kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

সফিউদ্দিন আহমেদ সংগ্রহশালা

এত দিন দেশে দুটি মোটে সংগ্রহশালা ছিল। নতুন একটি যোগ হলো সেদিন। তিন চিত্রশিল্পীর সংগ্রহ নিয়ে দেশে এখন তিনটি সংগ্রহশালা। উদ্বোধনী দিনেই শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ সংগ্রহশালা দেখে এসেছেন মোহাম্মদ আসাদ

১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সফিউদ্দিন আহমেদ সংগ্রহশালা

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও শিল্পী এস এম সুলতান সংগ্রহশালা তৈরি হয়েছে সরকারি উদ্যোগে। নতুন সংগ্রহশালাটি গড়ে তুলেছেন এক শিল্পী দম্পতি। আহমেদ নাজির ও নাহিদা শারমিন। নাজির শিল্পী সফিউদ্দিনের ছোট ছেলে। সংগ্রহশালায় সেগুলোই যোগ হয়েছে, যা নাজির পেয়েছেন সন্তান হওয়ার সূত্রে। ধানমণ্ডির ৪ নম্বর সড়কের ২১/এ বাড়ির দোতলার পুরোটায় গড়ে উঠেছে এই সংগ্রহশালা।

 

জীবনযাত্রা

‘মেলার পথে’ নামের বিখ্যাত ছাপচিত্রটির কাঠে খোদাই করা দুটি প্লেট দেখলাম পর পর। একটিতে আলোছায়া মনমতো হয়নি বলে শিল্পী সেটির ছাপ নেননি। অথচ এমন প্লেট (পাত) তৈরি করতে অনেক কষ্ট ও সময় যায়। সংগ্রহশালার প্রথম ঘর দুটিতেই দেখবেন শিল্পীর চিত্রকর্ম বা শিল্পকর্ম। খুব শান্ত জীবন ছিল তাঁর। মানুষটি ছিলেন দীর্ঘ দেহের অধিকারী। শেষ বয়স পর্যন্ত মাথাভর্তি চুল ছিল। দেশের পথিকৃৎ শিল্পীদের একজন ছিলেন তিনি। তাঁর মহত্ত্ব শুধু কাজে নয়, ব্যক্তি মানুষটির মধ্যেও ছিল পুরোপুরি। খুব কমবার তিনি ক্যামেরার সামনে বসেছিলেন। নিজের কথা বলতেও বেশি পছন্দ করতেন না। বস্তুত কারোর বা কিছুর কথাই তাঁকে বেশি বলতে শোনা যায়নি। তিনি যেন সেই নিমগ্ন মানুষ, যে ধ্যানী শিল্পীও। ছাত্রজীবনে আঁকা জলরঙের কাজ অনুরাগীদেরও দেখার সুযোগ বেশি মেলেনি; কিন্তু সংগ্রহশালায় আছে। আছে তেলরং, চারকোলেরও কাজ। সময় ধরে ধরে সাজিয়েছেন উদ্যোক্তারা। শিল্পীর অগ্রগতি বুঝতে সহজ হয়।  কলকাতার ভবানীপুরের নন্দন রোডে তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯২২ সালে। তাঁর পিতামহের ডাকনাম ছিল বেচু। পেশায় ছিলেন ডাক্তার। খুব নাম করেছিলেন বেচু ডাক্তার। তাইতো তাঁর বাড়ির পাশের গলিটির নাম রাখা হয়েছে বেচু ডাক্তার লেন। সচ্ছল ও সাংস্কৃতিক এক পরিবার ছিল সফিউদ্দিনদের। তাঁর বাবা একতারা ও দোতারা বাজাতে পারতেন। বড় বোন গাইতেন গান। সফিউদ্দিন নিজেও রীতিমতো ওস্তাদ রেখে সেতারবাদন শিখেছিলেন। খেলাধুলায়ও ভালো ছিলেন। কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৩৬ সালে। নানা জায়গা ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকতেন। ছবি খুঁজে বেড়িয়েছেন বিহারের মধুপুর, দেওঘর, গিরিডি আর চাইবাসাতেও। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই মানে বিয়াল্লিশ, তেতাল্লিশ আর পঁয়তাল্লিশে গিয়েছেন সাঁওতাল পরগনার দুমকায়। তাঁর বিখ্যাত মেলার পথে ছবিটি ওই সময়েই করা। আর্ট স্কুলের শেষ দিকে তিনি ছাপচিত্রকেই প্রধান বিষয় করেন। রপ্ত করেন এনগ্রেভিং আর লিথোগ্রাফ। সেই সঙ্গে ম্যুরালেও দক্ষতা অর্জন করেন। স্কুল শেষ করে ১০ বছর শিক্ষকতা করেছেন। তারপর ১৯৫৬ সালে আরো পড়তে যান লন্ডনে।

 

বিনীত ছাত্র আবার

১০ বছর যে শিক্ষকতা করেছেন তা বুঝি ভুলেই গিয়েছিলেন সফিউদ্দিন। মনোযোগী ছাত্র হয়ে ওঠেন আবার লন্ডনে। আধুনিক ছাপচিত্রের জনক স্ট্যানলি হেটারের সঙ্গে তাঁর কথা বলার সুযোগ হয় সে সময়। পড়ার ফাঁকে তিনি ইউরোপের দেশগুলো বেড়িয়েছেন। এবার ছবি দেখতে নয়, পড়তে। ফ্রান্সে যে ল্যুভ আছে কে না জানে। ইতালির উফিিসও মশহুর। অনেকে এটাও জানেন রেমব্রাঁ, ভারমিয়ের, ব্রুগেল বা গখ ছিলেন ডাচ্। আর্নস্ট, রিখটার, পল ক্লি আর হফম্যানের ছবিই বা না দেখে কিভাবে বসেন সফিউদ্দিন। তাই জার্মানিতেও গেলেন। ফিরে এসে ১৯৪৬ সালে ছাপচিত্র নিয়ে পড়াতে থাকলেন। সাতচল্লিশে দেশ ভেঙে গেলে সফিউদ্দিন ঢাকায় আসেন এবং কলেজিয়েট স্কুলে ড্রইংয়ের শিক্ষক হন। তারপর জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস, ঢাকা প্রতিষ্ঠা করলেন। হলেন ছাপচিত্রের শিক্ষক। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬৩ সালে কলেজে রূপান্তরিত হয়। ওই কলেজ থেকেই তিনি ১৯৭৯ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন। যদিও ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতা করে গেছেন। কখনো সংখ্যাতিরিক্ত শিক্ষক, কখনো বা খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে।

 

পুরস্কারও অনেক পেয়েছেন

১৯৩৯ সাল থেকে পুরস্কার পাচ্ছেন সফিউদ্দিন। তারপর ১৯৪৪, ১৯৪৫, ১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৬৩ সালে বড় সব পুরস্কার পেয়েছেন। কোনোটা দিয়েছেন রাজা, কোনোটা বা প্রেসিডেন্ট। এর মধ্যে স্বর্ণপদকও আছে। অবসর নেওয়ার পর তিনি সম্মাননাও পেয়েছেন ডজন ডজন। ১৯৭৮ সালে পেয়েছিলেন একুশে পদক আর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯৬ সালে। সেই সাতচল্লিশেই লন্ডনে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। প্রথম একক প্রদর্শনীও হয়েছে লন্ডনে ১৯৫৯ সালে। সুধীজন তাঁকে প্রচারবিমুখ, নিভৃতচারী, রুচিশীল, সংগীতানুরাগী, সাহিত্যপিপাসু এবং মুক্তদৃষ্টির অধিকারী বলতে কার্পণ্য করেননি কখনো। সেই সঙ্গে আরো বলেছেন, সফিউদ্দিন নিরহংকারী, বিনয়ী ও প্রখর নীতিবোধসম্পন্ন। শিল্প ছিল তাঁর সাধনা, তাই নিজের সৃষ্টিকে পণ্যসামগ্রী করে তোলেননি কখনো। নিজেকে বারবার অতিক্রম করতে চেয়ে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন। এই যে এত দীর্ঘ যাত্রা, কতটুকুই বা ধরতে পারে সংগ্রহশালা। তবু যতটা পেরেছে তা-ই ঘুরে দেখি চলুন।

 

শিল্পীর জগৎ

ছবির ঘরগুলো পার হলে পাচ্ছেন প্রিন্টমেকিং স্টুডিও। প্রথমেই দেখবেন একটি আধুনিক ছাপযন্ত্র। উদ্যোক্তারা নিশ্চিত করেছেন, তরুণ শিল্পীরা এখানে নিয়ম মেনে কাজ করার সুযোগ পাবেন। ধারেই দেখবেন ছাপচিত্রে প্রয়োজন হয় এমন সব জিনিসপত্র। যেমন—কাটার, হিটগান, স্ট্যাম্প প্যাড, পেপার সোকিং টাব (কাগজ ভেজানোর জন্য) ইত্যাদি। এখানকার দেয়ালেও শিল্পীর বহু রকমের

ছাপচিত্র দেখবেন। এরপর পাবেন তাঁর ব্যবহার্য উপকরণ। প্রিন্ট প্লেট আর প্লেট তৈরির যন্ত্রপাতি এগুলোর অন্যতম। জলের নিনাদ নামের শিল্পীর সমাদৃত ছাপচিত্রের প্লেটও দেখবেন। পুরনো একটি ছাপযন্ত্রও দেখার সুযোগ হবে। এটি তিনি সাতচল্লিশে কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছিলেন। এবার চলুন তাঁর রংতুলি দেখি। কাছে আরো দেখবেন আলো প্রক্ষেপণ যন্ত্র, ছবি বড় করার এনলার্জার। কিছু ড্রইং খাতা আর পেনসিল-চারকোল দেখতে ভুলবেন না।

 

এবার সফিউদ্দিন ব্যক্তিগত

শেষ দিকের ছোট্ট ঘরখানায় ছোট্ট একটি বাক্স পাবেন। তাতে আছে শিল্পীর শখের সোনার ঘড়িখানি। তারপর আরো কিছু হাতঘড়ি ও চশমা। চশমা ছাড়া সফিউদ্দিনকে আসলেই বেশি লোক দেখেনি। রুপার ধূপদানি আর আতরদানিও শিল্পী যত্নের সঙ্গেই ব্যবহার করতেন। তাঁর বইগুলোও আছে তাকের মধ্যেই। বিয়ের আগে কেনা তাঁর ড্রেসিং টেবিলটি পাচ্ছেন, প্রথম জীবনে কেনা আলমারি পাবেন, এই সঙ্গে শেষ জীবনে ব্যবহৃত আসবাবপত্র। আমরা এতক্ষণে শেষ ঘরটায় পৌঁছলাম। এখানে শিল্পীর একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ আরো অনেক স্মারক আছে। এই ঘরের দেয়ালে ঝুলছে ভিন্ন এক রতন। শিল্পীর তোলা আলোকচিত্রগুলো আপনাকে ১৯৫৪-৫৫ সালের বন্যা দেখিয়ে দেবে। বাহাত্তর সালে গিয়েছিলেন খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল দেখতে। সেখানকার কিছু ছবিও দেখবেন। ২০১২ সালে শিল্প সাধক সফিউদ্দিন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন।