kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

দেয়াল পুস্তিকা

৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দেয়াল পুস্তিকা

ভালোবেসে মানুষ কত কিছুই না করে! যেমন দেশকে ভালোবেসে রূপগঞ্জের হাবিবুর রহমান শাহিন বাড়ি সাজিয়েছেন স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস দিয়ে। এস এম শাহাদাত দেখে এসেছেন

কাঞ্চনের কেন্দুয়া গ্রাম। ছায়া-সুনিবিড় শ্যামল-সতেজ। হাবিবুর রহমানের বাড়িটি বেশি বড় নয়; কিন্তু সীমানাপ্রাচীর বিশাল। ভাবছিলেন—দেয়াল ফেলে রাখবেন না আবার ভাড়াও দেবেন না কোনো বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে। তাহলে কী করা যায়। ভাবতে ভাবতে একদিন পেয়েও গেলেন—নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবেন ইতিহাস। বাড়ির দেয়ালে ফুটিয়ে তুলবেন মনীষীদের মুখাবয়ব, প্রেরণাদায়ী চিত্রকর্ম, বাণী আর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কাহিনি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীর জন্য এগুলো বইয়ের কাজ করবে।

 

বাড়ি যাই

শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সেতু কাঞ্চন। তারপর কাছারিবাড়ি হেঁটেও যাওয়া যায়। অনেকটা দূর থেকেই চোখে পড়বে মনীষীদের বাণী। এটা বাড়ির দক্ষিণ দেয়াল। কোরআনের আয়াত আর হাদিসও উদ্ধৃত আছে। পুবের বিশাল দেয়ালে জাতীয় পতাকা দিয়ে শুরু। তারপর আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সমাজসংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রমুখ। সব মিলিয়ে ৪৭ জনের মুখচ্ছবি আছে এখানে। মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পরম যত্নে। চিত্রকর্মে বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্পকলা, প্রকৃতি, ভাষা আন্দোলন একাত্তর ফুটে উঠেছে।  নামফলকস্তম্ভে লেখা আছে এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের নাম। বাড়ির ভেতরের বাগানের গাছেও ঝোলানো হয়েছে বিখ্যাত বাণী। ভিতরবাড়ির তিনটি ঘরও জাতীয় পতাকার রঙে রাঙানো। যেদিন গিয়েছিলাম (ফেব্রুয়ারির শুরুতে) সেদিন পশ্চিম ধারের দেয়ালটির ধোয়ামোছার কাজ চলছিল। এখানে হবে শহীদ বুদ্ধিজীবী গ্যালারি। ৩৬ জন বুদ্ধিজীবীর মুখচ্ছবি ফুটে উঠবে এই গ্যালারিতে। তবে বড় আকর্ষণ থাকছে মাসকো স্কুলের উল্টো দিকের দেয়ালটায়। এটি প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ। এটিই হয়ে উঠছে ইতিহাসের বড় প্রদর্শনশালা। বীরাঙ্গনাদের ছবিও রাখার কথা ভাবছেন হাবিবুর।

 

শুরু হলো

গেল সেপ্টেম্বরে শুরু করেছিলেন হাবিবুর। একাত্তরে কিন্তু হাবিবুরের জন্মই হয়নি। পঁচাত্তরে জন্ম তাঁর। চার বছর বয়স যখন, বুঝতে শিখলেন, দেখলেন বাবার (হাসমত আলী) কাছে দূর দূর থেকে মুক্তিযোদ্ধারা আসেন। তিনি তাঁদের কাছে সংগ্রামের গল্প শুনতেন। সেসব গল্প হৃদয়ে গাঁথা হয়ে আছে। বলছিলেন, ‘বাবা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। আমার এখনো মনে আছে মুক্তিযোদ্ধা পিনু কাকা, নুরুল ইসলাম কাকা, দেলোয়ার কাকা, নজরুল কাকা আমাদের বাড়িতে আসতেন। বাবা ১৯৬১ সাল থেকে কাঞ্চন ভারতচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ছিলেন অবনৈতিক শিক্ষক। বাবা সমাজসেবামূলক কাজ করতেন। বাবাকে দেখে আমারও সমাজসেবার আগ্রহ জাগে। আমাদের বাড়ির সীমানা দেয়ালটি বেশ বড়। পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করতে দিলে হয়তো কিছু টাকা আসত। কিন্তু আমি ভাবলাম, শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া-আসার মধ্যেই দেশ গড়ার কারিগরদের চিনে নিতে পারবে। পাবে বড় মানুষ হওয়ার প্রেরণা। তাইতো দেয়ালজুড়ে বাংলাদেশ।’

 

হাবিবুরের দুঃখ

চারদিক ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, লিফলেটে সয়লাব। কোনোটা রাজনীতির, কোনোটা ছায়াছবির, কোনোটা তেল বা সাবানের। সবাই আত্মপ্রচারে ব্যস্ত। তাহলে নতুন প্রজন্ম শিখবে কোথা থেকে?  হাবিবুর বলেন, ‘আগের প্রজন্ম আমাদের একটা দেশ দিয়ে গেছেন, এখন আমাদের দায়িত্ব পরের প্রজন্মকে একটা সমৃদ্ধ দেশ দেওয়া।’

 

যারা দেখতে আসে

বায়েজিদ বোস্তামি, আবু সাইদ, মাইমুনা আক্তার স্কুলে পড়ে এক ক্লাসেই। বলছিল, ‘আমরা বই থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে জেনেছি আর এখানে জানা বিষয়গুলোর ছবি পাচ্ছি। ছবি তো সহজেই মনে গেঁথে যায়। খুব ভালো লাগছে।’ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল জব্বার খান পিনু বলেন, ‘হাবিবুর যুদ্ধটাকে জাগিয়ে তুলেছে। এভাবে যদি দেশের আর সবাই উদ্যোগ নিত, ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে সাহস পাবে না কেউ। মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলকস্তম্ভ করার ভাবনাটা আমার নতুন লেগেছে। এখানে এটা এই এত দিনেও কেউ করেনি।’

 

সবটাই নিজেরা

একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হাবিবুর। বেতনের অনেকটাই খরচ করেন সমাজসেবায়। পিতা এস কে এম হাসমত আলীরও সমর্থন পান। বাড়ির বাগানের ফলফলাদি বিক্রি করে জমানো টাকা ছেলের হাতে তুলে দেন হাসমত আলী। ছোট ভাই আতিকুর রহমান জনিও তাঁর বেতনের টাকার একটা অংশ দেন বড় ভাইয়ের হাতে। আর ছবিগুলো বিনা পারিশ্রমিকে এঁকে দিয়েছেন ভাগ্নে (মায়ের ফুফুর ছেলের মেয়ের ছেলে) আল-আমিন মিয়া।

 

আগামীর কথা

বাড়ির পাশের বাগানে পথস্কুল নামের একটা স্কুল করার পরিকল্পনা আছে তাঁর। পথচারীদের জন্যই হবে এই স্কুল। জানানো হবে, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ আর মহামানবদের জীবনকথা। রূপগঞ্জের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইতিহাসের গ্যালারি করার ভাবনাও রয়েছে তাঁর। কাছের দুটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সংগ্রহ করে নামফলকস্তম্ভ করার কথাও ভাবছেন হাবিবুর। নিজেদের জমিতে বীরশ্রেষ্ঠ সরণি করার পরিকল্পনাও আছে তাঁর।



সাতদিনের সেরা