kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩০ জুলাই ২০২১। ১৯ জিলহজ ১৪৪২

[ হয়ে ওঠার গান ]

দীপ জ্বেলেছেন দিয়া

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছেন। রুপা জয় করে ইতিহাস গড়েছেন রোমান সানাকে সঙ্গী করে। বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ানো তীরন্দাজ দিয়া সিদ্দিকীর গল্প বলছেন রাহেনুর ইসলাম

১৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দীপ জ্বেলেছেন দিয়া

বাবা চাইতেন মেয়ে হবে ডাক্তার। মায়ের ইচ্ছা ছিল গ্রামের আটপৌরে জীবনেই মানিয়ে নেবে সে। বিয়ে করে হবে সংসারি। দিয়া সিদ্দিকী হননি কোনোটাই। এখন আরচারিতে আলো ছড়াচ্ছেন বিশ্বমঞ্চে। ২৩ মে সুইজারল্যান্ডের লুজানে আরচারি বিশ্বকাপ স্টেজ-টু এর ফাইনালে মিশ্র দ্বৈতে রুপা জিতেছেন রোমান সানাকে সঙ্গী করে। এমন সাফল্যে ভাসছেন উচ্ছ্বাসে—‘আমি গ্রাম থেকে উঠে এসেছি। একটা সময় ভাবতাম, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলব, স্বপ্নেও ভাবিনি। সোনা জিততে পারলে খুব ভালো লাগত।’

ছোটবেলা থেকেই দিয়ার মন পড়ে থাকত খেলার মাঠে। কিন্তু নীলফামারী জেলার পাইকপাড়ার প্রত্যন্ত মধ্যহারওয়া গ্রামের কিশোরীর জন্য খেলাধুলা সহজ ছিল না। তবে প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের বাঁকা কথায় কান দেয়নি সে। একটা সময় নীলফামারী গভ. গার্লস স্কুলে দৌড়ে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দিয়ার। কিন্তু লম্বা হওয়ায় শরীরচর্চা শিক্ষক খাইরুল ইসলাম মনোযোগী হতে বলেন আরচারিতে। বাবা নূরে আলম সিদ্দিকীও উৎসাহ দিলেন।

২০১৭ সালে সারা দেশের মতো নীলফামারীতেও আয়োজন হয় আরচারির প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি। তখনো খেলাটার অ আ ক খ কিছুই জানতেন না দিয়া। তবু খাইরুল ইসলামের পরামর্শেই ট্রায়ালে অংশ নেন। কিন্তু হাতে তীর-ধনুক না তুলতেই তাঁকে বাদ দেন ট্রায়ালের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক! প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী থাকায় তিনি ভেবেছিলেন, খেলতে নয় অন্যদের দেখাদেখি শুধু অংশ নিতেই এসেছে দিয়া। পরে দিয়া বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জানতে চান, ‘স্যার, আমি তো পরীক্ষাই দিলাম না, তাহলে ফেল করলাম কিভাবে?’ এরপর সুযোগ না দিয়ে উপায় ছিল না। সেটা কাজে লাগিয়ে টিকে যান দিয়া। সেই ট্রায়ালে অংশ নেওয়া আরো দুজনের সঙ্গে চলে আসেন টঙ্গীতে। সেখানে জাতীয় দলের ক্যাম্পে ভালো করায় জাতীয় দলের কোচ জিয়াউর রহমানের পরামর্শে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন বিকেএসপিতে। সাত দিনের ক্যাম্প করে বিকেএসপিতে সুযোগ হয় আরচারির কম্পাউন্ডে ভর্তি হওয়ার। ২০১৮ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে কম্পাউন্ডে অংশ নিয়ে বিকেএসপির হয়ে দিয়া জেতেন ব্রোঞ্জ। কিন্তু কম্পাউন্ড নয়, দিয়ার পছন্দ রিকার্ভ। উল্লেখ্য, ক্রিকেটে যেমন পেস আর স্পিন, আরচারিতে তেমনি খেলার দুটি ধরন—কম্পাউন্ড আর রিকার্ভ। দুই ধরনের খেলার ধনুকও আলাদা, টার্গেটের দূরত্বও ভিন্ন। যা হোক, জাতীয় যুব গেমসে নীলফামারী জেলার হয়ে দিয়া অংশ নেন রিকার্ভেই। দলগত ইভেন্টে জেতেন রুপা। এরপর বদলে যায় জীবন। পাকাপাকিভাবে চলে আসেন রিকার্ভে। সাফল্যও মুঠোবন্দি হতে থাকে একে একে। ২০১৯ সালে আইএসএসএফ আন্তর্জাতিক সলিডারিটি আরচারিতে দেশের হয়ে জেতেন প্রথম সোনা। সেই আসরের মিশ্র ইভেন্টে রোমান সানার সঙ্গে জেতেন ব্রোঞ্জ। এবার তো রাঙালেন বিশ্বকাপটাই। এ জন্য তাঁর মতো খুশি দিয়ার বাবা নূরে আলম সিদ্দিকীও। তিনি অবশ্য এখনো দেখেন মেয়েকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন, ‘দিয়ার সাফল্যে আমরা গর্বিত। মেয়েটা দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। খেলাধুলার ব্যস্ততার মাঝেও মাধ্যমিকে দিয়া পেয়েছে জিপিএ ৪.৮৯। বিকেএসপিএতে এখন প্রথম বর্ষে পড়ছে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে। ওর এখনো সুযোগ আছে ডাক্তার হওয়ার।’

তবে দিয়ার আপাতত লক্ষ্য জুনে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ স্টেজ থ্রি। এ সময়ই হবে অলিম্পিকের বাছাই পর্ব। এখানে টিম ইভেন্টে ভালো করলে সুযোগ আসবে টোকিওতে যাওয়ার। তিনজনের টিম ইভেন্টে দিয়ার সঙ্গে খেলবেন নীলফামারী আরেক আরচার বিউটি রায়। একই জেলার হওয়ায় বিউটির সঙ্গে দিয়ার বোঝাপড়া ভালো। চেষ্টা করবেন অলিম্পিকে সেটা কাজে লাগাতে। দিয়া বলেন, ‘আমরা সুইজারল্যান্ডে মেয়েদের টিম ইভেন্টে ভালো করিনি। প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়েছিলাম। সেটা অলিম্পিক বাছাই পর্ব ছিল না। প্যারিসে একটা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছলে আমরা টোকিও অলিম্পিকের টিকিট পেতে পারি। সে জন্য নিজেদের সবটা নিংড়ে দেব।’ বিশ্বকাপে রুপা পাওয়ার পর অলিম্পিক খেলার স্বপ্ন দেখা বাড়াবাড়ি কিছু নয়। অথচ এই দিয়াই পথ হারিয়েছিলেন সাফ গেমসের আগে। কাঠমাণ্ডু সাফ গেমসে ১০টি সোনার সবই জেতে বাংলাদেশ। ছন্দ হারানোয় বাংলাদেশ আরচারি দলে সুযোগই হয়নি তাঁর! এত বেশি হতাশায় ভুগছিলেন যে ২০১৯ সালে স্পেনে হওয়া যুব বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তীর মেরেছিলেন টার্গেটের বাইরে। খারাপ সময়টায় সতীর্থ, কোচ আর কর্তারা ছিলেন পাশে। কোচ জিয়াউর রহমান ফিঙ্গার ট্যাপ বদলে দেওয়ার পর আবারও নিজেকে ফিরে পান দিয়া। এখন শুধু নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পালা। তাতে আরো আলোকিত হবে আরচারি, জ্বল জ্বল করবে লাল-সবুজ পতাকাটা। দিয়া নামের সার্থকতাটাও সেখানে।