kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

আমাদের ওই বাড়িতে ফুল ফুটেছে

শাহিরয়ার সালাম   

২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমাদের ওই বাড়িতে ফুল ফুটেছে

আমেরিকায় বৈশাখ নেই। ওখানে বর্ষার দেখাও সব জায়গায় মেলে না। সেপ্টেম্বরতক ওরা বসন্ত ধরে। শীতে ওখানে বরফ নামে। মানুষ তখন বসন্তের স্মৃতি গুনে সময় পার করে। বসন্ত সত্যি এখানে সুবাসিত, সুনির্মল ও সুখের। করোনাও ঠেকাতে পারছে না ছুটির দৌড়। ফুলের বাহারি রঙে চোখ তো বটেই, হৃদয়ও জুড়ায়। আমি ভেবে কূল পাই না, কবিগুরু ‘আহা আজি এ বসন্তে’ গানটিতে কোথাকার কথা বলেছেন। তিনি ১৯১২ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে পাঁচবার মার্কিন মুলুক ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে একবার যে এপ্রিলে তা নিশ্চিত হতে পেরেছি। আমিও এই এপ্রিলে নিউ ইয়র্কে আছি।

 

ফুলের বাহার

ইউরোপ আর আমেরিকার আরো দেশেও ম্যাগনোলিয়া পাওয়া যায়; কিন্তু ফ্লোরিডা আর টেক্সাসকেই এর আদি বাড়ি ধরা হয়।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সৌন্দর্যে দিশা হারিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি এর নাম রেখেছিলেন উদয়পদ্ম। আগেও এর একটা নাম ছিল, হিমচাঁপা। নিউ ইয়র্কের রাস্তা, বাড়ি, অবকাশ যাপনকেন্দ্র, কলকারখানা—সর্বত্রই ম্যাগনোলিয়ার অধিষ্ঠান। বসন্ত রাঙায় ম্যাগনোলিয়া। একে সঙ্গ দেয়  টিউলিপ, ড্যাফোডিল, প্রিমরোজ বা হায়াসিন্থ। রাস্তার পাশে, বাড়ি বা অফিস-কারখানার সামনে-পেছনে, পার্কে কিংবা কোনো অবকাশকেন্দ্রে—কোথায় নেই ম্যাগনোলিয়া। কন্যাদের নিয়ে উঠেছি আপস্টেটে ভাইয়ের পেল্লায় বাড়িতে। অপেক্ষায় ছিলাম ম্যাগনোলিয়া ফোটার। আমাদের উঠানেই বিশাল একটা ম্যাগনোলিয়াগাছ। হ্যাঁ, বিশাল বলতেই ভালো লাগছে। কারণ ম্যাগনোলিয়ার গড় উচ্চতার চেয়ে এটি বেশ উঁচু। গাছটির বয়স কম করেও ৩৫-৪০ বছর হবে। এর মধ্যে কুড়িটি বছর ধরে একে আগলে রেখেছেন শামসুল আলম। তিনি একজন তথ্য-প্রযুক্তিবিদ। তবে নিজেকে ম্যাগনোলিয়াবিদ বলতেও ভালোবাসেন। ম্যাগনোলিয়ার ১৩০টির মতো জাত আছে। তিনি এগুলোর অর্ধেকই চেনেন। বাড়ির সামনে-পেছনে, উত্তরে-পুবে কোথায় ম্যাগনোলিয়া নেই? বাড়িটির এক ধার তো নকশি কাঁথার মতোই ঢেকে দিয়েছে ম্যাগনোলিয়া। আলেকজান্দ্রিয়া শসার নামের এক জাতের ম্যাগনোলিয়া এ বাড়িতে বেশি। শামসুল আলম বলছেন, বসন্তে তো বটেই, সারা বছরই এটি আমাকে মুগ্ধ করে। গ্রীষ্মের শেষে এর ফুল ঝরে যায়। শরতে গাছটায় সবুজ পাতা ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা দেয়। শীতে খুবই অসহায় লাগে একে। তখন ম্যাগনোলিয়া নির্লিপ্ত, নির্বাক, নিঃসঙ্গ। তবে তুষার ঢাকা ম্যাগনোলিয়া একটা ধবলরূপে প্রকাশিত হয় সে সময়, সেটাও অনন্য।

 

মেয়েরা বিষম খেয়েছিল 

নিউ ইয়র্কের প্রায় সব বাড়িতেই ম্যাগনোলিয়া দেখবেন। বেশির ভাগ মানুষই একে সযতনে লালন করেন। তবে কেউ কেউ গ্রীষ্মের শেষে পাতা কুড়ানোর ঝামেলা এড়াতে কেটেও ফেলেন। এটা অবশ্য ঠিক যে ঝরা পাতা গোছগাছ করা একটা দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার আর ব্যয়বহুলও বটে। তবে ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, ম্যাগনোলিয়া ভালোবাসে না এমন লোকের সংখ্যা বেশি নয়। ম্যাগনোলিয়াগাছ যত বড়, ফুলও তত বেশি। ডালপালা, পাতাও সমানতালে বেশি। সেই সঙ্গে সুন্দরের দেখাও মেলে ঢের। আর খরচও বাড়তে থাকে। আমাদের বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে মন চাইবে সবারই। অন্তত দুদণ্ড দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছা করবে। বাড়তি পাচ্ছেন পাখির কলকাকলি। ভাইয়াকে প্রেরণা জোগান তাঁর মমতাময়ী মা ও স্ত্রী সাজিয়া আলম। এমনিতেই আপস্টেট  পাহাড়ঘেরা সবুজ এলাকা। পরিবেশ শান্ত-সুনিবিড়। আপস্টেটের রকল্যান্ড কাউন্টিতে আমাদের এই বাড়ি। ম্যানহাটান থেকে ঘণ্টাখানেক গাড়ি চালালেই হয়ে যায়। জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজটা পার হলেই কিন্তু দেখা মেলে অন্য এক নিউ ইয়র্কের। আমাদের ম্যাগনোলিয়ার নিচে বন্য প্রাণী (যেমন হরিণ) বিশ্রাম নিতে দেখে আমার কন্যারা সত্যি বিষম খেয়েছিল। আমাদের মালিবাগের বাড়িতে এটা কখনোই ওরা দেখেনি, দেখার আশাও করে না।

 

আরো ম্যাগনোলিয়া

আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কনফেডারেট আর্মির প্রতীক ছিল ম্যাগনোলিয়া। মিসিসিপির জাতীয় গাছ ম্যাগনোলিয়া। সেখানকার পতাকায়ও আছে ম্যাগনোলিয়া। এরপর লুইজিয়ানার জাতীয় ফুল এটি। বাতজ্বর ও ম্যালেরিয়ার ওষুধ তৈরিতেও ম্যাগনোলিয়া ফুলের ব্যবহার আছে বলে শুনেছি।