kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

শাহজাহান ও তাঁর সঙ্গীরা

করোনায় মারা যাওয়া নারীদের মৃতদেহ সৎকারে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে চট্টগ্রামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এসআইপিএফ। আলোকচিত্রী মোহাম্মদ শাহজাহান তাঁর পুরস্কার হিসেবে পাওয়া অর্থ দিয়ে চালান সংগঠনটি। লিখেছেন প্রবীর বড়ুয়া

৪ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শাহজাহান ও তাঁর সঙ্গীরা

‘‘ফোন পেয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাজির হলাম। সেখানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হাটহাজারীর রেজিয়া বেগম। করোনার ভয়ে তাঁর কাছে আসছিল না কেউ। রেজিয়ার বড় ছেলেটিও জন্মদাত্রী মাকে শেষবারের মতো দেখছিলেন দূরে দাঁড়িয়ে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মায়ের মৃত্যুসনদ দিল বড় ছেলের হাতে। এরপরের দৃশ্য দেখার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না মোটেই। মৃত্যুসনদ হাতে পেয়েই হঠাৎ উধাও স্বজনরা। মৃত নারীর বড় ছেলে ফোনে বললেন ‘ভাই, আপনারা সেরে ফেলেন।’ এর পর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ।” বলছিলেন এসআইপিএফ মুর্দাসেবা প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান।

রেজিয়া বেগমের লাশ নিয়ে শাহজাহানরা পড়লেন বিপাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে খবর দিলেন। তাঁরাও চেষ্টা করলেন। কিন্তু স্বজনদের কেউই ফোন ধরল না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। অবশেষে পুলিশের সহায়তায় এসআইপিএফ টিমের নারী স্বেচ্ছাসেবীরা যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় মরদেহের গোসল-কাফন শেষ করলেন। মরদেহ অ্যাম্বুল্যান্সযোগে নিয়ে যাওয়া হলো আরেফিননগর সিটি করপোরেশন কবরস্থানে। রাতের আঁধারে রেজিয়া বেগমের দাফন হলো। রেজিয়ার লাশ তো গোসল শেষে দাফন করা গেছে; কিন্তু শুরুর দিকে করোনায় প্রাণ হারানো অনেক নারীর গোসল করানোর স্থান পেতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। যেমন গেল বছর চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন এক নারী। তাঁর গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল শাহজানদের। পরে ডবলমুরিং থানার এসআই ওয়াহিদ রিফাতের প্রচেষ্টায় রাতে আরেফিননগর সিটি করপোরেশন কবরস্থানে গোসলের ব্যবস্থা হয়। গাছের সঙ্গে শাড়ি পেঁচিয়ে পুরো জায়গাটাকে আড়াল করেন স্বেচ্ছাসেবকরা। পরে মোমের আলোয় সেই নারীর গোসল ও কাফন সম্পন্ন করেন।

এসআইপিএফের স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করে চলেছেন নিরলসভাবে ছবি : মোহাম্মদ শাহজাহান

 

এসআইপিএফ

চট্টগ্রামে পুরুষ কেউ মারা গেলে তাঁদের শেষকৃত্যে অনেকে এগিয়ে আসেন। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টা ঠিক উল্টো। গোসল ও কাফনের জন্য দক্ষ নারী সেবাদানকারী খুঁজে পাওয়াই দায় হয়ে পড়ে। এ কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসেন মোহাম্মদ শাহজাহান। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারী স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন শুরু করেন তিনি। যাঁদের কাজ মৃত নারীর শেষকৃত্য সম্পাদনে স্বজনদের সহায়তা করা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে সেবা দিচ্ছেন তাঁরা। শুধু হেল্পলাইনে (০১৮৯২৭৮৫০৫৫) ফোন করলেই অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে যান স্বেচ্ছাসেবীরা। সেবা দেন একেবারে বিনা মূল্যে। মোহাম্মদ শাহজাহান বললেন, ‘নারীর গোসল ও কাফনের কাপড় সঠিক নিয়মে কাটা ও পরানোর প্রশিক্ষিত মানুষের বড় অভাব। যাঁরা আছেন প্রয়োজনের সময় তাঁদের পাওয়াও দুরূহ। এসব কিছু মাথায় রেখেই এমন উদ্যোগ।’

 

পুরস্কারের টাকায় মানুষের পাশে

মোহাম্মদ শাহজাহান পেশায় একজন আলোকচিত্রী। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সলেন নিউজ এজেন্সির হয়ে কাজ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এ পর্যন্ত শতাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইতালির সিয়েনা ক্রিয়েটিভ ফটো অ্যাওয়ার্ড ২০২০, জামার্নির ইন্টিগ্রেটি অ্যান্ড করাপশন ইন আরবান ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন ২০২০, লন্ডনের পিংক লেডি ফুড ফটোগ্রাফি অব দ্য ইয়ার ২০১৯ ইত্যাদি। এ পুরস্কার থেকে পাওয়া অর্থ দিয়েই পরিচালনা করছেন এই সেবামূলক কার্যক্রম।

 

এখন ২০৩ জনের পরিবার

গত বছর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মোট ৩৮৭ জন নারীর মরদেহের ভার কাঁধে নিয়েছেন এসআইপিএফের স্বেচ্ছাসেবীরা। এর মধ্যে ১৮৮ জন মারা গিয়েছিলেন করোনা উপসর্গ নিয়ে। এসআইপিএফের প্রগ্রাম অফিসার সেলিনা কানিজ বলেন, ‘শুরুতে ছিল ১৮ জন। এখন আমাদের স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা ২০৩ জন। করোনায় আক্রান্তদের গোসল ও কাফনের জন্য চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ১৫ জন। এ পর্যন্ত চার হাজারের বেশি নারীর শেষ বিদায়ে সঙ্গী হয়েছি আমরা।’ সংগঠনটিতে শুরু থেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন রাহেলা বেগম। বললেন, ‘প্রথম দিকে ভয় লাগত। এখন সয়ে গেছে। শুরুতে  কেউ কেউ তাচ্ছিল্যও করেছে। কিন্তু এখন এলাকার সবাই আমাদের সম্মান করে। একবার এক কিশোরীকে হত্যার পাঁচ দিন পর তার ত্রিখণ্ডিত মরদেহ পুলিশ খুঁজে পায়। দুর্গন্ধে কাছে আসছিল না কেউ। আমরাই শেষমেষ সেই মরদেহের গোসল-কাফন করাই।’

 

দরকার একটি অ্যাম্বুল্যান্স

বছরজুড়ে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা মৃত নারীর শেষকৃত্য সম্পাদন করেন। পুরো কার্যক্রমটি ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালনা করে আসছেন শাহজাহান। এখন কাজের পরিধি বেড়েছে। ফলে স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য একটি অ্যাম্বুল্যান্স পেলে কাজে সুবিধা হতো বলে জানালেন তিনি।



সাতদিনের সেরা