kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

[ অদম্য মানুষ ]

হেল্পার থেকে কোটিপতি

একটা সময় তিনবেলা খাবারই জুটতো না। ছিলেন বাসের হেল্পার। এখন ৯টি গাড়ির মালিক। তাঁর অধীনে কাজ করে ৪০ জন। শামছুজ্জামান আল আমিনের গল্পটা জানাচ্ছেন আলম ফরাজী

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হেল্পার থেকে কোটিপতি

এই পিকআপগুলোর মালিক আল আমিন (সামনের জন)। বাকিরা এখন তাঁর অধীনে কাজ করেন। ছবি : লেখক

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার পালাহার গ্রামে জন্ম আল আমিনের। বাবা আব্দুল আহাদ ছিলেন দিনমজুর। পরের জমিতে কাজ করতেন। নানারকম অসুখ লেগেই থাকতো তার। আয়ইনকামও তেমন করতে পারতেন না। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা ছিল তাঁদের। সংসার চালানোর জন্য দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতেন আব্দুল আহাদ, এর-তার কাছে হাত পাততেন। আল আমিনের মা শামছুন্নাহারের একবার জটিল এক অসুখ হলো। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ভিটামাটি ছাড়া সবই বেচতে হয়েছে তখন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় আল আমিন এসব দেখেশুনে আর স্থির থাকতে পারলেন না।

 

ছোট কাঁধে বড় বোঝা

২০০৪ সাল। আল আমিন তখন ১৫ বছরের কিশোর। এই বয়সেই সংসারের বোঝা তুলে নিলেন ঘাড়ে। নবম শ্রেণিতেই পড়াশোনার বিরতি। বই-খাতা ফেলে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কে চলা টমটমের হেল্পার হলেন। যা পেতেন তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু আল আমিন দমে যাওয়ার পাত্র নন। আরো বেশি রোজগারের আশায় চলে যান ঢাকায়। রামপুরায় এক খালার বাসায় ওঠেন।

 

এবার ঢাকায়

আজিমপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা রুটে চলে ভিআইপি-২৭ পরিবহন। সেই বাসে হেল্পার হিসেবে যোগ দেন আল আমিন। প্রতি ট্রিপে ১০০ টাকা করে পেতেন। কয়েক মাস পর মিন্টু ভাই নামে এক চালকের সাহায্যে গাড়ি চালানো শেখেন। অল্প দিনের মধ্যে গাড়ি চালানোর কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেন। তবে প্রথম দিকে তাঁকে কেউ চালক হিসেবে নিতে চায়নি। পরে ঢাকার এক পরিচিত লোকের জিম্মায় দৈনিক জমার ভিত্তিতে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস নেন। গাজীপুর থেকে সদরঘাট রুটে চলত সেই বাস। কয়েক মাস পর সুপ্রভাত ছেড়ে বলাকা পরিবহনের স্টিয়ারিং ধরেন। ভালোই আয়-রোজগার হতে লাগল। বাড়িতে পাঠানো ছাড়াও কিছু টাকা সঞ্চয় করতে থাকলেন। এভাবে বছর পাঁচেক চলল।

 

আবার গ্রামে

হঠাৎ খবর পেলেন বাড়িতে মা-বাবা দুজনই খুব অসুস্থ। ঠিক করলেন গ্রামে ফিরে যাবেন। মা-বাবা সুস্থ হওয়ার পর আবার ঢাকায় ফিরবেন। এলাকায় কাজের পাশাপাশি আবার লেখাপড়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভর্তি হলেন নবম শ্রেণিতে। কিন্তু এলাকায় কাজ জোগাড় করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। কারণ গাড়ি চালক হিসেবে এলাকার আল আমিনের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। বিশ্বাস করে কেউ তাঁকে গাড়ি চালানোরও সুযোগ দেয়নি। উপায়ান্তর না দেখে নান্দাইল-তাড়াইল সড়ক ও আশপাশের বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কে চলা যাত্রীবাহী যানবাহনে আবার হেল্পার হিসেবে কাজ শুরু করেন। আল আমিন যে বাসের হেল্পার ছিলেন, একদিন মাঝপথে সেই বাসের চালক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেন আল আমিন। নিরাপদে চালিয়ে আবার গাড়ি স্টেশনে নিয়ে আসেন। দেখে গাড়ির মালিকও আশ্বস্ত হন। পরদিন গাড়িটি আল আমিনকে চালাতে দেওয়া হয়। কিন্তু বেশি দিন টিকতে পারেননি। মালিকের দুর্ব্যবহারে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে গাড়ি চালানোই ছেড়ে দিলেন। তখন ধান কাটার মৌসুম চলছিল।  হাওরে শ্রমিক হিসেবে গিয়ে ধান কাটলেন। এসবের মধ্যেও পড়াশোনায় ফাঁকি দেননি। ২০১১ সালে এসএসসি এবং ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করেন।

 

এবার পিকআপে

এর মধ্যে তিল তিল করে জমানো টাকায় বাবার করা ঋণ পরিশোধ করেন। বন্ধক দেওয়া কিছু জমিও উদ্ধার করেন। পরে আট লাখ টাকায় একটি পিকআপ কেনেন। বন্ধুদের কাছ থেকে ধারদেনা করে দুই লাখ ডাউন পেমেন্ট আর বাকি টাকা কিস্তিতে দিতে হয়েছে। নিজেই চালাতেন সেটি। মাল বোঝাই পিকআপ নিয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যেতেন। খরচাপাতি বাদ দিয়ে দৈনিক তিন থেকে চার হাজার টাকার মতো আয় হতো। এভাবে একসময় কিস্তির টাকা পরিশোধ করেন। পরে নিজের জমানো টাকায় আরেকটি পিকআপ কেনেন।

 

দিন বদলেছে

এখন ৯টি পিকআপের মালিক আল আমিন। চালকদের বেতনসহ খরচাপাতি বাদ দিয়ে দৈনিক প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো আয় হয়। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের নান্দাইল চৌরাস্তায় ‘আপন ট্রেডার্স’ নামে গাড়ির যন্ত্রপাতি ও টায়ার বিক্রির দুটি শোরুম রয়েছে তাঁর। একটিতে তাঁর বাবা বসেন, অন্যটিতে তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর অধীনে কাজ করেন ৪০ জন। ছোট ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। সেই ভাই এখন সেনাবাহিনীর সৈনিক। ঘটা করে বোনকেও বিয়ে দিয়েছেন। নিজেও বিয়ে করেন। এক সন্তানের জনক আল আমিন। কুঁড়েঘরের  ভেঙে আধাপাকা ঘর করেছেন। মাটির চুলার বদলে এখন গ্যাসের চুলা। বিদ্যুতের পাশাপাশি আছে সৌরবিদ্যুৎও। শত বাধাবিপত্তির মাঝে নিজেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ২০১৭ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন।

 

আল আমিন বলেন

এমনো দিন গেছে, দিনে একবেলার বেশি খেতে পারিনি। কিন্তু কারো কাছে হাত পাতিনি। দিন-রাত ভুলে কাজ করে গেছি। একদিনের কথা মনে পড়ে। শবেবরাতের রাত। প্রতিবেশীরা মাংস রান্না করছে। কিন্তু আমাদের তো ভাত খাওয়াই দায়। ভাই-বোনদের তো আর বোঝানো যাচ্ছিল না। আম্মাকে বললাম, ‘মসলা বাটো। আমি আসছি।’ সেদিন ৮০ টাকা মজুরি পেয়েছিলাম। এক কেজি মুরগির দাম ১২০ টাকা। পরে আবার স্টেশনে গেলাম। মালিকের কাছ থেকে ৫০ টাকা ধার করলাম। মুরগি নিয়ে বাড়িতে এসে দেখি আম্মা-ভাই-বোনরা ঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। কারণ প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ঘরের চালার ফুটো দিয়ে পানি পড়ছিল। এ রকম অনেক ঘটনার সাক্ষী আমি। একটি টাকারও যে কী মূল্য সেটা জীবন আমাকে শিখিয়েছে। আমি যে পেশায় আছি তাতে মানুষের আস্থা অর্জন চাট্টিখানি কথা নয়। মানুষের বিশ্বাসের মূল্য আমি জানি। গ্রাহকের মূল্যবান মাল সময়মতো পৌঁছে দিয়েছি। ফলে ধীরে ধীরে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি,  কোনো কাজই ছোট নয়—এই চিন্তাই আমাকে সাফল্য এনে দিয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা