kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

গ্র্যাজুয়েট কিষানি

হেলেনা খাতুন গৃহবধূ। বয়স ৩১ বছর। স্বামীকে হারিয়েছেন চার বছর আগে। তারপর একবার যাচ্ছেন কলেজে আর কলেজ সেরে পরে জমিতে। মো. আব্দুল হালিম খুঁজে পেয়েছেন তাঁকে

১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গ্র্যাজুয়েট কিষানি

গাঁয়ের নাম রঙেরধারা। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নে গ্রামটি। হেলেনা এ গাঁয়েরই গৃহবধূ। স্বামী অসুখে ভুগছিলেন বিয়ের ছয় বছর পর থেকেই। এক কন্যাসন্তানের জননী হেলেনা। অসুস্থ স্বামী ও শিশুসন্তান সঙ্গী করেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করেছেন। স্বামী মারা যাওয়ার আগেই কাজে লেগে পড়েছিলেন। বাড়ির ধারে জমি আছে কিছু। পেঁপে, গাজর আর লেবুর বাগান করলেন। পাশের ছয় একর জমিতে চাষ দিতেও শুরু করলেন। বেশি প্রয়োজন না হলে হেলেনা শ্রমিক নেন না। মাটি খোঁড়া, সার দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার, বীজ বোনা ইত্যাদি কাজই বলতে গেলে একা করেন। লোকে নাম দিল, গ্র্যাজুয়েট কিষানি। গাঁয়ের অনেকেই এখন তাঁর পরামর্শ নেন।

 

যেভাবে আজ

পরিবারের দেখে দেওয়া পাত্রকেই বিয়ে করেন হেলেনা ২০০৮ সালে। ২০১৪ সালে স্বামী এনামুল হক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে ছয় মাস ছিলেন। হাসপাতালে স্বামীর পাশে থেকেই তিনি বিএ পরীক্ষা দেন। স্বামী কিছুটা সুস্থ হলে আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্বে ভর্তি হন। এরই মধ্যে স্বামীর আবার ক্যান্সার ধরা পড়ে। তাঁর চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে একরকম নিঃস্ব হয়ে পড়েন। অভাব তখন হামলে পড়ে হেলেনার ঘরে। উপায় না পেয়ে মুরগি পালন ও কৃষিকাজ শুরু করেন। কৃষিজমির প্রায় সবই ভাড়া নেওয়া। লেবু, পেঁপে, গাজর ছাড়াও বেগুন, টমেটো, পঞ্চমুখী কচুসহ মৌসুমি সব সবজি আবাদ করেন হেলেনা। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তাঁর এখন লাখ টাকার বেশি আয়। ফিবছর আবাদের জমি বাড়াচ্ছেন।

 

একটা দিন বদলে দিল অনেক দিন

২০১৭ সালের ৩০ জুন। দিনটি ছিল শুক্রবার। হেলেনার স্বামী মারা যান। কন্যার বয়স তখন পাঁচ বছর। শ্বশুরবাড়ির লোকজন পারলে সেদিনই ভিটাছাড়া করে। নিষ্ঠুর সব আচরণ করছিল তারা। সুবিধামতো সালিসও বসিয়েছে। কিন্তু হেলেনার জেদ ছিল, বাঁচার ইচ্ছা ছিল, হেরে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞা ছিল। তিনি স্বামীর বাড়িতেই রয়ে যান। কাজকর্ম করতে থাকেন মন দিয়ে। ভবিষ্যতে যদি স্বামীর ভিটা নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হয়, তাই নিজেই ল কলেজে ভর্তি হয়ে গেলেন। এখন তিনি এলএলবি শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

 

শিক্ষক তাঁর ইউটিউব

বাড়ির পশ্চিম পাশে ছোট্ট একটু জায়গায় হেলেনা একজন পার্টনার নিয়ে খামার করতে লেগে যান। এক হাজার ২০০ লেয়ার মুরগি নিয়ে শুরু। তবে ছয় মাস পরে পার্টনারের সঙ্গে গোল বাঁধে। হেলেনা একাই খামার করতে থাকেন। তখন অবশ্য খামারে দুই হাজার ৪০০ মুরগি। নিজেই সবগুলোর দেখাশোনা করতেন। একসময় লাভের মুখও দেখেন। ইউটিউব দেখে দেখে মুরগি পালন শিখেছেন তিনি। সেই বিদ্যা সম্বল করে একটা সময় দেখা গেল তাঁর মুরগির সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াচ্ছে। কৃষিকাজেও তাঁর শিক্ষক কিন্তু ইউটিউব। প্রায় সব কাজ একাই করেন। কখনো কখনো রাবেয়া খাতুন তাঁর সঙ্গী হন। রাবেয়া পাশের বাড়ির এক গৃহবধূ। দুই সন্তানের জননী। তিনিও গ্র্যাজুয়েট। রাবেয়া ৪০ টাকা ঘণ্টা চুক্তিতে হেলেনাকে সহযোগিতা দেন। হেলেনা গেল মৌসুমে বেগুন, কপি, টমেটো আর পেঁপে বিক্রি করেছেন দুই লাখ টাকার। আগামী পাঁচ বছরে লেবু বাগানে যত লেবু ফলবে সবই অগ্রিম বিক্রি করেছেন ৯ লাখ টাকায়।

 

হেলেনা বললেন

স্বপ্ন দেখতে হবে, ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগাতে হবে। পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই, হয়তো সময় লাগতে পারে। স্বামীর মৃত্যুর পর মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েছিলাম। অভাব ছিল, শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কষ্ট দিয়েছে, ঘরে একটি কন্যাসন্তান—একরকম বিপদগ্রস্তই ছিলাম। যা হোক একসময় উঠে দাঁড়ালাম—মুরগির খামার করলাম, কৃষির জন্য প্রস্তুত করলাম বাড়ির পাশের কিছু জমি। রোদ-বৃষ্টি কোনো কিছুকেই ভয় পাইনি। এখন তো মানুষ আমার ফসল দেখতে আসে। আমার ইচ্ছা আছে ব্যারিস্টার হওয়ার।