kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

যখন বন্দি ছিলাম

আধা যুগ আগের ঘটনা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন মামুন। বছর দুয়েক পর মামলা করেন তাঁর বাবা। আসামি হিসেবে নাম ছিল তাসলিমারও। তাঁর সঙ্গে নাকি প্রেম ছিল মামুনের। গেল ৩০ সেপ্টেম্বর ‘গুম হওয়া’ সেই মামুন সশরীরে আদালতে হাজির হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়! অবশেষে ৫ নভেম্বর অব্যাহতি পান তাসলিমা। পিন্টু রঞ্জন অর্ক লিখেছেন পুরোটা

২৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



যখন বন্দি ছিলাম

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

মতলব, চাঁদপুর। ২০১৪ সালের ১০ মে। নিখোঁজ হন মামুন। অপহরণ, খুন আর গুমের অভিযোগ এনে মামলা করেন মামুনের বাবা ২০১৬ সালের ৯ মে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। এজাহারে বলা হয়, তাসলিমার সঙ্গে মামুনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আর তা মেনে নিতে পারেনি তাসলিমার পরিবার। তাই মামুনকে গুম করা হয়েছে। তাসলিমার সঙ্গে আসামি করা হয় তাঁর বাবা রকমত আলী, ভাই রফিক, খালাতো ভাই সোহেল, সাগর আর মামা সাত্তার মোল্লাকে। আসামিদের প্রত্যেকেরই বিভিন্ন মেয়াদে হাজতে থাকতে হয়। প্রায় এক বছর জেল খাটেন তাসলিমা। মাকসুদা বেগম নামের এক নারী চাক্ষুস সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিও দিয়েছিলেন! হঠাৎ গেল ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির হন মামুন। তাসলিমার মুখেই শুনুন সে কাহিনি।

 

রান্না বসাইছিলাম

২৬ জুন ২০১৬।  দুপুরের রান্না বসাইছিলাম। হঠাৎ ফোন আইল। আম্মু কেঁদে কেঁদে কইলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ কোর্টে আইস। সালেন্ডার (আত্মসমর্পণ) কইরতে হবে।’ কী করব বুঝতে পারছিলাম না। রান্নাবান্না ফেইলে বাবার সঙ্গে কোর্টে চইলা যাই। কখনো কোর্ট-কাচারি দেখিনি। আমার হাত-পা কাঁপছিল। কোর্ট থেকে নিল জেলে। একা একটা ঘরে থাকতে দিল। রাতে এক মহিলা এসে ভাত আর ডাইল দিয়া গেল। সারা রাত দেয়ালে হেলান দিয়া বসেছিলাম।

 

এবার থানায়

এক দিন পর আবার কোর্টে তুলল। বাবা আর ভাইরেও আনছে। বাবার জামিন হইল। আমাদের দুই দিনের রিমান্ট (রিমান্ড)। কোর্ট থেইকা নিয়া গেল থানায়। পরে এক মহিলা আইল। একটু পানি চাইলাম। দিল না। খানিক পর মিজান দারোগা আইল। বলল, ‘মাইর শুরু করলে ফর ফর কইরা কথা বাইর অইবো।’ গায়ে ওড়না ছিল। মহিলা পুলিশ আইসা নিয়া নিল। ওড়না থাকলে নাকি গলায় ফাঁস দিবার পারি! পরদিন সকালে দেখি বাদীরা থানায়। তাদের সামনেই দারোগা আমার হাতের গিরায় এবং পায়ের হাঁটুতে মারছে। বারবার কয়, ‘বল, মামুনকে বিষ খাওয়ায়ছিস।’ ওই যন্ত্রণা সহ্য করার মতো না।

 

থালা-বাটি-কম্বল

পরদিন আবার জেলে। সেখানে আমার ঠিকানা দুই নাম্বার রুম (সেল)। আমরা ২৫ জন। মহিলা পুলিশ আইসা দুইটা কম্বল দিল। একটা বিছাইতাম, আরেকটা বালিশ বানাইয়া মাথার নিচে দিতাম। আর খাবারের লাইগা ছিল একটা পেলেট (থালা) আর দুইটা বাটি। পেলেটে নাম্বার লেখা থাকত। আমার নম্বর আছিল ১৪। ফজরের সময় ঘণ্টি বাজত। ঘুম থেকে উইঠা রুম ঝাড়ু দিতাম। সকালে একটা পোড়া রুটি আর মিঠাই (গুড়) দিত। খাওয়া শেষে ডাইল-চাইল বাছতে দিত। এসব করতে করতে দুপুর হইয়া যাইত। গোসল করতাম। পরে খাওন আসত। লাইন ধইরা দাঁড়াইয়া ভাত নিতে হইত। তরকারি বলতে ডাইল আর মিষ্টি কুমড়া, নাইলে পাঁচমিশালি সবজি। ঠ্যালা-ধাক্কা লাইগাই থাকত। কয়েকবার মাইরও খাইছি। মাইরের ভয়ে পরে পিছে দাঁড়াইতাম। সন্ধ্যার পর গুইনা গুইনা রুমে তালা দিত। রোজার সময় সেদ্ধ বুটের লগে একটা কইরা খেজুর আর সবজির বড়া দিত। ঈদের সময় আম্মু একবার পাঙ্গাশ মাছ আর গরুর মাংস পাঠাইছিল।

 

কেউ দেখে না

প্রথম দিকে কেউর লগে কথা কইতাম না। চুপচাপ থাকতাম। মাইনষে জিগাইত—খুন করছ, না অন্য কিছু? একসময় নিজের কাহিনি বলতাম, ওদেরটাও শুনতাম। আমার মতোই আরেকটা মেয়ে ছিল লিমা। দুই বাচ্চার মা।  জেল খাটতেছে প্রায় ১০ বছর। হ্যায় নাকি স্বামীরে খুন করছে! শাশুড়ি পরে বউয়ের নামে মামলা দিছে। বাবা-মা বাইচা নাই। একদিন সন্ধ্যায় এক কোনায় বসে কানতেছিলাম। লিমা মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে কইল, ‘আমার কোনো গার্জিয়ানই নাই। ১০ বছর পর হইলেও তুমি বাইর হইবা। আমার তো সেই আশাও নাই!’ ফাতেমা নামের আরেকজন ছিল। সে-ও ফাঁইসা গেছে। ওরে অনেকবার রিমান্টে নিছে। এখন প্রায় পঙ্গু। ঠিকমতো খায় না। কেউ খোঁজও নেয় না। মেয়েটা প্রায় সময় গান গাইত।

 

জেলের ভিতর জেল

এক বয়স্ক কয়েদি থাকত আমাগো লগে। আমরা দাদু ডাকতাম। দাদু একদিন আমারে কইল, ‘বাথরুম পরিষ্কার কর।’ আমি কইলাম, ‘কুনো দিন তো করি নাই।’ লিমা আইসা কইল, ‘দাদু, আমি করে দিই?’ ওরে একটা থাপ্পড় দিল। আর আমারে ঝাঁটা দিয়া দুইটা বাড়ি দিল। পরে লিমা একটা আর আমি তিনটা বাথরুম ধুইছি। আরেক দিন সকালে ফুল বাগানে ঘাস কাটতে গেছি। খালি মার কথা মনে পড়তেছিল। বসে আছি দেইখ্যা দাদু আমারে কাঁচি দিয়া বাড়ি মারল। দেখা করতে আইসা আম্মু গায়ের সাবান দিত। কিন্তু তা মাখতে পারতাম না। দাদু নিয়া নিত। যারা অনেক বছরের কয়েদি, হয়তো ফাঁসির ওয়াডার (আদেশ) হইয়া গেছে, বাইর হইবার কোনো আশা নাই, তারাই এগুলা করত বেশি।

 

মজুরি ছিল কিন্তু পাইতাম না

জেলে কেউ কাঁথা সেলাই করত। কেউ বানাইত মোড়া, কেউ পুুঁতির ব্যাগ। এগুলোতে টাকা দিত স্যারেরা। তবে ঘাস কাটা, চাল ঝাড়া এগুলোর টাকা ছিল না। আমি পুঁতির ব্যাগ বানাইতাম। আমাদের সবার সিলিপ (রসিদ) এক নাম্বার রুমের একটা মেয়ের (সর্দারনী গোছের) কাছে থাকত। নির্দিষ্ট একটা দিনে টাকা দিত। একবার আমার তিন শ টাকা আসছিল। ওই মেয়েটা তুইলা নিছে।

 

আরেকটু কথা কইতে

আম্মু, আন্টি, খালাতো ভাইয়েরা যাইত দেখা করতে। ছোট ছোট খোপের মতো রুম। আমি যে পাশে সেখান থেকে আম্মু বা আন্টি কয়েক হাত দূরে। চিকরাইয়া কথা কইতে অইত। দশটা কইলে একটা বুঝত। ৫ কী ১০ মিনিট সময় পাইতাম। কিছু মহিলা পুলিশ ছিল, টাকা দিলে বেশিক্ষণ কথা কইতে দিত। যেদিনকা বেশি কথা কইতে মন চাইত, আব্বু-আম্মুরে কইতাম, লাগলে হাঁইটা যাইয়ো। গাড়ি ভাড়ার টাকাটা পুলিশরে দাও। তা-ও আরেকটু কথা কইয়া যাও। আম্মুরে কইতাম, যেমনে হউক আমারে বাইর করো। দুনিয়ার আলো-বাতাস দেখি না। তোমাদের একটু ছুঁইতে ইচ্ছ করে। মাঝে মধ্যে উকিল কাগজপত্র পাঠাইত। সই করার পর মনে হইত কালই বুঝি জামিন হইব!

 

ঈদের দিন খুশির দিন

জেলে ছোট ছোট কয়েকটা বাচ্চা ছিল। রোজার ঈদে দেখলাম, সেই বাচ্চাদের নতুন জামাকাপড় দিছে। ঈদের সময় ওদের সঙ্গে ভালো সময় কাটল। ঈদে পোলাউ-গোশত দিত। একদিন, এক বিদেশি আসল হাজতে। সম্ভবত ইন্ডিয়ান। শুনলাম চেক জালিয়াতি মামলায় ফাঁইসা গেছে। জেলে সবাইকে নিয়ে জন্মদিন পালন করছে। অনেকে তার কাছে আবদার করছে, ‘দেখো বাইরের দেশের মানুষ তুমি। কদিন পরে তো চইলা যাইবা। আমরা অনেক দিন কোনো অনুষ্ঠান দেখি না। গান-বাজনাও হয় না। তুমি কইলে হইতে পারে।’ পরদিন দেখলাম, বড় স্যারেরা বক্স (সাউন্ডবক্স) নিয়া আইল। আসামিরা মিলল্যা নাচগান করল।

 

ভাইয়ের হাত

প্রায় বছর পার হইতেছে। খালি মনে হইত আর এখান থেকে বাইর হইতে পারব না। একদিন শুনলাম, ভিতরে (জেলের) রক্তের সম্পর্কের কেউ থাকলে তাদের সঙ্গে দেখা করা যায়। লিমা কইল, ‘আমার তো কেউ নাই, শুনলাম তোমার ভাই আছে।’ পরে এক নম্বর রুমের ওই মেয়েটার কাছে গেলাম। শুনে একটা থাপ্পড় মারল! পরে পা ধরলাম—‘বাপ-মাকে তো ছুঁইয়ে দেখতে পারি না। ভাইয়ের হাতটা অন্তত ধরতে পারুম। তুমি একটু দাও বইলা।’

ওর মন গলল। একদিন দুপুরে খাওনের পরে দেখার সুযোগ মিলল। একটা রুমের বাইরে ভাইয়েরা ছিল। আমরা কয়েকজন ভিতরে। কতদিন পর যে ভাইয়ের হাতটা ধরলাম!

 

ছাড়া পাইলাম

একদিন আন্টি আইসা কইল, হাইকোর্ট থেইকা কাগজ আইলে সই কইরা দিয়ো। কদিন পর জানলাম, জামিন হইছে। কিন্তু হাজতে কাগজ আসতে আরো ১৫ দিন লাগবে। কী যে খুশি লাগছিল তখন। বাইর হওনের দিন অনেকে ফোন নম্বর দিছিল। কইল, ‘ফোন কইরা গার্জিয়ানরে কইয়ো, যেন আমার সঙ্গে দেখা করে।’

২৭ এপ্রিল ২০১৭। ছাড়া পাইলাম। দৌড়ে গিয়া আম্মুরে জড়াইয়া ধরলাম।

 

কোথায় ছিলেন মামুন?

মা-বাবার ওপর রাগ করে বাড়ি ছেড়ে নাটোর চলে গিয়েছিলেন মামুন। গত বছরের ২২ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে মামার বাসায় এলে এই মামলার কথা জানতে পারেন। পরে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে মামুন বলেন, ‘আমাকে কেউ অপহরণ করেনি।’

তাসলিমার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমদাদ হোসেন সোহেল বলেছেন, ‘মামুন জীবিত ফেরার কারণে মামলাটি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। মামলার বাদী ও মিথ্যা সাক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছি। সেটির সুরাহা হলে আমরা ভিকটিমের ক্ষতিপূরণ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা