kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

[ বাঙালির বিশ্বদর্শন ]

ভারত রেল

আব্দুল্লাহ আল মোহন   

৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভারত রেল

দুই বছর আগের জুলাই মাস ছিল সেটা। দিল্লি গিয়েছিলাম। চাণক্যপুরী দিল্লির অভিজাত এলাকা। রেল জাদুঘর আছে একটা চাণক্যপুরীতে। ১০ একর জায়গার ওপর এ জাদুঘর ১৯৭৭ সালে খোলা হয়েছে। সারা দিন ঘুরলাম এ মাথা-ও মাথা; তবু দেখার বাকি রইল অনেক। সেই যখন দিল্লি বহুদূর ছিল বঙ্গের লোকদের কাছে, তখনকারই একটা সময় ১৮৫৩ সালে ভারতে রেল চালু হয়। দিনটি ১৬ এপ্রিল। পার হয়ে গেছে ১৬৫ বছর। এতগুলো বছর এক দিনে দেখে ফেলা কি মুখের কথা? বিপুলা এই দেশের এখানে-সেখানে জালের মতো বিছানো রেললাইন। জাদুঘরে আছে গুনে শেষ করা যায় না এত পরিমাণের দুর্লভ ছবি ও স্মারক। ভারতের তিনটি পার্বত্য রেলপথ ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে জায়গা পেয়েছে। একটি আমাদের বাড়ির ধারের দার্জিলিংয়ে।

 

রেলগাড়ি বা ট্রেন

ফরাসি শব্দ ট্রাহিনা থেকে এসেছে ট্রেন, যার অর্থ টানা। ঘোড়ায় টানা গাড়িগুলোই কিন্তু রেলগাড়ির ধারণা দিয়েছে। টানাগাড়িতে স্টিম ইঞ্জিন জুড়ে দিলে যোগাযোগব্যবস্থার পুরো ব্যাপারটিই বদলে যায়। এখানে জেমস ওয়াটের কথা মনে পড়বে অনেকের। তবে রেলপথের জনক বলা হয় কিন্তু জর্জ স্টিফেনসনকে (১৭৮১-১৮৪৮)। ব্রিটিশ এই প্রকৌশলী গণ-রেলপথ তৈরির পথ দেখান। তার পর থেকে নানা কলাকৌশল যুক্ত হয় রেলগাড়ি ও রেলপথে। সেসবের সচিত্র বর্ণনা আছে জাদুঘরটিতে। আছে সময় ধরে ধরে রেলের মডেল। এটি এশিয়ার সবচেয়ে বড় রেল জাদুঘর। এখানে টয় ট্রেনের দুষ্প্রাপ্য সব ছবি আছে। ট্রেনের সঙ্গে চলচ্চিত্রেরও যোগ ভালো। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’তে অপু-দুর্গার ট্রেন দেখা কোন দর্শক ভুলতে পারে! তিনিই কাঞ্চনজঙ্ঘায় অনেকবার ট্রেনের হুইসেল শুনিয়েছেন। খুশবন্ত সিংয়ের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ থেকে ১৯৯৮ সালে সিনেমাও হয়েছে। বিবিসির ‘গ্রেট রেলওয়ে জার্নিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ কম মানুষ দেখেনি। তারপর হলিউডের ‘দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি’র কথা কার না জানা। জাদুঘর আরো জানাচ্ছে, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ হাজার বছর আগে চাকা আবিষ্কারের পর থেকেই হাঁটছে পৃথিবী। তবে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আগে কিন্তু ছোটেনি এটি। তিনি স্বচালিত গাড়ির ধারণা দেন প্রথম। এখন তো বুলেট ট্রেনেরও খবর পাই, যেটি লাইন ছোঁয়ই না।

 

পাতালরেল

ইংল্যান্ডে পাতালরেল নির্মাণকালে লর্ড ডালহৌসি  ব্রিটিশরাজকে পত্র পাঠিয়েছিলেন (১৮৫০ সালের দিকে) এই বলে যে—যদি ভারতবর্ষ শাসন করতে হয়, তবে অবিলম্বে রেল চালু করতে হবে। ব্রিটিশরাজও বুঝেছিলেন রেলের গুরুত্ব। তিনি আর্জি মঞ্জুর করতে দেরি করেননি। কলকাতা থেকে হুগলী পর্যন্ত প্রথম রেলপথ চালু হয়েছিল। মোট ৩৮ কিলোমিটার। জাদুঘরটি আমাদের জানাচ্ছে ভারতীয় রেলওয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন কোটি যাত্রী পরিবহন করে। এই সংখ্যা নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার  সমান। ভারতে একজন রেলগাড়িচালক সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার মতো বেতন পান। অনেকের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা এক লাখ রুপিতে গিয়েও ঠেকে।  ১৯০৯ সালে প্রথম ট্রেনে টয়লেট যোগ করা হয়। অখিল চন্দ্র নামের এক ভদ্রলোক দরখাস্ত করে এদিকে কর্তৃপক্ষের নজর ফেরান। ভারতীয় রেলওয়ে প্রতিদিন ১২ হাজার ট্রেন পরিচালনা করে। ভারতীয় ট্রেনের মাসকট আছে, নাম ভলু। এটি একটি প্রহরী হাতি। জাদুঘরটি মনে করিয়ে দিল, রবিঠাকুর প্রথম ট্রেনে চড়েছিলেন ১৮৭৩ সালে। কবি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির ১৫ মাস আগে ‘গীতাঞ্জলি’র পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেছিলেন ইংল্যান্ডের পাতালরেলে। পরে একে-ওকে বলে ‘হারানো সম্পত্তি দপ্তর’ থেকে তা ফেরত পান।  হঠাৎ দেখায় কবি লিখেছেন, ‘সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে; আমি চললেম একা।’ জীবনে বহুবার কবি ট্রেনে চড়েছেন। লিখেছেন ‘এ প্রাণ, রাতের রেলগাড়ি’।

 

রেল বাংলাদেশ

১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশে প্রথম রেললাইন চালু হয় কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত। পরে সেটি সম্প্রসারিত হয় গোয়ালন্দতক। তারপর ঢাকায় আসতে হতো স্টিমারে করে। ১৮৫৬ সালেই কিন্তু কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত রেললাইন চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পদ্মা যে প্রমত্তা। ঢাকায় রেল চালু হয় ১৮৮৫ সালে। ট্রেন যেত নারায়ণগঞ্জ, তারপর ময়মনসিংহ। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ নির্মাণে খরচ হয়েছিল প্রায় ৭৭ লাখ টাকা। প্রথম সপ্তাহের পরীক্ষামূলক যাত্রায় যাত্রী ছিল দুই হাজার ১৭০ জন। পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ শুরু হয় ১৯১০ সালে। ঢাকায় স্টেশন ছিল ফুলবাড়িয়ায়। ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন ট্রেনে চেপে ফুলবাড়িয়ায় এসে নেমেছিলেন।

 

বড়দের ব্যাপার

দিল্লি জাদুঘর আপনাকে দেখাবে বরোদার মহারাজার স্যালুনকার। মহীশুরের মহারাজার হাতির দাঁতের নকশাখচিত বিলাসবহুল ক্যারেজ। আছে মহাত্মা গান্ধীর শবযাত্রার বগি। জাদুঘরে একটি রেস্তোরাঁ আর লাইব্রেরিও আছে। পড়ার সময় পাইনি। আবার যেতে হবে।



সাতদিনের সেরা