kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৮ রমজান ১৪৪২

ডেড সি স্ক্রলের রহস্য উন্মোচনে এক বাংলাদেশি

ডেড সির চারপাশে পাহাড়ের গুহা থেকে উদ্ধার করা প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোই ডেড সি স্ক্রল। সম্প্রতি এ নিয়ে একটি গবেষণা দুনিয়াজুড়ে সাড়া ফেলেছে। এই গবেষকদের একজন মারুফ আহমেদ ঢালী। আল সানিকে বলেছেন আবিষ্কারের গল্প

৪ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডেড সি স্ক্রলের রহস্য উন্মোচনে এক বাংলাদেশি

ডেড সির তীরে মারুফ

ডেড সির উত্তর-পশ্চিম তট বরাবর আছে কুমরান গুহা। এখান থেকেই ১৯৪৭ সালে প্রথম আবিষ্কৃত হয় ডেড সি স্ক্রল। এই স্ক্রলগুলোকে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত প্রত্নতাত্ত্বিক নথি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডেড সি স্ক্রল নিয়ে একটি গল্প বেশ প্রচলিত। তামিরেহ গোত্রের এক রাখাল কুমরান এলাকায় মেষ চড়াতেন। এক বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে দেখলেন তাঁর পালের কয়েকটি মেষ নেই। হারিয়ে যাওয়া মেষ খুঁজতে খুঁজতে তিনি পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে হাঁটছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মেষের সন্ধান না পেয়ে বিরক্ত হয়ে তিনি গুহার মধ্যে ঢিল ছুড়তে লাগলেন। হঠাৎ শুনতে পেলেন গুহার মধ্যে কিছু একটা ভেঙে গেল! কৌতূহল জাগলেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় সেদিন তাঁবুতে ফিরে যান। আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পরদিন আবারও যান সেখানে। গুহার ভেতরে ঢুকে  দেখলেন আটটি মাটির বৈয়াম। ভাবলেন গুপ্তধন! তবে এক এক করে খুলতে গিয়ে দেখলেন ছয়টি বৈয়ামই খালি। বাকি দুটি বৈয়ামের একটির ভেতরে কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো আছে অক্ষত দুটি পাণ্ডুলিপি এবং আরেকটি বৈয়াম ভেঙে বেরিয়ে এসেছে একটি পাণ্ডুলিপি।

ধীরে ধীরে এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের ব্যবধানে কুমরান হয়ে উঠে প্রত্নতাত্ত্বিকদের অন্যতম তীর্থস্থান। এসব গুহা থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে অনেক পাণ্ডুলিপি, যেগুলো ডেড সি স্ক্রল নামে পরিচিত। শুধু চার নম্বর গুহা থেকেই আসে প্রায় পনেরো হাজার পাণ্ডুলিপি। ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এসব পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে ইসরায়েলের এন্টিকুয়েটি অথরিটির কাছে।

 

পিএইচডির বিষয় খুঁজছিলাম

ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল প্রত্নতত্ত আর প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে। পড়াশোনা করেছিলাম কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ এবং ঢাকার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে। এরপর উচ্চশিক্ষা নিতে চলে আসি ইউরোপে। ২০১৬ সালে এডিনবরার হেরিওট-ওয়াট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার ভিশনে মাস্টার্স শেষে ভাবতে থাকি পিএইচডির বিষয় নিয়ে। তখন সামনে আসে একটি সার্কুলার—ডেড সি স্ক্রল নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হলে আবেদন করতে বলা হয়। সঙ্গে সঙ্গেই আবেদন করি। কয়েক ধাপ ইন্টারভিউয়ের বৈতরণী পার হওয়ার পর চলে যাই নেদারল্যান্ডসের গ্রুনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে। সেখানেই শুরু ডেড সি স্ক্রল নিয়ে গবেষণা। যোগ দিলাম বিশ্ববিদ্যালয়েরই আরো দুই গবেষক ম্লাদেন পপোভিচ ও ল্যাম্বার্ট শমেকারের গবেষণাদলে। আমাদের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল মূলত কম্পিউটার বেইসড ইমেজ প্রসেসিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ডেড সি স্ক্রলের পর্যালোচনা।

 

ইসাইয়াহ স্ক্রল

প্রায় ৭০ বছরের বেশি আগে পাওয়া পার্চমেন্টগুলোর (চামড়ার লিপি) মধ্যে একটি পাণ্ডুলিপি ছিল প্রায় সাত মিটার লম্বা। এটি ‘ইসাইয়াহ স্ক্রল’ নামে পরিচিত। ইসাইয়াহ আব্রাহামিক ধর্মগুলোর (যুদাইজম, ক্রিশ্চিয়ানিটি, ইসলাম) একজন নবী ছিলেন। ডেড সি স্ক্রলের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এই ইসাইয়াহ স্ক্রল। এটিতে মোট ৫৪টি কলামের লেখা আছে। এত দিন ধারণা ছিল এই পাণ্ডুলিপির পুরোটাই একজনের হাতে লেখা; কারণ ৫৪টি কলামের লেখা দেখতে হুবহু একই রকম। তবে এই ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সে সময় কতজন লিখতে বা পড়তে পারত, তারা কোন ধরনের কালি ব্যবহার করত বা তাদের ইতিহাস জানতে এটি সাহায্য করবে।

 

কাজে নেমে পড়লাম

প্রথমে পাণ্ডুলিপির লেখা কম্পিউটারে প্রসেস করি। অনেক পাণ্ডুলিপি আরমাইক ভাষায় লেখা। আরমাইককে বলা হয় যিশুর ভাষা। প্রাচীন ফিনিশীয় লিপি থেকে আরমেইক লিপির উদ্ভব ঘটেছিল। প্রাচীন আরমাইক ভাষায় ব্যবহৃত লিপিকে অনেকে প্রাগ-হিব্রুলিপিও বলে থাকেন। ধারণা করা হয়, এই লিপির উদ্ভব ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব দশম-নবম শতাব্দীর দিকে। এখন পৃথিবীতে খুব বেশি কেউ আরমেইক ভাষা লিখতে পারেন না। তবে অনেকে আছেন, যাঁরা গবেষণার প্রয়োজনে বলতে পারেন এবং পড়তেও পারেন।

 

এত দিন জানত একজনেরই লেখা

আমাদের হাতে থাকা ডকুমেন্টগুলোর অনেক লেখাই ছিল দুর্বোধ্য। পাণ্ডুলিপি থেকে হাতে লেখা অক্ষরগুলো বের করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রথমে আমরা একটা আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক (বিশেষ কম্পিউটার প্রগ্রাম) ডেভেলপ করি। এই নেটওয়ার্ককে শেখাতে থাকি কিভাবে পাণ্ডুলিপি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অক্ষরগুলো বের করে আনতে হয়। পরে অক্ষরগুলো নিয়ে অনেক প্যাটার্ন রিকগনিশনবেইজড অ্যানালিসিস করি। একটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার বোঝা যাবে। আমরা যখন হাত দিয়ে কোনো কিছু লিখি তখন আমাদের লেখা হাতের নমনীয়তা এবং কবজির নড়াচড়া দ্বারা নির্ধারিত হয়। মেডিক্যালের ভাষায় কবজির মোটর মুভমেন্ট অনেক কিছু নির্ধারণ করে। এই জিনিসটাকেই আমরা একটা কম্পিউটারের ম্যাথমেটিক্যাল মডেলে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। প্রতিটি ক্যারেক্টারের অ্যাঙ্গেল ডিস্ট্রিবিউশন প্রথমে পরিমাপ করেছি। আবার আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের মধ্যে পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করেছি। পরে প্রতিটি অক্ষর ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে অটোমেটিক ম্যাপিং করেছি, একটির সঙ্গে আরেকটির পার্থক্য কতটা তা ধরার জন্য। এমন অনেক তুলনার পরই সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম, পাণ্ডুলিপির প্রথম ২৭টি কলামের সঙ্গে পরের ২৭টি কলামের বেশ পার্থক্য আছে। এটি আসলে দুজনের লেখা। দুজন ব্যক্তি লিখলেও তাঁদের লেখায় অদ্ভুত এক সাদৃশ্য রয়েছে। লেখকরা হয়তো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিলেন। তাঁরা পিতা-পুত্র, গুরু-শিষ্য এ রকম কোনো সম্পর্ক হতে পারে। দুই হাজার ৩০০ বা ৪০০ বছর আগে গুটিকতক মানুষ লিখত। অল্প কিছু মানুষ একজন আরেকজনকে লিখতে বা পড়তে শেখাত। এত দিন পর্যন্ত গবেষকদের ধারণা ছিল, এই গ্রেট ইসাইয়াহ স্ক্রল একজনের হাতেই লেখা। কিন্তু আমরা গবেষণায় দেখলাম, আসলে এটি দুজনের লেখা। কিছুদিন আগে আমাদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত পিএলওস ওয়ান জার্নালে।

 

নব দিগন্তের সূচনা

আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন একটি টুল দিয়েছি, যেটা পক্ষপাতহীন এবং কারোর দ্বারা প্ররোচিত হবে না। এত দিন ধরে মানুষ বলে আসছে এই ইসাইয়াহ স্ক্রল পাণ্ডুলিপিটি একজন মানুষের লেখা। কেউ না কেউ এই লেখার মধ্যে অবশ্যই কিছু পার্থক্য দেখেছে। কিন্তু কাউকেই এই পার্থক্য নিয়ে শক্তভাবে কথা বলতে শোনা যায়নি মূলত সঠিক বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার অভাবে। আমরা চাচ্ছিলাম এমন একটা টুল বানাতে, যেটা শুধু অ্যানালিসিসের ভিত্তিতেই রেজাল্ট দেবে। আমাদের সিস্টেমটি আমরা ডেড সি স্ক্রলের অন্যান্য পাণ্ডুলিপির পরীক্ষায়ও ব্যবহার করছি। এখন যে কেউ যেকোনো প্রাচীন ডকুমেন্টের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করতে পারবে। ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপির গবেষণায় এই কাজ অবশ্যই একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।



সাতদিনের সেরা