kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

[ ফিরে দেখা ]

যে রোগে নাচত মানুষ

আল সানি   

২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যে রোগে নাচত মানুষ

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় সাড়ে সাত শ বছর আগে পুরো ইউরোপ, এশিয়ার পশ্চিমাংশ ও আফ্রিকার বেশ কিছু অঞ্চল শাসন করত রোমানরা। গ্লাডিয়েটর, জুলিয়াস সিজার, সেনেকা নামগুলো রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সঙ্গে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল তখন থেকেই। তবে ধীরে ধীরে রোমান সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি ছোট হতে থাকে। পঞ্চদশ শতকের দিকে রোমান সাম্রাজ্য শুধু কনস্টান্টিনোপোল নগরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। নিভুনিভু রোমান সাম্রাজ্যে এক জমকালো শহর ছিল স্ট্রাসবার্গ। এটি এখন ফ্রান্সের অন্তর্ভুক্ত। এই শহরে বাস করতেন ফ্রেউ ট্রফিয়া (Frau Troffea) নামের এক গৃহবধূ। জার্মান ভাষায় ঋত্ধঁ বলা হতো বিবাহিত নারীদের। ইংরেজিতে যেমন বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে নামের আগে Mrs যোগ করার প্রচলন আছে, সেই রকম। ১৫১৮ সালের জুলাই মাস। হঠাৎ একদিন ফ্রেউ ট্রফিয়া রাস্তায় নাচতে শুরু করে। নাচ আর থামে না। চারদিকে রটে গেল ট্রফিয়ার নাচের খবর। জনে জনে এসে দেখতে লাগল সেই নাচ। প্রথম দিকে সবাই বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নিয়েছিল এটিকে। ট্রফিয়ার একার নাচে খুব একটা সমস্যা বাধেনি শহর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু দিন যত বাড়তে লাগল সমস্যাও বাড়তে শুরু করল ব্যাপক হারে। কিছুদিন পর দেখা গেল, প্রায় ডজন তিনেক মানুষ ট্রফিয়ার নাচের শিবিরে যোগ দিয়েছে। মাসখানেক পর এই সংখ্যা গিয়ে ঠেকল ৪০০ জনে। স্ট্রাসবার্গ শহরে রীতিমতো নাচের প্রদর্শনী শুরু হয়ে গেল।

তবে এই নাচের আসর যত বড় হতে থাকে, মানুষ তাদের কাজকর্ম শিকেয় তুলতে শুরু করে। শহরে তখন দুটো দল। একদল নাচে, একদল দেখে। শহরের হর্তাকর্তারা দেখলেন বিপদ। সবাই যদি এভাবে নাচের আসরে যোগ দেয় তাহলে শহর চলবে কিভাবে? এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে লাগল তারা। অনেক ভেবে শহরের মেয়র ঠিক করলেন শহরের একদিকে স্টেজ বানানো হবে, সেখানে নাচিয়েদের আমন্ত্রণ জানাবেন। যারা নাচতে চায়, তারা যেন সেখানে গিয়ে নাচে। মেয়র ভেবেছিলেন এ রকম করলে হয়তো নাচের আসরের লোকজন বিরক্ত হয়ে নাচ থেকে দূরে সরে যাবে। তবে বাস্তবে ঘটল উল্টোটা; বরং সুযোগ পেয়ে আরো বেশিসংখ্যক মানুষ নাচতে শুরু করে। আর অতিরিক্ত নাচার কারণে অনেকের অধিক ক্লান্তিতে পা দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। বয়স্কদের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে শুরু করে। তবে কয়েক মাস পর সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর কোথাও কেউ নাচে না। হঠাৎ করেই নাচের এই মহামারি শুরু হয়ে হঠাৎ করেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায় শহর থেকে। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনার নাম দেওয়া হয় কোরিওম্যানিয়া; অনেকে আবার ডান্সিং প্লেগও বলে থাকেন।

১৫১৮ সালে স্ট্রাসবার্গে কোরিওম্যানিয়া দেখা দিলেও ইতিহাস বলে এর প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল আরো বেশ আগে। আজ থেকে ঠিক এক হাজার বছর আগে ১০২১ সালে জার্মানির কেবিএলবিগক শহরের একটি চার্চে বড়দিনের অনুষ্ঠানে যোগ দেয় একদল মানুষ। এদের মধ্যে হঠাৎ করেই ১৮ জন একে অপরের হাত ধরে উন্মাদের মতো নাচতে শুরু করে। পাদ্রির বারণে থামেনি কেউ। পাদ্রি রাগে ও ক্ষোভে সবাইকে অভিশাপ দেন। সেই অভিশাপ সঙ্গে সঙ্গে ফলেও যায়। বড়দিন আসার আগ পর্যন্ত তাদের নাচ থামে না। নাচ শেষে তারা ঘুমিয়ে পড়ে একেবারে। সে ঘুম থেকে আর কেউ কখনো জেগে উঠতে পারেনি।

১২৪৭ সালের দিকে জার্মানির ইরফুর্টের মোসেল নদীর ব্রিজের ওপরও ঘটে এ রকম ঘটনা। প্রায় ২০০ পথচারী একসঙ্গে নাচতে শুরু করে।  নাচ আর থামে। এক পর্যায়ে ব্রিজটি ভেঙে পড়ে সবাই ডুবে যায়।

ইউরোপে সে সময় এই ধরনের রোগকে অভিশাপের ফসল হিসেবে দেখতে শুরু করে অনেকেই। উপাসনালয়ে দায়িত্বে থাকা পাদ্রিরা কোরিওম্যানিয়াকে ‘সেন্ট ভিটাস’ নামের একজন খ্রিস্টান যাজকের অভিশাপ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেন। নিজ নিজ ধর্মের নিয়ম-নীতি না মানার কারণে সেন্ট ভিটাসের অভিশাপে স্ট্রাসবার্গের অধিবাসীরা এ রকম সমস্যায় পড়েছে বলে সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করে। পাদ্রিরা সেন্ট ভিটাসের কাছে প্রার্থনা করার জন্যও সবাইকে পরামর্শ দিতে থাকেন।

গত শতাব্দীতে কোরিওম্যানিয়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। ময়দা বা গমের আটায় জন্মানো এক ধরনের ছত্রাক থেকে এই রোগ হতে পারে বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। ময়দা দীর্ঘদিন ফেলে রেখে দিলে ছত্রাক বাসা বাঁধে এর ভেতর। এই ছত্রাকের মাধ্যমে ময়দায় লাইসার্জিক এসিড ডাইইথ্যালামাইড বা সংক্ষেপে এলএসডির জন্ম নেয়। এলএসএডি এমন এক ধরনের মাদক, যা মানুষের শরীরে ঢুকলে শরীরের ওপর স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেতে শুরু করে। ফলে মানুষ নিজের অজান্তেই হাত-পা ছুড়ে নাচতে শুরু করে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলে এলএসডি গ্রহণে মানুষের শরীর খুব কম সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়; এত দীর্ঘ সময় থাকে না।

ইতিহাসবিদদের মতে, ওসমানীয় সুলতান মুহম্মদ বিন ফতেহ কনস্টান্টিনোপোল আক্রমণ করার পর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এসময় অনেকেই মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই মানসিক ভারসাম্যহীনতাই জন্ম দেয় কোরিওম্যানিয়া বা ডান্সিং প্লেগের। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির মেডিসিনের ইতিহাসবিদ জন ওয়ালার

(John Waller) 2008 mvGj ‘A Time to Dance, a Time to Die : The Extraordinary Story of the Dancing Plague of 1518’ নামের একটি বই প্রকাশ করেন, যেখানে ডান্সিং প্লেগের সম্ভাব্য সব ইতিহাস উঠে এসেছে।