kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

রীপনের ARTcon

এ আর কে রীপন স্বপ্ন দেখছেন একদিন এস এম সুলতানের ছবিও বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করবেন। শিল্পীদের রেহাই দেবেন ছবির বাজার ধরার কষ্ট থেকে। তাই গড়ে তুলেছেন আর্টকন। সানী আকতারের সঙ্গে মিলে লিখেছেন আনিসুর রহমান লিটু

১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রীপনের ARTcon

রীপন ও তাঁর আর্টকন টিম

ছবি দেখার অভ্যাস আমার বহু পুরনো। চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র হয়ে চিত্রকর্ম পর্যন্ত। চিত্রকর্ম দেখতে প্রদর্শনশালায় যেতে হয়। যাইও প্রায়ই। হঠাৎ বছর ছয় আগে ধানমণ্ডির একটি দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে দেখি চিত্রকর্মের নিচে লাল একটা ডট দেওয়া। এমনিতে লাল চিহ্নের অর্থ ছবিটি বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু এই চিহ্নটি একেবারে ঠিক ওরকম নয়। সঙ্গে আবার আর্টকন লেখা। খুঁজতে খুঁজতে রীপনের দেখা পেয়ে গেলাম। প্রদর্শনী-ক্যাটালগ তৈরিতে তাঁর হাত পাকা। নামও হয়েছে বেশ। দীর্ঘদিন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে কাজ করার সুবাদে দেশের প্রায় সব শিল্পীর সঙ্গে আলাপ আছে। ইতালির মিলানেও কিছুকাল শিল্পকলা নিয়ে কাজ করেছেন। ভিঞ্চির ‘লাস্ট সাপার’ দেখেছেন পঞ্চাশ ইউরোয় টিকিট কেটে একাধিকবার। চমৎকার, গোলগাল, ফরসা, হাসিখুশি ছেলে। এবার তিনি একটি ভিজিটিং কার্ড বের করলেন। তাতে পদবি লেখা আর্ট এজেন্ট। আমাদের দেশে এমন পদবি এর আগে কখনো দেখিনি। বকবক করতে ভালোবাসেন আতাউর রহমান খান রীপন (এ আর কে বা আর্ক রীপন নামেই বেশি চেনে লোকে)। অবাক হওয়ার সুযোগ বেশিক্ষণ দিলেন না। বলতে লাগলেন, ‘আর্টকন মানে হলো আর্ট কানেকশন। আমাকে বলতে পারেন শিল্পের দালাল। দেখেন শিল্পীরা হলেন সৃজনশীল মানুষ। তাঁরা ছবি আঁকবেন মন-প্রাণ দিয়ে। তাঁদের ছবির বাজার খোঁজার কাজ করব আমি। তাঁদের জন্য প্রদর্শনীর আয়োজন করব, তাঁদের প্রজেক্ট প্রফাইল বানিয়ে দেব, ডিজিটাল আর প্রিন্ট ক্যাটালগ তো করবই। তাঁদের জন্য বায়ার (ছবির ক্রেতা) খুঁজব। এর জন্য ছবিপ্রতি একটা কমিশন নেব। এতে সুবিধা হবে—শিল্পীরা সবটা সময় শিল্পের জন্যই ব্যয় করতে পারবেন।’

 

গ্যালারিগুলো কি এ কাজটাই করে না? জানতে চাইলাম।

রীপনের উৎসাহ বেড়ে গেল। তিনি দ্বিগুণ উদ্যমে বলতে লাগলেন, গ্যালারির তো সে রকম সুযোগ নেই। যেমন বলি হামিদ স্যারের (ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান) কথা। তাঁর সব ছবির তালিকা কি কারোর কাছে আছে? স্যারের শুরুর দিকের অনেক ছবির কথা হয়তো তাঁরও মনে নেই। সেগুলোর কোনোটি হয়তো করাচিতে, কোনোটি আবার লন্ডনে। আমিনুল ইসলাম স্যারেরও অনেক

 

 

ছবিই হয়তো ইতালিতে। মনির (শিল্পী মনিরুল ইসলাম) স্যারেরও অনেক ছবি স্পেনে, কিছু হয়তো ঢাকায়, চাঁদপুরেও থাকতে পারে কিছু। আমি চেষ্টা করব প্রত্যেক শিল্পীর জন্য একটা পরিপূর্ণ প্রফাইল তৈরি করতে। সেখানে তাঁর সব ছবির ফটোগ্রাফের সঙ্গে আঁকার মাধ্যম, সময়কাল, কোথায় আছে, আকৃতি ইত্যাদির হদিশ থাকবে। গ্যালারি কিন্তু প্রদর্শনীর পরে সব শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখারও সুযোগ পায় না। আমি করব আর্কাইভ। এটি হবে একটি মেলাঘর। শিল্পীরা পরস্পরের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারবেন আর আমার সঙ্গে তো থাকবেই।

 

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এমন এজেন্টরা কেমন আছে?

বাঘা বাঘা এজেন্ট আছে পৃথিবীতে। তাঁদের পোশাকি নাম আর্ট ডিলার। তাঁদের নিজেদের পৃথিবীর বড় বড় শহরে গ্যালারি আছে। জনি ডেপের মর্টডেকাই ছবিটা দেখছেন? আর্ট ডিলাররা কত বড় ওস্তাদ ওই ছবি দেখলে বোঝা যায়। জেনিফার অ্যানিস্টনও একটা আর্ট ডিলারের চরিত্র করেছে। ছবিটির নাম ‘দ্য ব্রেক আপ’। এটা অবশ্য রোমান্টিক ছবি; তবু কিছু ধারণা পাওয়া যায়। একজন ভালো আর্ট ডিলার শিল্পীদের বড় জায়গায় পৌঁছে দিতে পারেন। মধ্যযুগের একজনের কথা বলি। নাম মনে হয় শুনেছেন—ম্যাথিস মুসো। এই লোক অ্যান্টওয়ার্প স্কুলকে (বেলজিয়ামের শিল্পী দল) সারা ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এখন যেমন আমেরিকান একজন আর্ট ডিলার দারুণ নাম করেছেন। তাঁর নাম আর্নে গ্লিমচার। লন্ডন, হংকং, জেনেভা, নিউ ইয়র্কসহ আরো সব বড় শহরে তাঁর পেইস গ্যালারির শাখা আছে। এখনকার ডেভিড হকনি বা মায়া লিনের ছবি যেমন তিনি ডিল করেন, আবার পিকাসো, রেইনহার্ডের ছবিও দেখান।

 

আমাদের দেশে তো এটা একেবারেই নতুন ব্যাপার। সুবিধা করতে পারবেন?

না, সহজে পারব না। তবে সহজে তো কিছুই পারা যায় না। আচ্ছা আপনি বলেন তো, ১০ বছর আগে কি রাস্তাঘাটে এখনকার মতো কফি পাওয়া যেত? আমার তো মনে হয় ২০ গুণ বেড়েছে কফি ভোক্তার সংখ্যা গেল ১০ বছরে। তারপর ওয়ান টাইম বাসনের কথা বলুন। টিস্যু পেপারের ব্যবহার তো মনে হয় ৩০ গুণ বেড়েছে। শিল্পের ক্রেতা অবশ্যই এই হারে বাড়বে না। কিন্তু একটি ছবিরই অর্থমূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। নবী স্যারের (শিল্পী রফিকুন নবী) ছবিই নব্বইয়ের দশকে কত টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন খবর নিয়ে দেখুন, তাঁর কোনো কোনো ছবির দাম আট অঙ্কের ঘরও ছোঁয়।

 

সাধারণত দেখি শিল্পী মারা গেলে ছবির দাম আকাশ ছোঁয়। এই ব্যাপারটি অদ্ভুত লাগে।

মহৎ শিল্প আসলেই সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকে। তাই ভ্যান গঘের জীবদ্দশায় বোঝাই গেল না তিনি কী অমূল্য রতন দিয়ে গেলেন পৃথিবীকে। ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। তবে পিকাসো কিন্তু বেঁচে থাকতেই নাম ও দাম পেয়েছিলেন। সালভাদর দালিকেও চিনতে পেরেছিল লোকে। অ্যান্ডি ওয়ারহল তো মাঝবয়সেই তারকা বনে গিয়েছিলেন। আমার মনে হয় সমঝদাররাও (ক্রেতাও বলতে পারেন) এখন এগোচ্ছে। ছবি সৃষ্টি হওয়ার পরপরই শিল্পীর খোঁজ পড়ছে। প্রদর্শনশালার সংখ্যাও অনেক এখন। ইন্টারনেট দিয়ে তো সারা পৃথিবীকেই দেখানো যাচ্ছে যেকোনো ছবি। তাই ভালো ছবি আর চেনা-জানার বাইরে থাকছে না। আমাদের শিল্পী শাহাবুদ্দিন, মনিরুল ইসলাম, কাজী গিয়াসকে বিদেশেরও অনেকে চেনে। তাই বদলাচ্ছে দিন।

 

আপনি কাজ কিভাবে গোছাবেন ভাবছেন?

প্রথমে শিল্পীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তরুণ শিল্পীদের প্রতিও নজর রাখতে হবে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের বাইরে যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখব নিয়মিত। বিদেশেও আমাদের অনেক শিল্পী আছেন। বেঙ্গল গ্যালারি আমাদের কিছু প্রবাসী শিল্পীর খবর বলেছে। আরো নিশ্চয়ই অনেক আছে। তারপর শিল্পীদের জীবনবৃত্তান্ত ও ঠিকানা জোগাড় করব। শিল্প সংগ্রাহকদের তালিকাও করতে হবে। প্রত্যেক শিল্পীর নামে স্বতন্ত্র প্রকল্প তৈরি করে তাঁর ছবিগুলোর আলোকচিত্র ও পরিচয় রাখব। তারপর একটি স্থায়ী প্রদর্শনশালা করব। সেখানে শিল্পীদের ছবির নমুনা থাকবে।

 

এটা তো দীর্ঘ সময় ধরে করতে হবে।

হ্যাঁ, সময় তো লাগবেই। কমপক্ষে আধা যুগ। চিন্তা হলো টাকা নিয়ে। যদি এই আধা যুগ টিকে থাকার মতো টাকার সংস্থান না করতে পারি তবে সব যাবে। এই যে দেখেন একটা মানিব্যাগ আনিয়েছি আমেরিকা থেকে। দাম পড়েছে আট হাজার টাকা। কিছু শো-আপও দরকার, কী বলেন?

 

বলতে বলতে হেসে উঠলেন রীপন। তারপর মাঝেমধ্যে রীপনের সঙ্গে দেখা হতো বিটিইএফের (বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপানসন ফোরাম) বাংলামোটরের আড্ডায়। রীপন ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। বন্ধুরা মিলে বিটিইএফ নামের ওই দল গড়েছেন বহুদিন আগে। তাঁরা সপ্তাহে এক-দুই দিন আড্ডা দেন। কথায় কথায় জানি রীপন প্রায় অর্ধশত শিল্পীর সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করেছে। ওই সব শিল্পীর ছবি প্রদর্শন ও বিক্রির দায়িত্ব পাচ্ছেন। যেদিন রীপন আড্ডায় অনুপস্থিত থাকেন, সেদিন তাঁর বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে পারি, শাহাবুদ্দিন স্যার দেশে তো, রীপন তাই ব্যস্ত। অথবা রীপন গেছেন শিল্পী কালিদাস কর্মকারের সঙ্গে ইতালিয়ান দূতাবাসে। অথবা শিল্পকলা একাডেমিতে ডাক পড়েছে রীপনের। কোনো কোনো আড্ডায় রীপন দু-একজন তরুণ শিল্পীকেও নিয়ে আসেন। জানান, ওরা খুব প্রমিজিং।

দেখতে দেখতে এখন সত্যি আধা যুগ পেরিয়েছে আর্টকনের। রীপন গত বছরের জুলাইতে কিছু ক্যামেরা ও সঙ্গী যন্ত্রপাতির ফরমায়েশ পাঠালেন সিঙ্গাপুরে। পৌঁছেও গেল ১৫ দিনের মাথায়। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর নামের নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন রীপন। করোনার দাপটে শিল্প অনুরাগীরা যখন গ্যালারিতে যেতে পারছেন না, তখন তাঁরা ঘরে বসেই গ্যালারি ঘুরে প্রদর্শনী দেখার সুযোগ পাবেন ভিআর প্রযুক্তির মাধ্যমে। গেল আগস্টে শিল্পী মুর্তজা বশীর মারা গেলে বেঙ্গল গ্যালারি তাঁর সম্মানে একটি বড়সড় প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। রীপন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরীকে গিয়ে বললেন, ‘প্রদর্শনীটাকে শিল্পানুরাগীদের হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব ভার্চুয়াল ট্যুরের মাধ্যমে। আপনি অনুমতি দিলে শুটিং শুরু করতে পারি।’

লুভা নাহিদ বিষয়টির গুরুত্ব ধরতে পারলেন দ্রুতই। তিনি অনুমতি দিলেন। রীপন কাজটি শেষ করলেন অল্প সময়ের মধ্যেই। পরে ডেইলি স্টার পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে রীপন বলেছিলেন, এর মাধ্যমে মুর্তজা বশীরের কাজ ছড়িয়ে গেল পুরো বিশ্বে। লুভা নাহিদও একমত হয়ে বলেছিলেন, এর মাধ্যমে প্রদর্শনীটি সংরক্ষণ যেমন করা গেল, তেমনি পৌঁছে দেওয়া গেল সীমানার বাইরে।

 

দিনকয় আগে রীপনের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করি। জানতে চাই, আধা যুগ তো পার হয়েছে। কেমন দেখলেন?

‘আরো কিছু সময় লাগবে। করোনা একটু বিপত্তি ঘটিয়েছে। কাটিয়ে ওঠা যাবে বলেই মনে হচ্ছে। আরেকটা ব্যাপার হলো ভাই, নেশা ধরে গেছে। শিল্প একটা মজার জিনিস। এর প্রেমে পড়লে আর বাঁধন ছেঁড়া যায় না। টাকা যাচ্ছে কিছু, কিছু আসছেও। ছাড়ব না। হয়ে যাবে দেখবেন।