kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

স্বপ্ন দেখান বিথী

ইনজুরির কারণে নিজে জাতীয় দলে খেলতে পারেননি। ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি’ গড়ে এখন বিথী গড়ে তুলছেন রংপুরের ২৫০ জন নারী ক্রিকেটারকে। অদম্য বিথীর গল্প বলছেন রাহেনুর ইসলাম

১৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বপ্ন দেখান বিথী

রংপুরে ক্রিকেট স্টেডিয়াম এমনিতেই মুখর থাকে তরুণদের পদচারণে। এখন সেখানে যোগ হয়েছেন আরো আড়াই শ নারী ক্রিকেটার। কেউ আসেন পাঁচ মাইল দূর থেকে, তো কেউ পাড়ি দেন আরো বেশি পথ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচ্ছল মেয়েদেরও স্বপ্ন—যেভাবেই হোক ক্রিকেটার হতে হবে। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে তাঁদের হাতে-কলমে ক্রিকেট শেখাচ্ছেন আরিফা জাহান বিথী। গড়ে তুলেছেন ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি’। ক্রিকেট শেখান একেবারে বিনে পয়সায়। নিজের সঞ্চয়ের প্রায় পুরোটাই খরচ করেন এই আড়াই শ ক্রিকেটারের পেছনে। বিথী নিজেও ক্রিকেটার ছিলেন। খেলেছেন ঢাকার নামি সব ক্লাবে। জাতীয় দলে হতে পারতেন সালমা-জাহানারাদের সতীর্থ। কিন্তু অসুস্থতার জন্য জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে সেই স্বপ্ন। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে আবারও ফিরে আসেন রংপুরে। এখন জাতীয় দলের জন্য তৈরি করতে চান নতুন সালমা-জাহানারাদের।

 

অভাবের সংসার

রংপুরের নূরপুর এলাকায় মা-বাবা ও ভাইকে নিয়ে বসবাস বিথীর। বাবা মফিজুল ইসলাম তেলপাম্পে চাকরি করতেন। সেই চাকরিও এখন নেই। মা মাজেদা বেগম গৃহিণী। বড় ভাই অটোরিকশাচালক। বিয়ে হয়েছে বড় বোনের। ছোট ভাই নবম শ্রেণিতে পড়ছে। অভাবের কষ্ট বিথী বোঝেন ভালোই। সংসারের ঘানি টানতে বাড়ির সামনে মুদি দোকান শুরু করেন মায়ের সঙ্গে। মাধ্যমিকের গণ্ডিটাও পেরিয়ে যান কষ্টেসৃষ্টে। এখন তিনি সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের স্নাতকোত্তরের ছাত্রী।

 

ক্রিকেটে এলেন

স্থানীয় এক কোচের অধীনে ক্রিকেট অনুশীলন শুরু বিথীর। রংপুর জেলার হয়ে ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অংশ নেন ২০১০ সালে। ইনিংসের শুরুটা করতেন দৃঢ়তার সঙ্গে। এরই পুরস্কার পান ২০১২ সালে ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ডাক পেয়ে। খেলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। এরপর লিজেন্ড অব ভাওয়াল ক্রিকেট একাডেমির হয়ে কলাবাগান প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ, ২০১৫ সালে ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট একাডেমির হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ আর ২০১৬ সালে লিগে খেলেন রায়েরবাজার অ্যাথলেটিক ক্লাবের হয়ে।

 

স্বপ্নভঙ্গ

জাতীয় দলের স্বপ্ন দেখছিলেন; কিন্তু বিধিবাম। ২০১৭ সালে প্র্যাকটিসের সময় চোট পান নাকে। ঝরতে থাকে রক্ত। ক্রিকেট খেলা না ছাড়লে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি আছে—বলেছিলেন ডাক্তার। তাই ২২ গজ ছেড়ে ফিরে আসেন রংপুরে। এরপর পরিবারের সিদ্ধান্তে রাজি হয়েছিলেন বিয়ে করে সংসার পাততে। সেখানেও ট্র্যাজেডি। বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন। বিয়ের দিন বরের অপেক্ষায় সেজেগুজে বসে ছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায়, বর আর আসেন না। গভীর রাতে খবর আসে এই বিয়ে হচ্ছে না!

 

আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন

স্বপ্নের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে আগেই। ভেঙে গেল বিয়েটাও। এই জীবনে বেঁচে থেকে আর কি হবে, এমন ভাবনা পেয়ে বসে বিথীকে। তিন-তিনবার চেষ্টা করেছিলেন নিজেকে শেষ করে দেওয়ার। তাঁকে থামান মা ও বোন। বিথী বললেন, ‘জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন যখন দেখছি, তখনই ছাড়তে হলো খেলাটা। বিয়ের শাড়ি-গয়না পরে ছিলাম, বাড়ি ভর্তি আত্মীয়; কিন্তু বর এলো না। আমি নাকি মোটা, কালো। বাবা গরিব! আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছু মাথায় আসছিল না।’

এবার ক্রিকেট একাডেমি

বিয়ে ভাঙার পর আবারও ক্রিকেটে মন দেন। এবার তিনি ভিন্ন ভূমিকায়; খেলোয়াড় গড়ার কারিগর হয়ে। ২০১৮ সালে সবুজ ঘাসে পা রাখেন আবারও। কোচিং জীবনে প্রথম প্রশিক্ষণ দেন বাংলাদেশ হুইলচেয়ার নারী ক্রিকেট দলকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় চালান ছয় দিনের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। একই বছর ঢাকার আরবান স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্রিকেট দলের কোচ ছিলেন দেড় মাসের মতো। এরপরই মাঠের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নারী ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। রংপুরের সালমা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সমাজকল্যাণ বিদ্যাবীথি স্কুল ও কলেজ, মরিয়ম নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ নগরীর আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেয়ে গেলেন ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী। রংপুর জিমনেসিয়ামে ক্রিকেট একাডেমির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর। এতে খরচ হয়ে যায় নিজের জমানো সব টাকা। এটা জানার পর মেয়েকে উৎসাহ দিতে বিথীর মা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দেন ২০ হাজার টাকা। সেই টাকায় বল, ব্যাট, প্যাড, হেলমেটসহ ক্রিকেটের সরঞ্জাম কিনে শুরু তাঁর একাডেমির যাত্রা। বিনে পয়সায় ক্রিকেট শেখা যায় বলে ৩০ জন থেকে দ্রুতই শিক্ষার্থী বেড়ে দাঁড়ায় ২৫০ জনে। শুক্রবার ছাড়া ছয় দিনই বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ চলে এখানে। শুধু রংপুর নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় নারীদের ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দিতে ছুটে যান বিথী। প্রশিক্ষণ বাবদ কিছু সম্মাননাও পান। এখন উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমির পাশে দাঁড়িয়েছেন খুলনা বিভাগীয় হেডকোচ ইমতিয়াজ পিলু। বিথীর একাডেমিকে দিয়েছেন ক্রিকেট সামগ্রী।  অল্প সময়ে সাফল্য পেয়েছেন বিথী। তাঁর একাডেমি থেকে ১১ জন প্রশিক্ষণার্থী বিকেএসপিতে পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পান আটজন। উত্তরাঞ্চল থেকে বিশ্বকাপে ক্রিকেটার উপহার দেওয়ার প্রত্যয় বিথীর—‘আমার অপূর্ণ স্বপ্নটা পূরণ করতে চাই এদের মাধ্যমে। আমার একাডেমি থেকে কেউ না কেউ বিশ্বকাপ খেলবে, এটাই আমার চাওয়া।’

 

মানবিক বিথী

স্বপ্নের পরিধিটা আরো বেড়েছে বিথীর। নিজে বড় হয়েছেন অভাব দেখে। তাই করোনাকালে ছুটে বেড়িয়েছেন রংপুর বিভাগের আট জেলায়। প্রায় চার হাজার গর্ভবতী মাকে ডিম, দুধ, কলা, চাল, ডাল, তেল, আলুসহ পুষ্টিকর খাবার দিয়েছেন। আর্থিকভাবে তাঁকে সাহায্য করেছেন বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়ক তামিম ইকবাল, পেসার রুবেল হোসেন, কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম, জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাহিদা আক্তারসহ আরো অনেকে। সত্ভাবে কাজটা করায় অনেক প্রতিষ্ঠানও নানাভাবে সাহায্য করছে বিথীকে। এভাবেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চান বিথী ক্রিকেটার গড়া আর মানবিক কর্মকাণ্ডে।