kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

[ সুপ্রভাত বাংলাদেশ ]

‘তুই আমার ভগমান মা’

এ পর্যন্ত ৫৮৭ জন প্রসূতিকে স্বাভাবিক প্রসবে সাহায্য করেছেন। রক্ত জোগাড় করে দিয়েছেন হাজার সাতেক মানুষকে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ক্যামেলিয়া ডানকান হাসপাতালের মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তিনি। সানজানা শিরিনের গল্প বলছেন মাহফুজ শাকিল ও পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘তুই আমার ভগমান মা’

সানজানার সেলফিতে পুঁচকো নম্বর ৫৮৭

দুই ভাই, ছয় বোনের মধ্যে তৃতীয় তিনি। হবিগঞ্জের বহুলা গ্রামে বাড়ি। বাবা সৈয়দ আলী মুদি দোকানি। একে তো অনটনের সংসার। তার ওপর সমাজে মেয়েদের বাঁকা চোখে দেখা হয়। ফলে রীতিমতো যুদ্ধ করেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে সানজানাকে। হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। এরপর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কারণ বাবা, ভাই—কেউ চান না সানজানা পড়াশোনা চালিয়ে যাক। কিন্তু সানজানা নাছোড়বান্দা। পড়তে না দিলে আত্মহত্যা করবেন বলেও হুমকি দিয়েছিলেন! যা হোক, শেষে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। এরপর মৌলভীবাজারের ম্যাটস থেকে চার বছর মেয়াদি মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট কোর্স সম্পন্ন করেন। যোগ দেন স্থানীয় একটি ক্লিনিকে। মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালেও ৯ মাসের মতো কাজ করেছেন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে যোগ দেন বর্তমান কর্মস্থলে। আশপাশের ১৭টি চা বাগানের শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা দেয় হাসপাতালটি। রোগীর সেবা করাই সানজানার কাজ, তবে পেশাগত কাজের বাইরেও কাঁধে তুলে নিয়েছেন কিছু বাড়তি দায়িত্ব। প্রসূতি মাকে সাহায্য করা, জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে রক্ত জোগাড় করে দেওয়াসহ যেকোনো দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি।

 

নবম শ্রেণি থেকে শুরু

সানজানা বললেন, ‘ক্লাস নাইনে নান্টু স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তাম। তখন আমাকে প্রতিদিন ১০ টাকা দেওয়া হতো। আসা-যাওয়ার খরচ বাদে চার-পাঁচ টাকা থেকে যেত। যাওয়ার পথে দেখতাম একজন প্রতিবন্ধী বসে থাকতেন রাস্তার পাশে। প্রতি সপ্তাহে হাতখরচা থেকে বাঁচানো টাকা জমিয়ে শুক্রবার তাঁকে দিয়ে আসতাম। একবার তো মায়ের জমানো ৫০ টাকা চুরি করে দিয়েছিলাম লোকটাকে।’

সানজানা তখন কলেজে পড়ছেন। একদিন খবর পেলেন, পাশের বাড়ির এক মহিলা অসুস্থ। ওই মহিলার কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, তাঁর কী কী খেতে ইচ্ছা করছে। পরে সেগুলো কিনে দিলেন।

 

পুঁচকো নম্বর ৫৮৭

‘পুঁচকো নম্বর ৫৮৭। নরমাল ডেলিভারি। মেয়ে। ওজন ৩ কেজি। মা ও বাচ্চা ভালো আছে।’ ২১ ফেব্রুয়ারি নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন সানজানা। কোনো কোনো পুঁচকোর নম্বরের পাশে লেখা, মা ও বাচ্চার অবস্থা খারাপ ছিল। কোনোটাতে লেখা, পেটের মধ্যে বাচ্চার গলায় নাড়ি প্যাঁচানো ছিল। যেমন—গেল বছরের ২৬ এপ্রিল লিখেছেন, “জীবনে প্রথম রিস্ক নিয়া সফল। খিঁচুনি রোগীর ডেলিভারি করাইলাম। প্রচুর কনভালসন, সাথে প্রসব ব্যথা। মা ও বাচ্চা দুজনই ঝুঁকিতে। অন্য হসপিটালে রেফার করে দিসে স্যার। কিন্তু যাবে না। শাশুড়ি পা ধরে বলছে, ‘তুই আমার ভগমান মা’। ‘জামাই বন্ড সই দিল, যাবে না। এত্ত খিঁচুনি! ছয়-সাতজনে ধরে কোনো মতে ডেলিভারি করাইলাম; কিন্তু সেলাই দিতে পারছি না। হাত-পা ছোড়াছুড়ি করছেই। দুই ঘণ্টা পরে একটু সেটেল হওয়ার পর সেলাই দিলাম, তা-ও চারজনে ধরে। আমার নিজের শরীর ব্যথা করতেছে। প্রচণ্ড ভয় লাগছিল; কারণ এখন পর্যন্ত Eclampsia-তে বাচ্চাসহ তিনজন মা মারা গেছে এই লকডাউনে। পুঁচকো নম্বর ৫১১। মেয়ে। ওজন ২.৫ কেজি।’ ফেসবুকে এভাবেই বিবরণ লিখে রাখেন সানজানা। এই নম্বরগুলো হলো অস্ত্রোপচার ছাড়া স্বাভাবিক প্রসবে জন্ম নেওয়া নবজাতকের। আর এই স্বাভাবিক প্রসবে মাকে সহায়তা করেন সানজানা। তিনি যে হাসপাতালে কাজ করেন সেখানে স্বাভাবিক প্রসবে কোনো টাকা লাগে না। তাই আপ্রাণ চেষ্টা করেন। জটিল হলে বাধ্য হয়ে তা অস্ত্রোপচারের জন্য রেফার করে দেন। এ পর্যন্ত সানজানার হাতে জন্ম হয়েছে ৫৮৫টি শিশুর। প্রতিটি শিশু কান্নার মাধ্যমে পৃথিবীতে তার উপস্থিতি জানান দেয়। আর তাকে কাপড়ের পুঁটলিতে নিয়ে সানজানা হাসিমুখে ছবি তুলে পোস্ট দেন। এসব করতে গিয়ে বিচিত্র ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। বলছিলেন, একবার এক নারী এসেছিলেন, বাঁ হাত অচল তাঁর। লাস্টটাইমে পেইন নিয়ে চেক করাতে আসেন। দেখলাম, জরায়ুর মুখ খুলেছে। জানতে চাইলাম,

‘সঙ্গে কেউ আসেনি?’

‘আপা, আমার তো কেউই নাই।’

‘আচ্ছা, আমি তো আছি। তুমি কাপড়চোপড় নিয়ে আসো।’

‘সকালে গেলেন। বিকেল পর্যন্ত দেখলাম, আসছেন না। হাসপাতাল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে বাসা। গিয়ে দেখি, বিছানায় কাতরাচ্ছেন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। ততক্ষণে হসপিটালে আর কেউ নেই। পরিচিত একজনকে দিয়ে দুটি ইনজেকশন আনালাম। ভীষণ কষ্টদায়ক মুহূর্ত ছিল সেটা। যা হোক, রাত ১টার দিকে ডেলিভারি হলো। ছেলে। এরপর রান্না করলাম। তাঁকে খাওয়ালাম।’ সানজানার ঝুলিতে এ রকম অনেক স্মৃতি জমা আছে।

২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে এক মায়ের নরমাল ডেলিভারি করানোর মধ্য দিয়ে তাঁর এই কাজের যাত্রা শুরু। একই বছর যোগদান করেন হবিগঞ্জের নিজামপুরে মা-মণি প্রজেক্টে। সেখানে সাড়ে পাঁচ মাসের মতো কাজ করেছিলেন। পরে প্যারামেডিক অফিসার হিসেবে যোগ দেন সিলেটের জৈন্তাপুরে। সেখানে তিন মাসে ৯৯টি নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন। এরপর চলে আসেন বর্তমান কর্মস্থলে।

 

এক ব্যাগ রক্ত লাগবে, কেউ আছেন?

প্রায় পাঁচ বছর ধরে রক্তদান উদ্বুদ্ধকরণে কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। জরুরি রক্তের প্রয়োজনে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে সমাধান মেলে। কারো রক্তের প্রয়োজন পড়লে নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। ‘রক্ত চাই, কেউ আছেন? এক ব্যাগ ও-পজিটিভ রক্ত লাগবে।’ তাঁর আহ্বানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সাড়া দেন। রোগীর ঠিকানা নিয়ে পৌঁছে যান হাসপাতালে। এখন পর্যন্ত হাজার সাতেক মানুষকে রক্ত জোগাড় করে দিয়েছেন। নিজেও রক্ত দেন নিয়মিত। এ পর্যন্ত দিয়েছেন ২০ বার।

 

দুর্যোগেও পাশে আছেন

শুধু রক্তদান কিংবা জোগাড় করে দেওয়া নয়, যেকোনো দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। এই করোনাকালেও ৩৬০টি পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। এক বিধবা নারীকে একটি ছাগল কিনে দিয়েছেন। ৩৫ হাজার টাকায় আরেক নারীকে ঘর বানিয়ে দিয়েছেন। গেল রমজানে ২৫০টি পরিবারের কাছে ইফতারসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। সব অর্থ সংগ্রহ করেছেন ফেসবুকের মাধ্যমে।

 

বৃদ্ধাশ্রম করতে চান

নিজের ছোট বোনকে সিলেট উইমেনস নার্সিং কলেজে পড়িয়েছেন। এখন তিনি সেখানেই চাকরি করেন। সানজানা বললেন, ‘নিজের বোনকে নার্স বানাতে পেরেছি। এটাই আমার সার্থকতা। মানবিক কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই। ভবিষ্যতে একটি বৃদ্ধাশ্রম করতে চাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা