kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

অছিউদ্দীনের আরেক যুদ্ধ

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে স্লোগান দিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নরসিংদীর অছিউদ্দীন শুরু করলেন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের লড়াই। গড়ে তুললেন জাগরণী পাঠাগার। এবার ৫৩ বছরে পড়ল পাঠাগারটি। দেখে এসেছেন রায়হান রাশেদ

২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




অছিউদ্দীনের আরেক যুদ্ধ

রাস্তার পাশেই চৌচালা টিনের ঘর। ঘরের সামনে টাঙানো সাইনবোর্ড ‘জাগরণী পাঠাগার’। বারান্দায় পাতা লম্বা টেবিল। ঘরে মোট আটটি তাক। থরে থরে সাজানো বই, দৈনিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিন। পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেছেন অছিউদ্দীন আহম্মদ।

 

যেভাবে পাঠাগার

অছিউদ্দীনের বাবা অবসর পেলেই বই পড়তেন। বাবার বই পড়ার নেশায় পেয়ে বসে ছেলেকে। কৈশোরে প্রতিদিন নিয়ম করে ‘আউট বই’ পড়তেন অছিউদ্দীন। পড়ার পর বইগুলো জমিয়ে রাখতেন ট্রাংকে। ১৯৬৪ সাল। একদিন বন্ধুদের ডেকে নিয়ে উঠানে মেলে ধরেন সেই ট্রাংক। বইভর্তি ট্রাংক দেখে তাঁরা চমকে ওঠেন। তাঁদের বই পড়তে দেন।

এক-দুই টাকা জমিয়ে নিয়মিত বই কেনেন অছিউদ্দীন। কয়েক বছর এভাবেই চলে। তখন তিনি কিশোর। নিজের শখের পাঠাগারের নাম দেন ‘কিশোর সমিতি’। ১৯৬৮ সালে সেই কিশোর সমিতিই রূপ লাভ করে জাগরণী পাঠাগারে। বইয়ের মাধ্যমে মানুষকে জাগাতে চেয়েছেন অছিউদ্দীন। বললেন, “বই পড়লে মন জাগে। মানুষ জাগলেই তো সমাজ জাগবে। এ ভাবনা থেকে নাম রাখি ‘জাগরণী পাঠাগার’।”

মানুষের কত কিছুর শখ হয়! তখন অছিউদ্দীনের শখ ছিল বই কেনা। সে সময় পুরান ঢাকায় থাকতেন। বিকেলে চলে যেতেন সদরঘাট। ফুটপাতে দোকানিরা বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসত। হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে ২৫ পয়সা, ৫০ পয়সা কিংবা এক টাকায় বই কিনতেন। পাঠাগারে এমন বহু বই আছে, যেগুলো এক টাকা বা তারও কম মূল্যে কেনা। যেমন ‘গল্পসংগ্রহ’ নামে একটি বই কিনেছিলেন ২৫ পয়সায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইব্রাহিম খাঁ, আবু জাফর শামসুদ্দীন, শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখের গল্প আছে বইটিতে।

 

আউট বই পড়ো

১৯৭২ সালে সিরাজনগর হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। মাইনে পেতেন ১৫০ টাকা। ১৪ বছর সেখানে ছিলেন। স্কুলের পাঠাগার সমৃদ্ধ করেছেন। প্রতিদিন হাতে করে বই নিয়ে যেতেন স্কুলে। শিক্ষার্থীদের ‘আউট বই’ পড়তে উৎসাহিত করতেন। পড়া হয়ে গেলে তাদের বই সম্পর্কে লিখতে বলতেন। তখনো সেই ভাঙা ট্রাংকই ছিল পাঠাগারের সম্বল। কোনো ঘর ছিল না। ছিল না বইয়ের তাক। শুধু বসার জন্য ছিল একচিলতে বারান্দা। সেখানে মাদুর বিছিয়ে পাঠকদের নিয়ে বসতেন। বই বিলি করতেন। এক দিন বইয়ের আলমারিও নিয়ে আসেন। ঘরের কোণে বসিয়ে দেন। পরম যত্নে বই সাজাতে থাকেন। একসময় নিজের বেতনের টাকায় মানুষের ঘরে ঘরে বই বিলি শুরু করেন, এরপর গ্রামে গ্রামে। স্কুল-কলেজে গিয়ে বই দিয়ে আসতেন। সপ্তাহখানেক পর আবার নিয়ে আসতেন।

 

এবার ঘর

একটা সময় জমানো টাকায় উঠানের এক পাশে দোচালা টিনের ঘর তোলেন। পাঠকদের জন্য টয়লেট নির্মাণ করেন। টিউবওয়েল বসান। এই করতে করতে হাতের টাকা ফুরিয়ে যায়। তাক বানানোর জন্য আরো টাকা দরকার। কিন্তু তত দিনে সংসারে অভাব লেগেছে। বাধ্য হয়ে বন্ধুদের থেকে ধার করে তাক তৈরি করেন। এভাবে বড় হয় পাঠাগার। সদস্য বাড়ে। পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। রায়পুরার প্রায় সবাই এখন এক নামে চেনে অছিউদ্দীন ও তাঁর পাঠাগারকে।

 

ভাণ্ডারে তাঁর বিবিধ রতন

উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ইতিহাস ও বিজ্ঞান মিলিয়ে হাজার বিশেকের বেশি বই আছে পাঠাগারে। সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, কায়কোবাদসহ অনেকের রচনাসমগ্র আছে। পত্রিকা আছে। ‘তত্ত্ববোধিনী’,  ‘প্রবাসী’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘ছোলতান’, ‘মোহাম্মদী’, ‘সওগাত’ ইত্যাদি পত্রিকার কপি ছাড়াও দৈনিক আজাদের রজতজয়ন্তী সংখ্যা এবং দৈনিক পত্রিকার ফিচার কাটিং আছে প্রায় ৪০ বছরের। পাঠাগার থেকে ‘জাগরণী’ নামে সাময়িকী প্রকাশিত হয় প্রতিবছর। ১৯৮১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় এর প্রথম সংখ্যা। যৌথভাবে সেটির সম্পাদনা করেছিলেন ড. নুরুল ইসলাম ও অছিউদ্দীন। নওরোজ নামের একটি দেয়াল পত্রিকারও ৪০টি সংখ্যা বের করেছেন। এসবের কল্যাণে অনেক লেখকের জন্ম হয়েছে। পাঠাগারে দুটি দৈনিক পত্রিকা রাখেন। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। রায়পুরার আদিয়াবাদ কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরমান বলেন, ‘ক্লাস সেভেন থেকে স্যারকে চিনি। তাঁর কাছ থেকে বই নিয়ে পড়তাম।’ নরসিংদীর একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক মুহাম্মদ রাকিব বলেন, ‘উনাকে দেখেই বই পড়ার আগ্রহ জন্মেছে আমার।’

 

বই পড়লে পুরস্কার

২০০০ সাল। এসএসসি পরীক্ষা শেষ। অছিউদ্দীন চাইলেন শিক্ষার্থীরা যেন অবসর সময়টা বই পড়ে কাটায়। পাড়ার শিক্ষিত তরুণদের একত্র করলেন। ঠিক করলেন, জেলায় মোট পাঁচ হাজার ছাত্রীর হাতে বই পৌঁছাবেন। এ-ও ঘোষণা দিলেন, ‘বই পড়ে সুন্দর রিভিউ এবং কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সেরা দুই ছাত্রীকে স্বর্ণালংকার প্রদান করা হবে।’ এর মাস তিনেক পর আদিয়াবাদ স্কুলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। ‘নরসিংদীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক ছাড়াও এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ভিসি আব্দুস সাদেকও উপস্থিত ছিলেন। দুজন ছাত্রীকে স্বর্ণালংকার (গলার হার) উপহার দিয়েছিলাম সেবার।’ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন অছিউদ্দীন। ২০১০ সালে আয়োজন করলেন বইপাঠ কর্মসূচির। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুই হাজার বই বিলি করলেন। সেবার পুরস্কার হিসেবে একজন ছাত্র ও একজন ছাত্রীকে কম্পিউটার প্রদান করলেন। ২০১৮ সালেও পুরস্কার দেন প্রায় ৭০ জন বইপড়ুয়াকে।

 

অনেকেই এসেছেন

১৯৯০ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও জীবনানন্দ গবেষক উইলিয়াম রাদিচে জাগরণী পাঠাগারে আসেন। মন্তব্যের খাতায় লেখেন, ‘এখানে এসে আমি আনন্দিত। আপনাদের আন্তরিকতা ও বন্ধুত্ব সারা জীবন আমার মনে স্মৃতি হয়ে জেগে থাকবে।’ অছিউদ্দীন বলেন, ‘তখন ২০০৮ সাল। নরসিংদী জেলার অ্যাডিশনাল ডিসি বিজয় কান্তি একবার রাধাগঞ্জ বাজারে আসেন। আমি তাঁকে পাঁচ মিনিটের জন্য পাঠগার দেখার অনুরোধ জানাই।’ পাঠাগারের সংগ্রহ দেখে তিনি বললেন, ‘আপনি আমাকে তাক লাগিয়ে দিলেন।’

 

লেখালেখিও করছেন

পাঠাগার পরিচালনার পাশাপাশি লেখালেখিও চালিয়ে গেছেন অছিউদ্দীন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আটটি। এর মধ্যে ‘মরমি কবি সাবির জীবনদর্শন’, ‘কোরআন মাজিদের বিষয়ভিত্তিক আয়াত’, ‘আল কোরআনের ভাষায় ইতিহাসের শিক্ষা’, ‘মক্কা মদিনা ও হজের বিধি-বিধান’, ‘পয়গামে রাসুল’ উল্লেখযোগ্য। এখনো কয়েকটি আছে পাণ্ডুলিপি আকারে। গ্রামে একটি মাদরাসাও প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।

 

তিনি চান

বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া লোকটাকে চেনে সবাই। তাঁকে নিয়ে আলাপ হয় স্কুল-কলেজে, সভা-সেমিনারে। অছিউদ্দীন বললেন, ‘জীবনটা বইয়ের সঙ্গে কাটিয়ে দিলাম।’ একসময় দুই হাতে টাকা কামিয়েছেন, পাঠাগারের পেছনে ব্যয় করেছেন। এখন তাঁর কামাই-রোজগার নেই বললেই চলে। ফলে পাঠাগারও ভালো নেই। ‘বইয়ের তাকে ঘুণ ধরেছে। বই নষ্ট হচ্ছে। পাঠাগারের দ্রুত সংস্কার দরকার। জাগরণী পাঠাগার গণ-গ্রন্থাগারের তালিকাভুক্ত। কিন্তু প্রতিবছর অনুদান আসে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুদৃষ্টি দিলে আমার মৃত্যুর পরও পাঠাগারটি বেঁচে থাকবে।’ বললেন অছিউদ্দীন।