kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

স্কুলে স্কুলে শহীদ মিনার গড়েন তিনি

সারা দেশে ১০০ শহীদ মিনার গড়তে চান। এরই মধ্যে ১৪টি নির্মাণ করেছেন। মাদারীপুর, রংপুর ও কেরানীগঞ্জে আরো ছয়টি নির্মাণাধীন। দোহারের আব্দুস সালাম চৌধুরীর ভিন্নধর্মী এই উদ্যোগের খবর জানাচ্ছেন শওকত আলী রতন

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্কুলে স্কুলে শহীদ মিনার গড়েন তিনি

বিলাশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার

২০০৮ সালের কথা। বিলাশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন আব্দুস সালাম চৌধুরী। সেখানে গিয়ে দেখলেন কলাগাছ দিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। দেখে মন খারাপ হয় তাঁর। আব্দুস সালাম চৌধুরী বলেন, ‘ছোটবেলায়ও দেখেছি, কলাগাছ দিয়ে পরম যত্নে শহীদ মিনার বানায় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারির পর সেটা আবার ভেঙে ফেলা হয়। দেখে আমার খারাপ লাগে। সেদিনও পত্রিকায় দেখলাম, দেশের প্রায় ৪০ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে স্থায়ী শহীদ মিনার নেই। ফলে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনার আগে অনেক শিশুরই চাক্ষুষভাবে শহীদ মিনার দেখার সুযোগ হয় না। বিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষার জন্য লড়াই-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্মৃতিচিহ্ন শহীদ মিনার না থাকাটা হতাশাজনক। স্কুলে এত কিছু হয়, অথচ একটা স্থায়ী শহীদ মিনার থাকবে না—এটা কেমন কথা? এ জন্য কারো দিকে চেয়ে না থেকে নিজেই উদ্যোগ নিয়েছি।’

 

প্রথম শহীদ মিনার

দোহারের পিছিয়ে পড়া গ্রামগুলোর একটি বিলাশপুর। পদ্মার তীরবর্তী গ্রামটিতেই বিশালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই স্কুলে ২০০৮ সালে শহীদ মিনার গড়ার স্বপ্ন দেখলেও নিজের অসুস্থতাসহ নানা কারণে সময়মতো কাজ শুরু করতে পারেননি। পরে ২০১৮ সালে শহীদ মিনার নির্মাণের কাজে হাত দেন। কাজ সম্পন্ন হয় ২০১৯ সালে। শহীদ মিনারের স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে স্টেইনলেস স্টিলে আর পাকা বেদিতে ব্যবহার করা হয়েছে কালো রঙের টাইলস। শহীদ মিনারটি নির্মাণে খরচ হয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকার মতো। তখন থেকে স্থায়ী এই শহীদ মিনারে একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান আয়োজন করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আসমা বেগম বলেন, ‘একটা সময়ে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা গাছ ও বাঁশ দিয়ে শহীদ মিনার বানাত। আমরাও সেখানে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতাম। এখন স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। বিষয়টা দারুণ আনন্দের।’ আব্দুস সালাম বলেন, ‘নিজ গ্রামের বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার নির্মাণের মাধ্যমে আমার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

 

দোহারেই ১৪টি

গেল তিন বছরে বিলাশপুর ছাড়াও দোহারের আরো ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করেছেন আব্দুস সালাম। এগুলো হলো—দোহারের গণি সিকদার উচ্চ বিদ্যালয়, মাঝিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পালামগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাহমুদপুর উচ্চ বিদ্যালয়, মধুরখোলা উচ্চ বিদ্যালয়, জয়পাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, বেগম আয়েশা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মেঘুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ড্যাফোডিল উচ্চ বিদ্যালয়, কার্তিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাহ্রা হাবিল উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিটি শহীদ মিনার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে দুই থেকে সাড়ে চার লাখ টাকার মতো। দোহার উপজেলায় এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি। এ বিষয়ে আব্দুস সালাম বলেন, ‘এত দিন জমির বন্দোবস্ত হয়নি বলে কাজটা থেমে ছিল। এখন জমি পেয়েছি। প্রশাসন অনুমতি দিলে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারব।’

 

এবার ঢাকার বাইরে

দোহারের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজের অর্থে শহীদ মিনার নির্মাণ করছেন আব্দুস সালাম—এ খবর ছড়িয়ে পড়তে বেশি দেরি হয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তাঁর কাছে অনুরোধ আসতে থাকে। তাদেরও হতাশ করেননি আব্দুস সালাম। এখন মাদারীপুরের বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কলেজ, রংপুরের চতরা বিজ্ঞান ও কারিগরি কলেজ, চতরাহাট বহুমুখী দাখিল মাদরাসা, কেরানীগঞ্জের বর্ণমালা আদর্শ স্কুল ও কলেজ ও ইসলামাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মিত হচ্ছে আব্দুস সালামের অর্থায়নে। 

 

তিনি চান

‘মানুষ বিত্তশালী হলে টাকা-পয়সা দিয়ে শখের জিনিসপত্র কেনে। আমার স্বপ্ন শহীদদের সম্মানে শহীদ মিনার বানানো। ১০০টি শহীদ মিনার নির্মাণ করতে চাই। দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি স্থায়ী শহীদ মিনার না থাকে, তাহলে আমাকে জানালে সেখানে শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেওয়ার চেষ্টা করব।’

 

একজন আব্দুস সালাম

জন্ম ঢাকার দোহার উপজেলার বিলাশপুরে। সাত ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। ১৯৬৮ সালে তাঁদের পৈতৃক ভিটাবাড়ি পদ্মার করালগ্রাসে বিলীন হয়ে গেলে তাঁর বাবা ক্বারি আবুল হাসেম চৌধুরী সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। আব্দুস সালামের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। এর পর থেকে ঢাকায়ই কেটেছে শৈশব-কৈশোর। এখন বাবার ব্যবসার হাল ধরেছেন। ঢাকায় মেটালিক ও ইলেকট্রিকের ব্যবসা রয়েছে। ১৯৯৮ সালের বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল দোহারের বিভিন্ন গ্রামে। তখন বন্যার্তদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর পর থেকে নিয়মিত যেকোনো দুর্যোগে এলাকার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। এই করোনাকালেও হাজারখানেক মানুষের বাড়িতে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। ২০০১ সাল থেকে বছরে একবার এলাকায় বিনা মূল্যে চক্ষু শিবিরের আয়োজন করেন। এসব কাজে বরাবরই স্ত্রী-সন্তানদের উৎসাহ পেয়ে আসছেন। আব্দুস সালাম বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা পাশে না থাকলে কোনো কাজেই সাফল্য আসে না। তাদের সহযোগিতা আমাকে এ ধরনের কাজে উৎসাহিত করেছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা