kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৯ জুলাই ২০২১। ১৮ জিলহজ ১৪৪২

[ অবাক পৃথিবী ]

‘মার্কো পোলো’ হাতির পাল

১৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘মার্কো পোলো’ হাতির পাল

যাত্রাপথে একটি জঙ্গলে বিশ্রামরত হাতির পাল

কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই চীনের এক পাল হাতি সারা বিশ্বের মনোযোগ কেড়ে নেয়। ইউনানের জঙ্গলের আবাস ছেড়ে টানা ১৫ মাস হেঁটে শেষতক তারা পৌঁছে গিয়েছিল কুনমিং শহর অবধি। হাতির পালের এত লম্বা যাত্রার কথা আগে কখনো শোনা যায়নি। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

কুনমিং। চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য বেশ পরিচিত। তখন এখানেই ছিল চীনের সামরিক ঘাঁটি। মার্কিন বিমানঘাঁটিও। ছিল বার্মা রোডের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল। তবে সম্প্রতি শহরটি পড়ে ছিল এক অদ্ভুত সমস্যায়। প্রতিরক্ষা সাজাতে হয়েছিল এক পাল হাতির বিরুদ্ধে। সেগুলোকে না মেরে শহর থেকে দূরে রাখতে রীতিমতো কোমর বেঁধে নামতে হয়েছিল নগর কর্তৃপক্ষকে। নামিয়ে ছিল পৌনে ৭০০ পুলিশ, ৬২টি জরুরি সেবায় নিয়োজিত ট্রাক আর ১২টি ড্রোন ক্যামেরা। বরাদ্দ করা হয়েছিল ১০ টন খাবার। সেগুলোর লোভ দেখিয়ে যদি হাতিগুলোকে অন্য পথে পাঠানো যায়!

হাতিগুলোর বাসা মূলত মেংইয়াংজি ন্যাচার রিজার্ভে। ইউনান প্রদেশের জিসেনবেনা বনাঞ্চলের অন্তর্গত। এশিয়ার সবচেয়ে বড় বনগুলোর একটি। সেখান থেকে ওরা রওনা দেয় গত বছরের মার্চে। তারিখ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। ধারণা করা হচ্ছে মাসের মাঝামাঝি কোনো সময়ে। তখন ওরা সংখ্যায় ছিল ১৬। ডিসেম্বরে একটি হাতি দলছুট হয়ে যায়। পরে সেটার দেখা মেলে মোজিয়াং প্রদেশের পুয়ের শহরে। আবার জন্ম হয় দুটি বাচ্চার। সব মিলিয়ে পালে হাতির সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭।

১৬ এপ্রিল ওরা পৌঁছায় ইউয়ানজিয়াং প্রদেশের ইউশি শহরে। সেখানে ওদের দেখা মিলতেই শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। কারণ এরই মধ্যে ওরা বাসস্থান থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে চলে এসেছে। ২৪ তারিখ আবার দেখা মেলে ওদের। কিন্তু তখন কমে গেছে দুটি হাতি। পরে জানা যায়, খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়ায় ওরা ফিরে গেছে মোজিয়াং প্রদেশে। বাকিরা অব্যাহত রাখে যাত্রা। বন দিয়ে, খামার দিয়ে, রাজপথ দিয়ে। কুনমিং থেকে ইউশির দূরত্ব মাত্র ৯০ কিলোমিটার। তখন থেকেই তাই নগর কর্তৃপক্ষ ভয় পাচ্ছিল। শেষে সেটাই সত্যি হয়। ২৭ মে তারা পৌঁছে যায় ইশান গ্রামে। কুনমিংয়ের একেবারেই কাছে। বীরদর্পে হাঁটতে থাকে সেখানকার মূল রাস্তা ধরে। শেষে নামে পুলিশ। রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয় সবাইকে। পাঠিয়ে দেয় যার যার বাড়িতে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে একটা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে  যেখানে দেখা যায়, ‘হাতিরা আসছে’ বলতে বলতে সব মানুষ হুড়াহুড়ি করে বাড়ির দিকে দৌড়াচ্ছে। দূরে দেখা যাচ্ছে পুলিশের গাড়ি। তারা অনেক চেষ্টা করেছে হাতিগুলোকে অন্যদিকে পাঠাতে; কিন্তু পারেনি। পুলিশের এই চেষ্টার আগের ৪০ দিনে ইউশিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞই চালায় হাতিগুলো। অন্তত ৪১২টি ঘটনার কথা জানা গেছে। সেগুলোতে নষ্ট হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ বর্গফুট জমির ফসল। সে ক্ষতির পরিমাণ ১০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি। আর ইশানে এসে ওরা রীতিমতো বাড়িতে বাড়িতে ঢুকতে থাকে। বিভিন্ন বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পরে সেসব দৃশ্য। এর মধ্যেই ইশানের পাশাপাশি কুনমিংয়ের নগর কর্তৃপক্ষও মাঠে নেমে পড়ে। কোমর বেঁধে নামে পুলিশও। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে ট্রাক দিয়ে বানানো হয় ব্যারিকেড। খাবার ছড়িয়ে বানানো হয় বিকল্প পথ, যেখান দিয়ে গেলে ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে কম হতে পারে। সেসব অঞ্চলের কয়েক শ পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর মধ্যেই ২ জুন কুনমিংয়ে ঢুকে পড়ে হাতির পাল। তবে কাজ হয় পরিকল্পনায়। উত্তরের বদলে হাতিরা রওনা হয় দক্ষিণ-পশ্চিমে। ৪ জুন তারিখের মধ্যেই তারা সে পথে সাড়ে ছয় কিলোমিটার যায়। সেখান থেকে পশ্চিমে। ৬ তারিখের মধ্যে আরো সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। তারপর আরেকটি হাতি হয় দলছুট।

অবশেষে ৭ তারিখে দলটা থামে। বিশ্রামের জন্য। ফের রওনা দেয় পরদিন রাতে। ছেড়ে যায় কুনমিং। ফিরতি পথ ধরে ইউশির পানে। দলছুট হাতিটা অবশ্য এখনো কুনমিংয়ের কাছেই একটা বনে আছে। তবে সে একা তেমন ক্ষয়ক্ষতি করতে পারবে বলে আর মনে হচ্ছে না। মানে এ যাত্রায় বেঁচে গেল কুনমিং।

তবে সামনে যে আর এমনটা ঘটবে না, সে নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ হাতিগুলোর এই বিস্ময়কর যাত্রার হেতু। ১৯৮৬ সালে এশীয় হাতিকে বিরল প্রজাতির প্রাণীর লাল তালিকাভুক্ত করে এবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজার্ভেশন অব ন্যাচার)। চীন এই প্রাণীকে দিয়ে রেখেছে প্রথম শ্রেণির নিরাপত্তা। কারণ বিশাল দেশটায় এখন হাতি আছেই আর মাত্র শ তিনেক। প্রায় সবই ওই ইউনান প্রদেশের বনাঞ্চলে। এদিক দিয়ে সব ঠিকঠাক থাকলেও গোল বেঁধেছে অন্যত্র। সে কথা জানিয়েছেন বেইজিং নরম্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও হাতি বিশেষজ্ঞ ঝ্যাং লি। বলেন, ‘সমস্যাটা হাতিদের আবাসস্থল নিয়ে। গত ২০ বছরে সেটা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। বনভূমি উজাড় করে বানানো হচ্ছে রাবার ও চা বাগান। ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে হাতিদের আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। সেগুলোর একটা আরেকটা থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে।’

এর সঙ্গে জিসেনবেনার বন কর্মকর্তা লি ঝোংইয়ান যোগ করেন আরেকটা সমস্যার কথা, ‘একই কারণে ওদের খাদ্যাভ্যাসও বদলে যাচ্ছে। আগে ওরা বনে যেসব খাবার খেত, সেগুলো এখন কমে যাচ্ছে। ফলে ওরাও আবাদি শস্যের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। আখ, ভুট্টা খাচ্ছে। ফলে সামনে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে। হাতির পাল জঙ্গল ছেড়ে আবারও নামতে পারে ক্ষেত-খামারে।’

শুরু থেকেই হাতিগুলোকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব ছিল মানুষ। আহবান ছিল তাদের বাঁচানোর। সে কাজ ঠিকঠাক মতোই করেছে কুনমিং ও ইউনানের প্রশাসন। সে কথা এক বাক্যে স্বীকার করে নেন ঝ্যাং লি। তবে সঙ্গে যোগ করেন, ‘এখানেই কিন্তু দায়িত্ব শেষ হয়নি। হাতিদের আবাসস্থল ও তাদের চলাচলের প্রাকৃতিক পথগুলো সংরক্ষণ করা না গেলে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

সাধারণ মানুষ অবশ্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সহজ করেই বলে দিচ্ছে আসল কথা। এই যেমন একজন রসিকতা করে লিখেছেন, ‘হাতিগুলো আসলে কুনমিং যাচ্ছিল জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে যোগ দিতে।’ কথাটা তিনি যে অর্থেই লিখুন না কেন, অক্টোবরের এই সম্মেলনে হাতিগুলোর প্রসঙ্গ যে আসবেই, সেটা এখনই নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায়।

 

তথ্যসূত্র : বিবিসি, সিজিটিএন, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট