kalerkantho

মঙ্গলবার । ১ আষাঢ় ১৪২৮। ১৫ জুন ২০২১। ৩ জিলকদ ১৪৪২

মানুষগুলো সুস্থ হলে ভারি আনন্দ লাগে

কেয়ারগিভার তাঁরা। করোনার এই সংকটকালে পরম মমতায় সুস্থ করে তুলছেন রোগীদের। তাঁদেরই একজন জিল্লুর রহমান। মানুষকে সেবা দিতে গিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। শাখাওয়াত উল্লাহর কাছে বলেছেন সবটা

২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানুষগুলো সুস্থ হলে ভারি আনন্দ লাগে

গত বছরের আগস্ট থেকে কাজ করছি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। করোনা শুরু হওয়ার পর চাকরিটি চলে যায়। স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা আর ছোট ভাইকে নিয়ে আমার পরিবার। আমার আয়েই চলত। হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ায় খুব বিপদে পড়ে যাই। ঋণগ্রস্ত হয়ে গেলাম। এই সময় কেয়ারগিভার হিসেবে কাজের অফার পাই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সংযোগ থেকে। অক্সিজেন মাপা, ইনজেকশন পুশ করা থেকে শুরু করে ক্যানুলা ফিটিং পর্যন্ত নানা প্রাথমিক চিকিৎসা শিখে নিয়েছি। সংযোগ থেকেও প্রশিক্ষণ নিয়েছি।

 

ভালোবেসে তাঁদের সেবা করি

এ পর্যন্ত ১৫ জন রোগীর সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। ১৩ জন সুস্থ হয়েছেন। মারা গেছেন দুজন। কারো ডিউটি করতে হয়েছে দৈনিক ১২ ঘণ্টা; কারো আবার দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা। আর্থিক অনটনে পড়ে এই কাজে যোগ দিয়েছিলাম বটে। কিন্তু কাজ করতে করতে কেমন একটা মায়া পড়ে যায়। একেকজন রোগীর সেবা করতে খুব ধৈর্য আর আন্তরিকতা লাগে। রোগী সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলে তখন ভারি আনন্দ হয়। ভালোবেসে তাঁদের সেবা করি। মনে হয় রোগী ও তাঁর পরিবার যেন আমার আত্মীয়। এই কাজ শুরুর পর থেকে একদিনের জন্যও ছুটি কাটাইনি।

পেয়ার আলী এখন সুস্থ হওয়ার পথে

১৯ এপ্রিল থেকে উত্তর বাড্ডার এএমজেড হাসপাতালে আছি। গুলশানের বাসিন্দা পেয়ার আলী। বয়স ৭২। চাচা বলে ডাকি। তাঁর সেবা করাই আমার কাজ। পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেওয়া, ময়লা পরিষ্কার করে দেওয়া, খাওয়ানো, অক্সিজেন ঠিক আছে কি না দেখা, প্রয়োজনে ডাক্তার ডাকা—এ রকম সব সেবা দিচ্ছি। প্রথম তিন দিন চাচার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ছিল ৯৩-৯৪-র ঘরে। এখন অক্সিজেন লাগছে না। সুস্থ হওয়ার পথে। এখানে রাতে থাকার নিয়ম নেই। তাই দিনের বেলায় আসি। রাতে বাসায় ফিরে যাই। চাচার মেয়ের জামাই সময়ে সময়ে এসে খাবার দিয়ে যান। অন্যরা ফোনে খোঁজখবর নেন। চাচা সচেতন মানুষ। তাই আত্মীয়-স্বজনকে হাসপাতালে আসতে নিষেধ করেছেন।

 

প্রশান্ত চাচা কাছের মানুষ

প্রশান্ত চাচার বয়স আশির মতো হবে। মুগদা হাসপাতালে ১৮ দিন ছিলাম তাঁর সঙ্গে। তিনি মোট ২৫ দিন হাসপাতালে ছিলেন। আমি এক সপ্তাহ পর থেকে তাঁর সেবার সুযোগ পাই। প্রথম দুই-তিন দিন প্রায় অজ্ঞান ছিলেন। ভিডিও কলে যখন কথা বলিয়ে দিতাম, পরিবারের লোকদেরও ঠিকমতো চিনতে পারতেন না। ভিডিওতে কোনো নারীকে দেখলে উনার স্ত্রীর নাম ধরে ডাকতেন। শেষের দিকে আমার সঙ্গে অনেক কিছুই শেয়ার করতেন। মনে হয়েছে, আমার কাছের মানুষ তিনি। কী জানি চাচারও হয়তো তাই মনে হয়েছিল। ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এখন প্রায় প্রতিদিন ফোনে আমার খোঁজখবর নেন। বাসায় যেতে বলেন।

 

অনেকেই বাসায় যেতে বলেন

কিছুদিন আগে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ছিলাম সাহাব উদ্দিন আংকেলের সঙ্গে। তাঁর বয়স ৬৮ বছর। সপ্তাহখানেক পর তিনিও সুস্থ হয়ে বাসায় গেছেন। আমাকে এখন নিজের ছেলের মতো জানেন। খোঁজখবর নেন। বাসায় যেতে বলেন। আমারও ইচ্ছা করে একটু দেখে আসি। কিন্তু করোনা রোগীর সেবা করি বলে কারো বাসায় যেতে পারি না।

করোনা রোগী বাদেও অন্য একজন রোগীর সেবার দায়িত্ব পেয়েছিলাম। পল্টনে সেই চাচার বাসায় ছিলাম টানা ৩০ দিন। তিনি প্যারালাইজড ছিলেন। কথা বলতে পারতেন না। দিনে চারবার ডায়াপার পরিষ্কার করতে হতো। মাঝে মাঝে এপাশ-ওপাশ করাতে হতো। এসব মানুষের সেবা করতে আমার মোটেও কষ্ট হয় না। বরং তৃপ্তি লাগে, আনন্দ লাগে।

 

মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে

জীবনের সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম এ মাসের শুরুতে; এক চাচাকে সেবা দিতে গিয়ে। তিনি কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। উনার ছেলে ফোন করেছিলেন। আমি তখন অন্য একটি হাসপাতাল থেকে মাত্র কাজ শেষ করে বাসায় এলাম। ভেবেছিলাম এক দিন রেস্ট নিয়ে পরে যাব। চাচার ছেলে অনুনয়ের সুরে বললেন, ‘আপনি না এলে রোগী একা থাকবে।’ তাই রাতেই চলে এলাম। চাচার বয়স ৬৪ বছর। অক্সিজেন লাগত ১৫ লিটার। অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে ভেবে আমি উনার ছেলেকে বলেছিলাম কেবিনের ব্যবস্থা করতে। তিনি করেননি। ওয়ার্ডে খুব কষ্ট করে থাকতে হয়েছে। উনার ছেলে ও ছেলের বউ ডাক্তার। কিন্তু একবারের জন্যও কেউ লোকটিকে আর দেখতে আসেননি। চাচার মৃত্যুর আগের দিন ডাক্তাররা বলেছিলেন আইসিইউ লাগবে। আমি জানানোর পর উনার ছেলে বললেন, ‘ডাক্তাররা এ রকম বলে!’ চাচা যেদিন মারা যাচ্ছেন সেদিন অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। অনেক ছটফট করছিলেন। আমি ফোনে বারবার অনুরোধ করার পর সেই ছেলে রাত ১টার কিছুক্ষণ পর এলেন। আর রাত ২টার দিকে চাচা মারা গেলেন। ছেলেটা নিজে ডাক্তার হয়ে বাবার জন্য আইসিইউর চেষ্টাটা পর্যন্ত করলেন না। অথচ চাচা ছেলের জন্য ছয়তলা বাড়ি রেখে গেছেন। এই ঘটনা আমাকে খুব পীড়া দেয়।

 

সংযোগ সম্পর্কে

‘সংযোগ : কানেক্টিং পিপল’ একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় তাদের ‘কেয়ারগিভার’ সার্ভিস। সংযোগের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী আহমেদ জাভেদ জামাল। তিনি জানান, গত বছর মার্চ মাসে কভিড রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। প্লাজমা ডোনার, অক্সিজেন সেবা থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে সংযোগ থেকে। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে কয়েকজন রোগীর স্বজন কেয়ারগিভার চাচ্ছিল। অনেকে আবার চাকরি, টিউশনি বা আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করত।

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো কেয়ারগিভার নেই। ভাবলাম, প্রশিক্ষণ দিয়ে কিছু কেয়ারগিভার তৈরি করি। সংযোগের ‘কেয়ার গিভার’ ইউনিটের সমন্বয়ক সাদিয়া শামীম।

তিনি জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, গাজীপুরে কেয়ারগিভার আছেন ২৫ জন। এ পর্যন্ত শখানেক মানুষকে সেবা দিয়েছেন তাঁরা। দিন দিন চাহিদা বাড়ছে। এই মুহূর্তে নারী কেয়ারগিভারের চাহিদা বেশি। রোগীরা সামর্থ্য অনুযায়ী কেয়ারগিভারদের সম্মানী দেয়। কেয়ারগিভার ছাড়াও সারা দেশে চার শতাধিক অক্সিজেন সিলিন্ডার সেবাও দিচ্ছি আমরা।

যোগাযোগ

০১৯১১৫৪৯৫১৯, ০১৬৮৪৮৪২১৮১