kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

লঞ্চঘাট পাঠাগার

উপকূলে অবস্থান উত্তর বেদকাশীর। সেখানে মৃদু শীতল বাতাস বয়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জসীম উদ্দীন কয়েকজনকে বই পড়তে দেখলেন। তারপর একটা সুন্দর গল্প

১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



লঞ্চঘাট পাঠাগার

উদ্যোক্তারা বলছেন একে লঞ্চঘাট পাঠাগার। লঞ্চ বা ট্রলারের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী অথবা সুন্দরবন দেখতে আসা দর্শনার্থী, ভবঘুরেও আছে দু-চারজন—সবার জন্যই এই পাঠাগার। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি এর দ্বার খুলেছে। কয়রা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার মাত্র। উত্তর বেদকাশীর কাটকাটা লঞ্চঘাট গেলেই লাইব্রেরিটি দেখবেন। পাঠাগারে আলমারি আছে কয়েকটি। খোলা সবগুলো। পছন্দমতো বই নিয়ে বসা যায় পাশের বাঁশ বা কাঠের বেঞ্চিতে। বেঞ্চে ও ছোট তাকে বই রাখা আছে। একজনকে তো একটু দূরে গাছে হেলান দিয়ে ছায়ায় বসে বইয়ে মগ্ন দেখলাম। কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর পর মুখ তুললেন। বললেন, বেশি না, ১০ মিনিটের পথ তাঁর বাড়ি। প্রায় বিকেলেই আসেন। আগে বেশি সময় কাটাতেন গল্প করে, নয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায়। এখন বই পড়তেই ভালো লাগে বেশি। পাঠাগারের কাছেই চায়ের দোকান। একজন বয়স্ক মোটাসোটা মানুষ পেলাম। চোখে তাঁর চশমা। হাতে বই, অন্য হাতে চায়ের কাপ। ভালোই লাগল দেখে। কুশলাদি বিনিময় হওয়ার পর বললেন, ‘আমি অল্প শিক্ষিত মানুষ, বাংলা পড়তে শিখেছি; কিন্তু ভুলতে বসেছিলাম। এই পাঠাগারে এসে আবার সব সড়গড় হলো।’ পাঠাগারের একজন স্বেচ্ছাসেবক শরিফুল ইসলাম। বললেন, ‘এই প্রযুক্তির যুগে তো মানুষ বইকে ভুলতেই বসেছে। তাই এই উদ্যোগটা দারুণ। এখানে বইয়ের সংখ্যাও অনেক। অপেক্ষমাণ যাত্রীরা এখানে সময়টা কাজে লাগাতে পারেন। এখানে পরিবেশ এত মনোরম যে আমার মনে হয় বই পড়ার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা হয় না।’

 

তিনি ইদ্রিস আলী

পাঠাগারটি ইদ্রিস আলীই গড়ে তুলেছেন। তিনি একজন কলেজ শিক্ষক। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিতরণ করেন। শিশুতোষ বই-ই বেশি দেন। ভাবেন, ছোটরাই তো বড় হবে, বড় তাদের হতেই হবে। বললেন, ‘এখানে প্রতিদিন কত কত লোক আসে-যায়, অথচ সময়টা কাটায় অলস। আমি ভাবলাম, পাঠাগার করার কথা। আলাপ করলাম জলবায়ুযোদ্ধা মাহমুদুল হাসান ও স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে। তাঁরা উৎসাহ দিলে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি। তবে সহজ ছিল না কাজটি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই জোগাড় করতে হয়েছে। দেশের নানা জায়গায় চিঠি লিখে বই আনিয়েছি। এখন এখানে তিন শ বই আছে। এগুলোর মধ্যে জীবনীগ্রন্থ অনেক। এ ছাড়া রাজনীতি, অর্থনীতির বইও আছে। আছে উপন্যাস আর গল্পসংকলন। স্থানীয় স্কুল শিক্ষার্থীরাও আসে। প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ জন মানুষ বই পড়ে। সংখ্যাটাকে আমি কম ভাবি না। ভবিষ্যতে বইয়ের সংখ্যা বাড়াতে চাই। পাঠাগারটি বড় করারও ইচ্ছা আছে। উপকূলের আরো নানা জায়গায় আমরা পাঠাগার গড়ার উদ্যোগ নিচ্ছি।’

 

হিউম্যানিটি ফার্স্ট

‘আগে মানবতা, পরে অন্য কথা’ এই স্লোগান হিউম্যানিটি ফার্স্টের। ফেসবুকভিত্তিক সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতাও ইদ্রিস আলী। দুস্থ, অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েই গড়ে তোলেন সংগঠনটি ২০১৮ সালে। ১১০ জন মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছে সংগঠনটি। শুরুটা হয়েছিল সাতক্ষীরা ও খুলনায়। এখন ছড়িয়ে পড়েছে অন্য আরো কিছু জেলায়। আম্ফানে (ঝড়টি আঘাত হানে গেল মে মাসে) ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৩০ লাখ টাকা খরচ করেছে হিউম্যানিটি ফার্স্ট। তখন ১০ হাজার মানুষকে খাবার দিয়েছে, পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করেছে, সুপেয় পানি সরবরাহ করেছে। পরের দিকে ঘর বানিয়ে দিয়েছে, টিউবওয়েল বসিয়েছে, চুলা বানিয়ে দিয়েছে, স্কুল গড়েছে, নবজাতকের জন্য দুধ পৌঁছে দিয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিও ইদ্রিস আলীদের একটি কাজ। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ প্রকল্প হিউম্যানিটি ফার্স্টের। এসব প্রকল্পের একটি ওই লঞ্চঘাট পাঠাগার।