kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

নাম লেখালেন তাহমিদ

৬০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম। বাংলাদেশি একজন নির্বাহী পরিচালক পেল আইসিডিডিআরবি। ল্যানসেট সাময়িকীও লিখেছে ড. তাহমিদ আহমেদকে নিয়ে। পিন্টু রঞ্জন অর্ক শুনে এসেছেন সবটা

১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নাম লেখালেন তাহমিদ

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। বাড়ি ময়মনসিংহ। মা জাহানারা বেগম। বাবা আফাজ উদ্দিন আহমেদ। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা মারা গেলেন। তিনি ছিলেন অর্থনীতিবিদ। আমার আদর্শ। যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে মাস্টার্স শেষে পিএইচডিতে নাম লিখিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে এসে আর ফিরতে পারেননি।

 

মায়ের জন্য

সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল এবং নটরডেম কলেজের ছাত্র ছিলাম। ইচ্ছা ছিল ভূতাত্ত্বিক হওয়ার কিন্তু মা চাইলেন, ডাক্তার হই। শেষে ১৯৮৩ সালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করি। ঈশ্বরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ পাই। ১৯৮৪ সালে অসুস্থ হয়ে পড়লেন মা। ঢাকায় তাঁকে দেখার কেউ নেই। পরে ঢাকায় চলে এলাম। আইসিডিডিআরবিতে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগ দিলাম।

 

নাইট ডিউটির পর

আইসিডিডিআরবির হাসপাতাল তখন একটা নির্মাণাধীন ভবনের নিচতলায়। রাতভর রোগী দেখতাম। গরম লাগত খুব। ডিউটি শুরুর আগে দুই বোতল কোমল পানীয় নিয়ে গিয়ে ফ্রিজে রাখতাম। তবে ভালো একটা গ্রন্থাগার ছিল আইসিডিডিআরবির। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সেখানে গিয়ে পড়তাম। রোগীর উপসর্গের সঙ্গে বইয়ের লেখা মিলিয়ে দেখতাম। নানা সভা-সেমিনার হতো। তাই কোনো কোনো দিন নাইট ডিউটি শেষেও রয়ে যেতাম।

 

একটা ঘটনা

আশির দশকে দেশে অনেক শিশু ছিল অপুষ্ট। লিকলিকে বাচ্চাগুলোকে দেখলেই মায়া লাগত। অসুস্থ বাচ্চাটাকে সারিয়ে তুলতে পারলে এমন ভালো লাগত যে বলার নয়। টাইফয়েডেরও খুব প্রকোপ ছিল। কারো কারোর ক্ষেত্রে অসুখটি মস্তিষ্কেও আঘাত হানত। রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা কঠিন ছিল। একদিন এমনই এক রোগী পেয়েছিলাম। মাহবুবা তার নাম। বয়স ১৬ হতে পারে। চোখের সামনেই অজ্ঞান হয়ে গেল। সিনিয়র ডাক্তার নূর হক আলম বললেন, মেয়েটাকে স্টেরয়েড দিতে পারো। দিয়ে দেখি ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। আমার খুব খুশি লাগল।

 

 

গবেষণা জীবনের শুরুর দিকে

একটা পর্যায়ে বয়স্কদের অগ্ন্যাশয়ে (প্যানক্রিয়াস) কলেরা কী প্রভাব ফেলে তা দেখতে চাইলাম। নমুনা—রোগী আগের দিনই ঠিক করে রাখতাম। তিনমুখো বিশেষ ধরনের নল রোগীর পেটে ঢোকাতাম। এক্স-রের মাধ্যমে নলের অবস্থান খতিয়ে দেখতাম। ট্রায়াল অ্যান্ড এরর শেষ করতে করতে ঘণ্টা পার হয়ে যেত। রক্ত, অগ্ন্যাশয় রসসহ একেকজন রোগী থেকে ১৩৪টা নমুনা নিতাম। খুব খাটুনি যেত কিন্তু শিখতামও অনেক।

 

জাপানে ছিলাম

ইউনিভার্সিটি অব সুকুবায় যখন পিএইচডি করতে গেলাম তখনকার জাপানে শিশুদের অ্যালার্জি হচ্ছিল বেশি বেশি। অধ্যাপক হিতোশি তাকিতা বললেন, এ নিয়ে কাজ করতে পারো। অনেকেই হয়তো জানেন, জাপানে ডিম সস্তা। মায়েরা বাচ্চাদের টিফিনে ডিম দিত। আমি গবেষণা করে দেখলাম, অ্যালার্জির কারণ ওই ডিমগুলোই। নিজেকে বাহ্বা দিতে যাওয়ার আগেই অধ্যাপক বললেন, পিএইচডি করে কিন্তু তুমি গবেষক হয়ে যাওনি। শুধু মেথডটা (পদ্ধতিটা) জেনেছ। আমরা তোমার চিন্তাটাকে একটা অর্ডারে (বিন্যাস) আনলাম মাত্র। দেশে ফিরে শিশু ও নারীর অপুষ্টি, নিউমোনিয়া, টিবি, কলেরা ইত্যাদি নিয়ে কাজ শুরু করলাম।

 

শিশুমৃত্যু কমে এলো

এই শতকের গোড়ার দিকেও অনেক শিশু আসত যারা তীব্র অপুষ্টি ও রাতকানা রোগের শিকার। কারো কারোর অবস্থা তো এমনও ছিল যে মনে হতো চোখ গলে যাচ্ছে। এটা নিয়ে আমরা গবেষণা শুরু করলাম। সেই গবেষণার ফলাফল মা এবং অল্পবয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর সরকারি কার্যক্রম জোরদারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তখন পৃথিবীজুড়েই শিশুমৃত্যুর হার ছিল মারাত্মক। আমরা পর্যালোচনা করতে বসলাম, রোগীদের কী কী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এক পর্যায়ে ডায়রিয়া এবং তীব্র অপুষ্টি নিয়ে আসা রোগীদের জন্য  নির্দিষ্ট একটি চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করলাম। শুরুতে ভয়ে ভয়েই ছিলাম। তবে একসময় দেখা গেল, মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। পরে ল্যানসেটে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রশংসা করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।

 

উগান্ডার কথা কিছু

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুষ্টি বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দলের সদস্য হয়ে কাজ করেছি সুদান, দক্ষিণ সুদান, লেবানন, আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার এবং উত্তর কোরিয়ায়। ২০০২ সালে আমন্ত্রণ পেলাম উগান্ডার মুলাগো হাসপাতাল থেকে।  সেখানে গিয়ে দেখি অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা ঠিকমতো খাবারই পায় না। হাসপাতালের চিফ স্টোর অফিসারকে বাচ্চাদের করুণ অবস্থা এবং শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি ব্যাখ্যা করে বললাম, এই শিশুদের তুমি কিভাবে সাহায্য করতে পারো? তিনি দ্রুতই হাসপাতালের বরাদ্দ থেকে খাবার সরবরাহ করতে সম্মত হন। আরো পরে ওদের ম্যাট্রন (হাসপাতালের কাজকর্ম দেখাশোনা করেন এমন ব্যক্তি) আর নার্সদের আইসিডিডিআরবিতে এনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। তাঁরা খুব মন দিয়ে শিখেছিলেন। উগান্ডা ফিরে গিয়ে অনেক কিছু বদলেও দিয়েছিলেন। ইউনিসেফের হয়ে দক্ষিণ সুদানেও গিয়েছিলাম একবার। তখনো যুদ্ধ চলছিল কোথাও কোথাও। কিন্তু ডাক্তাররা শেখায় ফাঁকি দেননি। তারপর উত্তর কোরিয়ায় গিয়েছিলাম ২০১৩ সালে। মাইনাস ৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল। কানঢাকা টুপি পরে ট্রেনিং দিচ্ছিলাম। দুটি হিটার লাগানো হয়েছিল রুমে। এর মধ্যেও ডাক্তারদের জানার আগ্রহ দেখে অবাক হয়েছিলাম। নির্ধারিত সময়ের পরেও অতিরিক্ত দুই দিন ক্লাস নিয়েছিলাম।

 

দেশেই রয়ে গেলাম

২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলাম। জেনেভায় গিয়েছিলাম কাজের ধরন এবং সুযোগসুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নিতে। এর মধ্যে একদিন আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালকের ফোন পেলাম। বললেন, ‘পরিচালনা বোর্ড মনে করে তোমার হাসপাতালের চার্জ (দায়িত্ব) নেওয়া উচিত। জেনেভার চেয়ে তোমাকে এখানেই বেশি দরকার।’ আমি সাতপাঁচ ভেবে দেশেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। আইসিডিডিআরবির নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেস বিভাগে জ্যেষ্ঠ পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে। হাসপাতালের খরচ কমানো, মান ভালো করা, ক্লিনিক্যাল রিসার্চ বাড়ানোসহ আরো কার্যক্রম হাতে নিলাম। ‘কোয়ালিটি অব কেয়ার’ বোঝার কিছু মাপকাঠি নির্ধারিত হলো যেটি এখনো চলছে। একসময় ডাক্তাররাও প্রশিক্ষণ নিতে আগের চেয়ে বেশি উৎসাহী হয়ে উঠলেন। কর্মীদের বিশ্বাস করাতে পেরেছি যে রোগীরাই অগ্রগণ্য। তাই তাঁদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশি তরুণ গবেষকদের গবেষণার প্রতি আগ্রহ ও দক্ষতা বাড়াতে একটি মেন্টরশীপ প্রগ্রাম পরিচালনা করছি অনেক বছর হলো। গেল ফেব্রুয়ারিতে আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিলাম।

 

এখন আরো যা করছি

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জেফরি গর্ডনের সঙ্গে যৌথভাবে ছোলা, সয়াবিন, কাঁচকলা ও চিনাবাদামের সংমিশ্রণে এক ধরনের সম্পূরক খাবার তৈরি করেছি ২০১৯ সালে। এই উদ্ভাবনকে সে বছরের বিশেষ ১০টি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির একটি বলে স্বীকৃতি দিয়েছে ‘সায়েন্স’ সাময়িকী। এ ছাড়া পৃথিবীতে আমরাই প্রথম দেখেয়েছি, শিশুর খর্বকায় হওয়ার সঙ্গে অন্ত্রের কিছু জীবাণু জড়িত। এটি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে সাত এপ্রিল প্রকাশিত হয়েছে।

আমাদের দেশে গর্ভাবস্থায় মায়েদের ওজন সুষমভাবে বাড়ে না। ফলে যে ওজন নিয়ে বাচ্চার জন্ম হওয়ার কথা (কমপক্ষে আড়াই কেজি) তার চেয়ে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়। চাঁদপুরের মতলবে এখন একটা কাজ চলছে, উদ্দেশ্য গর্ভাবস্থায় মায়েদের ওজন বাড়ানো। কিশোরীদের নিয়েও একটা প্রকল্প চলছে রংপুরে। পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগের সময়টায় মেয়েরা লম্বা হয় সবচেয়ে বেশি। আমেরিকা বা ইউরোপের  চেয়ে আমাদের এখানে পিরিয়ড শুরু হয় ৮ থেকে ১২ মাস আগে। ওই সময়ে তাদের গ্রোথ উপযুক্ত পরিমাণে বাড়ানোর উপায় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে ওই প্রকল্পে।

 

আগামী দিনে

কভিড-১৯ নিয়ে বিশদ গবেষণা করব। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ আরো নানা রোগের ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করতে চাইছি। দেশে হার্ট অ্যাটাক, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগগুলো বাড়ছে। এটা কমানোর উপায় এবং এর চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করতে চাই। আইসিডিডিআরবিকে বিশ্বের জনস্বাস্থ্য গবেষণার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তর করতে চাই।

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ