা এন্তোনোসি (বাঁয়ে) ও ম্যারিয়ন ডি নোভা রুশো

 

রবিশঙ্কর এলেন মঞ্চে

লিন্ডা বলছিলেন, ‘এটা ছিল সমৃদ্ধ এক অভিজ্ঞতা। রবিশঙ্কর মঞ্চে আসেন। (আশা করছি, আমি তাঁর নামটি সঠিকভাবে বলেছি।) তাঁর পরিবেশনা ছিল ভিন্নধর্মী। ১৪ বছরের একজন মেয়ে হিসেবে এমন কিছু আমার কাছে নতুন ছিল। জর্জ হ্যারিসন তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁকে কিছুটা সময় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। কারণ তাঁর পরিবেশনা আমাদের প্রচলিত সংগীত অভিজ্ঞতার থেকে আলাদা ছিল।’

রবিশঙ্কর প্রথমে দর্শকদের প্রণাম করলেন। একে একে মঞ্চে আসেন সরোদশিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খান, তবলায় সংগত দিতে ওস্তাদ আল্লারাখা এবং তানপুরার জন্য কমলা চক্রবর্তী। ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পীদের হাতে পরবর্তী দায়িত্ব দিয়ে তখনকার মতো বিদায় নিলেন জর্জ হ্যারিসন। এরপর রবিশঙ্কর দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ইন্ডিয়ান মিউজিক শোনার জন্য সবাইকে একটু বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। আমি জানি, আপনারা প্রিয় তারকাদের গান শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। আমরা এমন একটি আয়োজনে অংশ নিচ্ছি, যার একটি বার্তা রয়েছে।’ এরপর বাংলাদেশে কী হচ্ছে সংক্ষেপে তুলে ধরেন রবিশঙ্কর। সেই সঙ্গে জানান ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের দুর্দশার কথাও। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘আমরা রাজনীতি করার চেষ্টা করছি না। আমরা শিল্পী। কিন্তু সংগীতের মধ্য দিয়ে আমরা জানাতে চাই, কী যন্ত্রণা, কী বেদনা আজ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে।’

 

সবাই হেসে উঠল

রবিশঙ্কর বলেন, ‘শুরুতেই আমরা বাজাব ধুন, এয়ার কিংবা মেলোডি; যেটা বাংলাদেশের একটি ফোক টিউনের ওপর ভিত্তি করে করা। এরপর থাকবে একটি কাত।’ উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পীরা তখন বাংলা ধুনের প্রস্তুতি পর্বে টুংটাং শব্দ করছিলেন, হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়েন দর্শকরা। তখন রবিশঙ্কর অনেকটা রসিকতা করে বলেন, ‘ইফ ইউ লাইক দ্য টিউনিং সো মাচ, আই নো দ্যাট ইউ উইল এনজয় দ্য মিউজিক ইভেন মোর।’ বিশেষ করে রবিশঙ্করের এই রসিকতার কথাগুলো বেশ ভালো মনে করতে পারছেন লিন্ডা—‘তখন সবাই খুব হেসে উঠেছিল।’ রবিশঙ্কর বাজানো শুরু করলেন ‘বাংলা ধুন’ (ধুন হলো এক বা একাধিক রাগের মিশ্রণে সৃষ্ট সুর)।  লিন্ডার ভাষায় ‘প্রথমে কী হচ্ছে সেটা অনেকেই বুঝতে পারছিলেন না; বিশেষ করে ভারতীয় সংগীত। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বুঝল ভারতীয় মিউজিক কী অসাধারণ মাধুর্যময়। সবাই মন উজাড় করে শুনেছে।’

 

যেন ঢেউ বয়ে গেল

লিন্ডা বললেন, এরপর যখন জর্জ হ্যারিসন মঞ্চে এলেন, মনে হলো যেন দর্শকদের মধ্যে একটা ঢেউ বয়ে গেল। আমরা লক্ষ করলাম, যতই সময় ঘনিয়ে আসছিল, দর্শক-শ্রোতাদের মতো শিল্পীরাও যেন আরো বেশি উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন।’ পুরো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করেছিলেন জর্জ হ্যারিসন। গানও গেয়েছিলেন আটটি। একটি ছিল বব ডিলানের সঙ্গে। লিন্ডা জানান, বব ডিলান পাঁচটি গানের একটা সেট করেছিলেন। আমেরিকায় তাঁর জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে।’ রিঙ্গো স্টার ও বিলি প্রেস্টন একটি করে গান করেছিলেন। বিলি প্রিস্টন তাঁর ‘দ্যাটস দ্য ওয়ে গড প্লানড ইট’ গানটি গাওয়ার সময় চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। মঞ্চের চারপাশে এমনভাবে নাচতে থাকেন; যা মিলনায়তনভর্তি দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। 

 

ইতিহাসের সাক্ষী

সেদিন মঞ্চ মাতিয়েছিলেন আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি ও ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পীরা। একটি স্বাধীন দেশের জন্মের সঙ্গে তাঁরা জড়িয়েছিলেন নিজেদের নাম। আর দর্শকরাও সেই আয়োজনের গভীরে মিশে গিয়েছিলেন। তাঁদের দুজন এই দুই বোন। সেই আয়োজনে অংশ নেওয়া ছিল তাঁদের জীবনের বড় একটি প্রাপ্তি—এমনটাই ভাবেন লিন্ডা। কনসার্ট থেকে ফেরার পথে সেদিন মনে মনে প্রার্থনা করেছিলেন, বাংলাদেশ যেন মুক্ত হয়। আজ জীবিত থাকতেই দেখে যেতে পেরেছেন বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে নতুন দেশ—বাংলাদেশ।

গ্রাফিকস : ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ৫০ বছর পূর্তি উৎসবের পোস্টার অবলম্বনে।

শিল্পী : মামুন হোসাইন।



সাতদিনের সেরা