kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

বিডেলির রবিনসন ক্রুসো

৩২ বছর ধরে একা একটি দ্বীপে বাস করেছেন। সেখানকার প্রকৃতিকে আগলে রেখেছেন মানুষের অত্যাচার থেকে। অবশেষে দিলেন দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা। মাওরো মোরান্ডির গল্প জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

৪ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিডেলির রবিনসন ক্রুসো

১৯৮৯ সালের কথা। মাওরো মোরান্ডি তখন স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। শারীরিক শিক্ষার। কাজেই শরীরও ছিল চনমনে। কিন্তু মনে শান্তি ছিল না। ‘সমাজের ওপর বিরক্তি ধরে গিয়েছিল। একদিকে ভোগবাদ, অন্যদিকে ইতালির (মোরান্ডির দেশ) রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাই ঠিক করলাম এই সমাজ-সভ্যতা থেকে বহুদূরে চলে যাব। নতুন জীবন শুরু করব প্রকৃতির কোলে।’ বলেন মোরান্ডি। তার জন্য বেছে নেন পলিনেশিয়া। সেখানকার কোনো জনমানবহীন দ্বীপ হবে তাঁর নতুন ঠিকানা। অন্তত শুরুতে পরিকল্পনাটা তেমনই ছিল। তারপর শুরু করেন যাত্রা। সমুদ্রপথে। অবশ্য একা নয়। সঙ্গে শামিল হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন বন্ধু। পথে যাত্রাবিরতি দেন লা মাদালেনা দ্বীপপুঞ্জে। কিছু কাজকর্ম করে বাকি পথের টাকা জোগাড় করাই ছিল উদ্দেশ্য।

কিন্তু সে পরিকল্পনা বদলে গেল লা মাদালেনার বিডেলি দ্বীপে নামার পর। পৃথিবীর বুকে সে যেন এক টুকরো স্বর্গ! তার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মজে গেলেন মোরান্ডি। বিডেলি তখন ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন। দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন এক দম্পতি। তবে তাঁদের মেয়াদ ছিল আর মাত্র দুই দিন। খুঁজছিলেন উপযুক্ত বদলি। এর মধ্যেই এলেন মোরান্ডি। আর বনে গেলেন বিডেলির নতুন কেয়ারটেকার!

সেই থেকে তিনি সেখানেই বাস করছিলেন। একা। যেন রবিনসন ক্রুসোর ইতালীয় সংস্করণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দ্বীপটিতে একটা রেডিও স্টেশন বসানো হয়েছিল। সেটাকেই বানিয়েছিলেন বাড়ি। আর বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন বিডেলিকে। আর দশটা দ্বীপ থেকে একে আলাদা করেছে একটি সৈকত। গোলাপি বর্ণের। অপূর্ব সে রঙের কারিগর মূলত কোরাল আর শামুক। মোরান্ডিকে বেশি পরিশ্রম করতে হতো সেখানেই। আগে এই সৈকত দেখতে গড়ে প্রায় তিন হাজার মানুষ আসত। সেটাই ছিল এই সৈকতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি, ‘তখন মানুষ এত সচেতন ছিল না। কমবেশি সবাই এখান থেকে গোলাপি বালি নিয়ে যেত। বোতলে। গ্লাসে। প্লাস্টিকের ব্যাগে। এই বিস্ময়টাকে বানাতে প্রকৃতির লেগেছে ১০ হাজার বছর। আর মানুষ ধ্বংস করেছে স্রেফ ২০ বছরেই!’

পরে অবশ্য এ নিয়ে কড়াকড়ি নিয়ম করা হয়। গোলাপি সৈকতে বিচরণ একেবারে নিষেধ করে দেওয়া হয়। শুধু দূর থেকে দেখে যেতে পারবে। নৌকায় চড়ে কিংবা পাশের হাঁটা পথ দিয়ে। তবু মানুষের আনাগোনা একেবারে বন্ধ হয়নি। ‘এইতো সেদিনও দুই পর্যটককে ধাওয়া করে তাড়ালাম। গোলাপি সৈকতের একেবারে কাছে চলে গিয়েছিল। অনেকে আবার রাতে এসে হল্লা জুড়ে দেয়। আর মানুষের জঞ্জাল আসা তো বন্ধ হওয়া অসম্ভব। সেগুলোও আমিই পরিষ্কার করতাম।’ ময়লা কুড়িয়ে অবশ্য ফেলার কোনো উপায় নেই। সেগুলোকে বরং লাগাতেন নিত্যদিনের কাজে। এই যেমন একবার ক্রিসমাস ট্রি সাজিয়েছিলেন সাগরে ভেসে আসা জুতা, প্লাস্টিকের ব্যাগ আর শোপিস দিয়ে!

প্রথম দিকে অনেকটা তপস্বীর জীবনযাপন করতেন মোরান্ডি। কাউকে কাছে ঘেঁষতেই দিতেন না। কিন্তু পরের দিকে বদল আসে তাঁর মধ্যে। বুঝতে পারেন, একার ভাবনা স্বার্থপর। দ্বীপের সৌন্দর্যতেও নেই তাঁর একার অধিকার। শুরু করেন পর্যটকদের সঙ্গে মিশতে। তবে শীতকালগুলো একা একাই কাটত। বন্ধ হয়ে যেত পর্যটকদের আনাগোনা। বন্ধু বলতে থাকত শুধুই বই। একেক শীতে পড়ে ফেলতেন ৩০-৪০টি। বলেন, ‘এই দ্বীপে বইগুলোই আমার আসল বন্ধু। ওরা আমাকে কখনোই একা হতে দেয়নি। বই কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করে না; বরং মানুষকে আরো সমৃদ্ধ করে।’

দ্বীপটির প্রতি ভালোবাসার প্রতিদানও পেয়েছেন মোরান্ডি। বলেছিলেন, ‘বিডেলিও আমার ভীষণ যত্ন নিয়েছে। গত ৩২ বছরে একবারের জন্যও অসুস্থ হইনি; এমনকি শীতের দিনের শুকনো কাশিও নয়। যত দিন সুস্থ থাকব, বিডেলি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’

তবে সে কথা আর রাখা হচ্ছে না মোরান্ডির। জটিলতার শুরু ২০১৩ সালে। যখন বিডেলির আগের মালিক দেউলিয়া হয়ে যান। দ্বীপটি কিনে নেন কিউই ধনকুবের মাইকেল হার্ট। কিন্তু বাদ সাধে ইতালির সরকার। বিষয়টি গড়ায় আদালত অবধি। লড়াই চলে সাড়ে তিন বছর। শেষ পর্যন্ত সার্ডিনিয়ার আদালত রায় দেন সরকারের পক্ষে। ব্যক্তিমালিকানাধীন দ্বীপটি হয়ে যায় সরকারি সম্পত্তি। চলে আসে লা মাদালেনা ন্যাশনাল পার্কের অধীনে।

সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় মোরান্ডির চাকরিও। ইতালিতে দ্বীপের কেয়ারটেকার বা এই ধরনের কোনো সরকারি পদবি নেই। তবে সে কথা এত দিন কানেই তোলেননি মোরান্ডি। সোজা বলে দিয়েছিলেন, ‘এখানে থাকার জন্য যা করার আমি তা-ই করব। বিডেলিকে রক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে ইতালির কোনো শহরে গিয়ে তাস খেলে জীবনের শেষ দিনগুলো নষ্ট করব, তেমন মানুষ আমি নই। আমাকে যদি নিয়ে যেতে হয়, বেঁধে নিয়ে যেতে হবে।’

তেমন ইচ্ছা অবশ্য সরকারি দপ্তরের কখনোই ছিল না। কিন্তু তাই বলে তো নিয়ম ভাঙা যায় না! ওদিকে আবার মোরান্ডির সমর্থনে জনমত গড়ে উঠতে থাকে। তাঁকে দ্বীপে থাকার অনুমতি দেওয়ার একটি অনলাইন পিটিশনে সমর্থন জানান ৭০ হাজার মানুষ!

তবে তার আর দরকার হচ্ছে না। নিজেই মত বদলেছেন মোরান্ডি। সম্প্রতি গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, চলে যাচ্ছেন বিডেলি ছেড়ে। তবে বেশি দূরে নয়। লা মাদালেনারই আরেকটি দ্বীপে। উঠবেন সেখানকার একটি সাগরতীরের ফ্ল্যাটে। আর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এখন থেকে আমি ছবি তুলব আরেক জায়গায়। সার্ডিনিয়ার সব জায়গাই ভীষণ সুন্দর।’

তবে আবার বিডেলিতে ফেরার সম্ভাবনা একেবারেই যে নেই, তা-ও নয়। আর তা জানিয়েছেন খোদ লা মাদালেনা পার্কের প্রেসিডেন্ট নিজেই। ফাব্রিজিও ফোনেসু বলেন, ‘আসলে মোরান্ডিকে রাখার মতো কোনো সরকারি পদ নেই। নইলে তাঁকে কে বিডেলি থেকে সরাতে চায়! যদি দ্বীপটির কেয়ারটেকারের পদ বানানো হয়, আমরা অবশ্য তাঁর কথাই ভাবব।’ 

         তথ্যসূত্র : বিবিসি, সিএনএন, গার্ডিয়ান, গ্রেট বিগ স্টোরি



সাতদিনের সেরা