kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

[ খুঁজে ফেরা ]

কাবার দরজা

পৃথিবীর প্রায় দুই শ কোটি মানুষের কেবলা কাবা শরিফ। কাবা নিয়ে কৌতূহলী পৃথিবীর আরো অনেক মানুষ। কাবার দরজার নকশা নিয়ে খোঁজখবর করেছেন বেলায়েত হোসেন

২৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাবার দরজা

গেল ১৯ ডিসেম্বর মারা গেছেন মুনির আল জুনদি। তিনি পবিত্র কাবার এখনকার দরজার নকশা করেছেন। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মক্কানগরীর মধ্যিখানে হজরত ইব্রাহিম (আ.) আবার কাবা নির্মাণ করেন। তাতে কোনো ছাদ বা দরজা ছিল না তখন। তবে ঢোকার দুটি পথ ছিল। সাধারণত তীর্থযাত্রীরা পূর্ব দিক দিয়ে ঢুকে পশ্চিম দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতেন। ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম জানাচ্ছেন, ইয়েমেনের শাসক তুবা চতুর্থ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে কাবায় প্রথম দরজা লাগান। গিলাফ বা কিসওয়া দিয়ে দরজা ঢেকেও দিয়েছিলেন। ইবনে জারির তাবারির সূত্র ধরে ঐতিহাসিক আজরাকি আখবারু মাক্কাহ গ্রন্থে লিখছেন, এরপর তুবা কাবার দরজা সংরক্ষণের দায়িত্ব দেন মক্কার জুরহুম গোত্রকে। দরজার পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষার জন্য তালা-চাবিও তৈরির নির্দেশ দেন। ওই দরজাটি ছিল কাঠের তৈরি।

 

ইসলামের শুরুর দিক

তুবার তৈরি কাঠের দরজাটি ইসলামের সূচনাকাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। তারপর ৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের সেটি সংস্কার করেন। তিনি কাবার পূর্ব দিকে ১১ হাত দৈর্ঘ্যের আরেকটি দরজা লাগান। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ প্রশাসক নিযুক্ত হলে আরেকটি দরজা তৈরি করান। দৈর্ঘ্যে সেটি ছিল ছয় হাতেরও বেশি।

 

বন্যা, সোনা-রুপা ও মিসরীয় কলাকৌশল

কাবার দরজায় আবার পরিবর্তন আসতে প্রায় এক হাজার বছর চলে যায়। ১৬২৯ সালে মক্কায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে কাবা শরিফের প্রায় অর্ধেক ডুবে যায়। ক্ষয়ক্ষতি হয় প্রচুর। ধসে পড়ে উত্তর দিকের দেয়াল। পূর্ব দিকের দেয়ালেরও বেশ ক্ষতি হয়। তাই আবার দেয়াল নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। নতুন দরজাও। তখন মক্কার গভর্নর ছিলেন মাসুদ ইদ্রিস বিন হাসান। মুসলিম বিশ্ব তখন উসমানী খলিফাদের শাসনে ছিল। তাই খলিফাতুল মুসলিমিন এবং খাদেমুল হারামাইনিশ শারিফাইন সুলতান চতুর্থ মুরাদকে কাবা সংস্কারের আশু পদক্ষেপ নিতে বার্তা পাঠান মক্কার গভর্নর। শেষে খলিফার নির্দেশে এবং মিসরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলী আল আলবানীর তত্ত্বাবাবধানে দেয়াল নির্মিত হয়। সেই সঙ্গে একদল মিসরীয় প্রকৌশলী পুরনো নকশায়ই নতুন একটি দরজা তৈরি করেন। পুরনো নকশায় অবশ্য অনেক কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়। দরজার দুই পাল্লায় ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন জ্যামিতিক গড়ন তৈরি করা হয়। মোট ৯০ কেজি রুপা ব্যবহৃত হয় দরজা তৈরিতে। কারুকাজে স্বর্ণের ব্যবহার ছিল। উচ্চমান সহনক্ষমতার ধাতব পাত ব্যবহার করা হয়, যেন দুর্যোগেও ক্ষতি কম হয়। এ সংস্কারকাজ ১৬২৯ সালের অক্টোবরে শুরু হয়ে পরের বছরের মার্চ মাসে শেষ হয়। পরের তিন শতক এই দরজা টিকে ছিল।

 

আবার ৩১৭ বছর পর

সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার পর বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদ ১৯৪৪ সালে আরেকটি দরজা তৈরির  নির্দেশ দেন। তিন বছর ধরে এর নির্মাণকাজ চলে। ১৩৬৩ হিজরিতে কাবায় নতুন আরেকটি দরজা লাগানো হয়। ৩১৭ বছর পর বদলানো এ দরজা অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি করা হয়। ভিতে লোহার পাতও ছিল। শেষে এর ওপর রুপার পাত লাগানো হয়। তারপর সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়। আর কোরআনের আয়াত লিপিবদ্ধ হয় দরজায়।

 

এখনকার দরজাটি

কাবার দরজায় শেষ পরিবর্তন আসে ১৯৭৮ সালে মানে ১৩৯৮ হিজরিতে। তখনকার সৌদি বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজ নতুন দরজা লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। দরজার জন্য তিনি নতুন নকশাও আহ্বান করেন। অনেকের সঙ্গে মুনির আল জুনদিও নকশা জমা দেন। তিনি একজন সিরীয় প্রকৌশলী।  বাদশাহ তাঁর নকশাটিই পছন্দ করেন। আর সে অনুযায়ী কাজও শুরু হয়। এ দরজার উপরিভাগে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সা.) নাম লেখা হয়। দরজায় কোরআনের আয়াত ও আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহ যুক্ত করা হয়। কিছু আরবি প্রবাদও লেখা রয়েছে। দরজাটির দৈর্ঘ্য ৩.১ মিটার আর প্রস্থ দুই মিটার। মোট ২৮০ কেজি সোনা ব্যবহৃত হয়েছে এতে। দরজার পুরুত্ব আধা মিটার। থাইল্যান্ড থেকে আনা ম্যাকা কাঠ লাগানো হয়েছে দরজায়। মক্কারই বিখ্যাত স্বর্ণকার শেখ আহমদ বিন ইব্রাহিম বদরের কারখানায় দরজাটি তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, শুধু এই দরজা করার জন্যই কারখানাটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। শেখ আহমদ স্বর্ণের কাজ শিখেছিলেন তাঁর বাবা শেখ ইব্রাহিম বদরের কাছে। আর শেখ বদর আবার বাদশাহ আব্দুল আজিজের সময়ে তৈরি দরজা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা