kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

[ অদম্য মানুষ ]

পয়সাপ্রেমিক

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের রাশেদুল পেশায় নরসুন্দর। শারীরিক প্রতিবন্ধিতাও আছে তাঁর। এর মধ্যেও শখের বশে দেশি-বিদেশি মুদ্রার এক সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন। শেখ মামুন-উর-রশিদ বলছেন তাঁর গল্প

২৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পয়সাপ্রেমিক

জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজকে নিজের সংগ্রহ দেখাচ্ছেন রাশেদুল

বিনিময় ব্যবস্থার অসুবিধা দূর করতে মুদ্রার প্রচলন ঘটে। কালের আবর্তনে এসব প্রাচীন মুদ্রা বিলুপ্তির পথে। তবে শখের বশে অনেকেই এরকম পুরনো মুদ্রা ও নোট সংগ্রহ করেন। তাদেরই একজন রাশেদুল ইসলাম। গড়ে তুলেছেন মুদ্রার এক বিশাল সংগ্রহশালা। এতে আধা পয়সা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি স্বর্ণমুদ্রা, পয়সাকড়ি ও নোট স্থান পেয়েছে।

 

লোকে বলে পয়সাপ্রেমিক

ছোটবেলায় এক দুর্ঘটনায় বাঁ পায়ের হাড় ভেঙে যায় রাশেদুলের। সেই থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটাচলা করেন। ভারী কোনো কিছু বহন করতে পারেন না। পেশায় তিনি নরসুন্দর। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মুদ্রা সংগ্রহ করেন।

রাশেদুলকে এলাকার লোকজন পয়সাপ্রেমিক বলে ডাকে। কয়েক বছর ধরে বন্ধুবান্ধব ও পরিচিত আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে পুরনো, অচল ও দেশি-বিদেশি পয়সা সংগ্রহ করে  বিশাল এক সংগ্রহশালা তৈরি করেছেন। ছেলের নামে নাম দিয়েছেন ‘বিপ্লব পয়সা মহল’। বিলুপ্ত পয়সাকড়ি বর্তমান প্রজন্মের কাছে পরিচিত করার মাধ্যমে অতীত সম্পর্কে জানানোই তাঁর লক্ষ্য। মোগল, ব্রিটিশ ও জমিদারি আমলের পয়সাসহ স্বর্ণমুদ্রাও আছে তাঁর সংগ্রহশালায়। এ জন্য কম কষ্ট করতে হয়নি তাঁকে। যেমন কিছুদিন আগে এক ব্যক্তি চারটি দেশের মুদ্রা দেবেন বলে লালমনিরহাটে ডেকে নেন রাশেদুলকে। কিন্তু সেখান থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়। কারণ সেই মুদ্রা কেনার মতো টাকা ছিল না তাঁর কাছে। রাশেদুলের ঝুলিতে এমন অনেক স্মৃতি জমা আছে।

 

প্রদর্শনী

মাটির পাতিল ও ঢাকনার ওপর সাজিয়ে রাখা পয়সার সম্ভার দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করে এলাকার লোকজন আর বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা দর্শনার্থীরা। তিনি নিজেও এলাকার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। সবাই খুব সুনাম করে তার। পয়সা দেখতে আসা মানুষগুলোর চোখে মুখে কৌতুহল দেখে খুব ভালো লাগে রাশেদুলের। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের জামাল গ্রামে নিজ বাড়িতে গিয়ে কথা হয় পয়সাপ্রেমিক রাশেদুলের সঙ্গে। রাশেদুল বলেন, ‘আমাদের দেশে কয়েক বছর আগেও পাঁচ পয়সা, দশ পয়সার প্রচলন ছিল। বর্তমানে পয়সার যুগ বিলুপ্তির পথে। এখন যেগুলো আছে সেগুলোও আর কদিন পরে থাকবে কী না কে জানে। তাই ভাবলাম, পয়সা সংগ্রহ শুরু করি। অনেক দিনের চেষ্টায় আমার এ সংগ্রহশালায় অচল, বিলুপ্ত ও দেশি-বিদেশি প্রায় দশ হাজার পয়সা জড়ো করেছি। ছাত্রছাত্রীদের এসব জিনিস বেশি দেখা উচিত। এসব দেখে তারা অতীত সম্পর্কে জানতে পারে। এজন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করি।’

রাশেদুলের সংগ্রহে থাকা মুদ্রার একাংশ

 

যদি জাদুঘর হতো!

সংগ্রহশালাটিকে একটা জাদুঘরে রূপ দিতে পারলে বেশ হতো, এরকমটাও ভাবছেন রাশেদুল। স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছেন এ ব্যাপারে। ‘পয়সার এই সংগ্রহশালাকে জাদুঘরের মতো করে রাখতে চাই। মানুষের কাজে লাগবে হয়তো। একটা জায়গা কিংবা ঘর পেলে খুব ভালো হতো। সরকারের লোকজনকে বলেছি। দেখা যাক।’

 

যাঁরা দেখেছেন

রাশেদুলের বাড়িতে পয়সার সংগ্রহশালা দেখতে আসা পাশের গ্রামের আসাদুজ্জামান বলেন, ‘রাজা-বাদশাহর সময়ের পয়সাগুলো দেখে আমার খুবই ভালো লেগেছে এবং অতীত  সম্পর্কে একটা ধারণা হয়েছে।’ তিনি রাশেদুলের পাশে দাঁড়ানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসন বা সরকারকে অনুরোধ জানান।

রাশেদুলের পয়সা মহলের ব্যাপারে কথা হয়, গাইবান্ধার-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রাশেদুলের পয়সা সংগ্রহশালা বিষয়ে আমি অবগত আছি। সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ এবং আমি তা পরিদর্শন করেছি। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। সে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটা যোগসূত্র স্থাপন করে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মকে অতীত ইতিহাস সম্পর্কে অবগত করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তার এ ব্যতিক্রম উদ্যোগের ব্যাপারে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলব। আপাতত একটা জায়গা তাকে দেওয়া যায় কি না সে ব্যাপারে আমরা চিন্তাভাবনা করছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা