kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

[ খাদ্য চক্কর ]

মসুর ডাল

৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মসুর ডাল

ইসাউ তাঁর জন্ম অধিকার এক পাত্র ডালের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন

ভূ-ভারতে ডাল একটি প্রধান খাবার। আফ্রিকার মরক্কো আর ইথিওপিয়ায়ও। ইউরোপের লোকরাও ডাল খায়। বেশি মসুর ডাল হয় অবশ্য আমেরিকায়। আর ডালের খবর প্রথম দিয়েছে গ্রিস। ডালের কথা অনেকবারই আছে বাইবেলে। সব মিলিয়ে মিশিয়ে লিখেছেন আবু সালেহ শফিক

মসুর ডালকে ইংরেজিতে বলে লেনটিল। আরবিরা ডাকে আদাস নামে। তুরস্কে বলে মেরসিমেক। ইথিওপিয়ায় মেসের, পারস্যবাসী ডাকে মাংগু। সংস্কৃতে এর অন্তত তিনটি নাম আছে—মসুরা, রেনুকা আর মঙ্গলায়া। এ থেকেই বুঝতে অসুবিধা হয় না মসুর মশহুর সারা পৃথিবীতে। ২০১৮ সালের হিসাব বলছে, পৃথিবীব্যাপী মসুর ডালের মোট উৎপাদনের ৩৩ শতাংশ শুধু কানাডায় হয়। তারপর আসে ভারত, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, কাজাখস্তান, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, রুশ ফেডারেশন, চীন আর বাংলাদেশের নাম। পাকিস্তানের লোকরাও ডাল খায়, তবে দেশটি এর বেশির ভাগই আমদানি করে।

 

মসুর ডালের বয়স

গ্রিসের ফ্রাংথি গুহায় পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক ডালের খোঁজ পাওয়া গেছে। এর বয়স প্রায় ১৩ হাজার বছর। মানে খ্রিস্টপূর্ব ১১ হাজার বছর আগের ওই ডাল। তারপরের বয়স্ক ডাল মিলেছে সিরিয়ায়। বয়স প্রায় ১১ হাজার বছর। এর পরেরটির বয়স ৯ হাজার হবে। পাওয়া গেছে ইসরায়েলে। জর্দান, ইরান, তুরস্কেও পাওয়া গেছে খ্রিস্টপূর্ব আমলের বুনো ডাল। সবগুলোরই বয়স সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার বছর। হরপ্পা সভ্যতা খুঁড়ে মিলেছে ৪০০০ বছর আগেকার ডাল। 

মানুষ আনল ঘরে

প্রত্নতাত্ত্বিকরা কৃতিত্ব দিচ্ছেন তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরাকের লোকদের। তারাই ডাল চাষ শুরু করে থাকবে। আর পরিবহন করেছে আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, চীন বা গ্রিসে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধারণা করেন গম, মটর, তিসি ও ডালের আবাদ-বয়স সমসাময়িক। খবর মিলেছে, ইথিওপিয়ায় ডাল নিয়ে গেছে হ্যামাইটরা [বলা হয়, নূহ (আ.)-এর পুত্র হামের বংশধর তারা]। গবেষকরা বলছেন, ব্রোঞ্জ যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ থেকে ১২০০ অব্দ) গম বা বার্লির সঙ্গে ডালের চাষও হতো সব জায়গায়। অর্থ দাঁড়াল ডাল মানুষের খাদ্যতালিকায় ওপরের দিকে জায়গা করে নিয়েছিল অন্তত সাড়ে তিন হাজার বছর আগে।

 

খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ

ফ্রাইজিয়ান রাজত্ব চলছে তখন তুরস্কে। অনেক সম্পদশালী লোক থাকে রাজধানীতে। তারা ভেড়া পুড়িয়ে খেতে পছন্দ করত। পোড়া ভেড়ার সঙ্গে খেত জলপাই তেল, মধু আর মদ মেশানো ঝাল ঝোল ও ডাল। তাদের এক রাজা ছিলেন মাইডাস নামের। ৬০ বছর বয়সে তিনি মারা গিয়েছিলেন। কাঠের কফিন বানানো হয়েছিল তাঁর জন্য, আর কফিনে

রাখা হয়েছিল কয়েক মণ ডাল। বাইবেলে ডালের কথা আছে বেশ কয়েকবার। যেমন—আইজাকের ছেলে ইসাউ তাঁর জন্ম অধিকার এক পাত্র ডালের সুরুয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন জ্যাকবের কাছে। বড় ছেলে হিসেবে আইজাকের সম্পদ ইসাউয়েরই পাওয়ার কথা। কিন্তু ইসাউ ছিলেন দুরন্ত শিকারি। জঙ্গলেই কাটে তাঁর সময়। জমিজমা বুঝতেন কম। আর জ্যাকব ছিল চতুর। সে ইসাউয়ের ক্ষুধার্ত সময়ের সুযোগ নিয়ে কিনে নেয় তাঁর জন্ম অধিকার। কোরআনেও আছে ডালের কথা। বনি ইসরাইলরা মান্না সালওয়ার বদলে যেসব খাবার চেয়েছিল তার মধ্যে ডাল একটি।

 

এখন ডাল হয় 

শুষ্ক কৃষি অঞ্চল গবেষণার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিএআরডিএ) জানতে পেরেছে পৃথিবীর ৬৯টি দেশে ডাল হয়। মোট মসুর ডাল উৎপাদনের ৪৮ শতাংশ হয় আমেরিকায় এবং এশিয়ায় ২৭ শতাংশ। দক্ষিণ সিরিয়ায় একটি পাহাড় আছে নাম জেবেল দ্রুজ। সিরীয় কৃষি গবেষণা কমিশন এখানে নানা রকম মসুর ডালের এক সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছে এবং ডালের আরো উন্নত জাত আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। অনেক রকম বুনো ডালের সংগ্রহও আছে এখানে।

 

গরিবের প্রোটিন

ডাল সবজিবিশেষ, অথচ আমিষে ভরপুর। এর প্রায় ২৫ শতাংশই আমিষ। ডালে আরো আছে শর্করা ও ক্যালরি। এটি তাড়াতাড়ি রান্না হয় বলে গৃহিণীর কাছে এর আদরও অনেক। অনেক কাজ হয় ডালের গুঁড়া দিয়েও। রমজান মাসে বেসনের চাহিদা বাড়ে। এটি তৈরি হয় ডালের গুঁড়া দিয়ে। ডালগাছের গোড়া, পাতা পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। কোলেস্টেরল কমানোর কাজও করে ডাল। যাঁদের শরীরে চিনির সমস্যা আছে, তাঁরা ডালে উপকার পান। এতে দ্রবণীয় আঁশ আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। তাই খাদ্যতালিকায় ডাল থাকলে খাওয়ার পর রক্তে চিনির মাত্রা সহজে বাড়ে না। এ ছাড়া ডালে দুই রকম বি-ভিটামিন পাবেন। পটাসিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, আয়রন ইত্যাদি খনিজও পাবেন। এক কাপ ডাল থেকে কত শক্তি পান জানেন? ২৩০ ক্যালরি। হৃদয়ের জন্যও ভালো ডাল। হৃদয়ের রোগ কমায় ডাল।

 

ডাল ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ডালের (মুগ, খেসারি বা মাসকলাইসহ)  চাহিদা বছরে ২৫ লাখ মেট্রিক টন। আমরা উৎপাদন করি  ৯ লাখ মেট্রিক টন। বাকি ১৬ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হয়। বেশি আসে কানাডা আর অস্ট্রেলিয়া থেকে। তুরস্ক, নেপাল আর চীন থেকেও আমরা ডাল আনি। আমাদের এখানে বেশি ডাল হয় ফরিদপুর আর বরিশালে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সাতটি ডালের ৪২টি উন্নত জাত ও ৪১টি উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।



সাতদিনের সেরা