kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

[ আরো জীবন ]

ছেলেটাকে একদিন মেট্রো রেলে চড়ামু

মেট্রো রেল চালু হলে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটবে। আব্দুল আজিজের মতো নির্মাণ শ্রমিকরা এই বিপ্লবের নীরব সাক্ষী। আজিজের গল্প বলছেন নূরে আলম সিদ্দিকী শান্ত

২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




ছেলেটাকে একদিন মেট্রো রেলে চড়ামু

রাজধানীর আগারগাঁও। সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। তবে থেমে নেই মেট্রো রেলের নির্মাণকাজ। ঘড়িতে তখন বিকেল ৫টা। আগারগাঁও ৯ নম্বর স্টেশন। একদল শ্রমিক রাস্তার পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। তাঁদের একজন আব্দুল আজিজ। চেহারায় এক ধরনের সারল্য আছে। মুখে হাসি। বললেন, ‘এই যে মাথার ওপর মেট্রো রেলের লাইন দেখতাছেন। এটা ১৩ ফুট উঁচা। এখানেই আমার কাজ। মেট্রো রেলের রাস্তার (সড়কের) ঢালাইয়ের জন্য লোহার রড বাঁধি। এখন বিরতি। চা খাইতে আইলাম।’

 

দেশের কাজে

আব্দুল আজিজ নির্মাণ শ্রমিক। মেট্রো রেলের কাজ করছেন মাস ছয়েক ধরে। আগে মিরপুরে একটা ভবনের কাজ করতেন। সেখানকার একজন ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে জানুয়ারিতে জিসিএল কম্পানিতে (মেট্রো রেলের কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত) কাজের সুযোগ পান। মেট্রো রেলের মূল সড়কে ঢালাইয়ের আগে রড বাঁধাই করাই তাঁর কাজ। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ডিউটি। এরপর রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত ওভারটাইম। রাতে কাজ শেষে থাকেন আগারগাঁওয়ের স্টেশন ক্যাম্পে। মাসে গড়ে ২৭-২৮ হাজার টাকার মতো পান। এখানে কাজ করতে কেমন লাগছে? হাসিমুখে উত্তর দিলেন, ‘দেশের জন্য কাজ করছি। এত বড় প্রজেক্ট হচ্ছে। আর কিছুদিন পরই মানুষ মেট্রো রেলে চলবে। খুব আনন্দ লাগছে।’

 

বিদেশে গিয়েছিলেন

৩০ বছর বয়সী আজিজের বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার জুমাবাড়ি গ্রামে। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। অভাবের সংসারে দশম শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। পরে চেয়েছিলেন গ্রামে ব্যবসা করতে। কিন্তু পুঁজির অভাবে সেটাও হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে শুরু করেন নির্মাণ শ্রমিকের কাজ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতেন কাজের খোঁজে। এভাবে কাজ করে বেশ কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। ২০১৪ সালে ভাগ্যবদলের আশায় পাড়ি জমান কাতারে। সেখানে দীর্ঘদিন নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। কাতারের দিনগুলো ছিল কষ্টের। উঁচু উঁচু ভবনে কাজের ঝুঁকিও কম ছিল না। কিন্তু আজিজ যে প্রজেক্টের অধীনে গিয়েছিলেন ২০১৮ সালে সেটার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও নতুন কোনো কাজ জোটাতে পারেননি। পরে দেশে ফিরে আসেন। কাতারে যা আয় করেছিলেন সব দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তেমন সঞ্চয় করতে পারেননি। ফলে দেশে ফিরে আবার নির্মাণকাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। সর্বশেষ মিরপুরের একটা ভবনের কাজ করেছেন। মাস ছয়েক আগে মেট্রো রেল প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন।

 

ইংরেজি বুঝি না

এখানে কাজের ঝুঁকি কেমন? বললেন, ‘না, তেমন ঝুঁকি নাই। করোনা যেন না হয় তাই আমাদের ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন কাজের শুরুতে এবং শেষে আমাদের একসঙ্গে জড়ো করা হয়। সুপারভাইজার বলে দেন—সেফটি ফার্স্ট। কাজের সময় মাথায় ক্যাপ (হেলমেট) আর মুখে মাস্ক পরে থাকি। সমস্যা হয় না।’ মেট্রো রেলের প্রজেক্টে অনেক বিদেশিও কাজ করেন। তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে অসুবিধা হয় না বলে জানালেন আজিজ। বললেন, ‘উনারা ইংরেজিতে কথা বলেন। আমরা ইংরেজিটিংরেজি বুঝি না। সুপারভাইজার স্যার বাংলায় সব বুঝিয়ে দেন।’

 

স্বপ্ন দেখেন

বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইয়েরা যে যার মতো আলাদা থাকে। বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনার দায়িত্ব আজিজের কাঁধে। প্রতি মাসে নিজের খরচ রেখে বাকি টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। সারা দিনে কাজের ফাঁকে দুইবার বিরতি পান। ২০ মিনিট করে। সকাল ১১টায় একবার আবার বিকেল ৫টায় একবার। এই সময় চা-নাশতা সারেন। বাড়িতে কথা বলেন মোবাইলে। আট বছরের একটা ছেলে আছে তাঁর। ওর জন্য বেশি খারাপ লাগে আজিজের। সামনের ছুটিতে বাড়ি যামু। ‘নির্মাণকাজ শেষ হলে ছেলেটাকে ঢাকায় নিয়া আমু। ওরে এক দিন মেট্রো রেলে চড়ামু।’ বলতে বলতে চোখেমুখে খুশির ঢেউ খেলে যায় আজিজের।