kalerkantho

সোমবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭। ১ মার্চ ২০২১। ১৬ রজব ১৪৪২

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী

বেগম হজরত মহল

মালিকা-এ-আওধ ছিলেন তিনি। ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতাসংগ্রাম, মানে সিপাহি বিদ্রোহের একজন নেতা। তিনি হজরত মহল। তাঁকে নিয়ে মুগ্ধতা আছে মোহাম্মদ মাহবুবুর নূরের

১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বেগম হজরত মহল

নেপালের কাঠমাণ্ডুর জামে মসজিদ। ২০১৮ সালে গিয়েছিলাম। মসজিদের এক ধারে একটি সাধারণ সমাধি। এটি হজরত মহলের। আগের বছর যখন লখনউ গিয়েছিলাম, তখন জানতে পারি আওধের মালিকার সমাধি কাঠমাণ্ডুতে। লখনউতে হজরত মহলের নামে একটি পার্ক আছে আর তার মাঝখানে আছে একটি স্মৃতিফলক।

 

নর্তকী ছিলেন

ভারতের ফৈজাবাদে (এখনকার অযোধ্যা) জন্মেছিলেন। মীর গোলাম আলী ছিল পিতার নাম। রূপসী কন্যাকে অল্প বয়সেই বিক্রি করে দিয়েছিলেন নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের পরিখানায়। পরিখানা আসলে ছিল কলাকেন্দ্র। সেখানে নবাব সংগীত ও নাচের জলসা বসাতেন। মুতা বিয়ের মাধ্যমে পছন্দের কাউকে শয্যাসঙ্গিনী করতেন। তাঁরা বেগম উপাধি পেতেন আর যাঁরা পুত্রসন্তানের জননী হতেন, তাঁরা পেতেন মহল উপাধি। তবে একপর্যায়ে নবাব হজরত মহলকে অশুভ আখ্যা দিয়ে তালাক দিয়েছিলেন। তখন কয়সরবাগের নাগিনওয়ালি প্রাসাদে তাঁর স্থান হয়েছিল।

 

মহাবিদ্রোহ

মে, ১৮৫৭, লখনউ। ফৈজাবাদ ও এলাহাবাদ (এখন প্রয়াগরাজ) থেকে বিদ্রোহী সেনারা এসে জড়ো হচ্ছিল লখনউতে। নবাব তাজ ও সিংহাসন হারিয়েছিলেন ১৮৫৬ সালে। সেগুলো উদ্ধারের জন্য দরবার করতে তখন তিনি কলকাতায়। সিপাহিরা নবাবকে না পেয়ে পরিবারের কাউকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। নবাবপুত্র বিরজীস কদ্র তখন নাবালক। সিপাহিরা বিরজীসকে সিংহাসনে বসিয়ে হজরত মহলকে তাঁর প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। হজরত মহল মুদ্রা প্রচলন আর মন্ত্রিসভাও গঠন করেছিলেন। তিনি ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও শ্রেণিভেদ ঘুচিয়ে সবাইকে বিদ্রোহে শামিল করেন। রাজা জয় লাল সিংকে প্রধান সেনাপতি এবং একজন দলিত নারী উদা দেবীকে নারী সেনা ইউনিটের প্রধান করেছিলেন। বড় মুখ করে বলার ব্যাপার, উদা দেবী একাই ৩২ জন ব্রিটিশ সেনাকে হত্যা করেছিলেন। প্রজাদের ভালোবাসায় ‘জনাব-এ-আলিয়া’ হয়ে উঠেছিলেন হজরত মহল।

 

যেমন শাসক ছিলেন 

হজরত মহল হাতিতে চড়ে সম্মুখভাগে থেকে যুদ্ধে সেনাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর অল্প সময়ের শাসনকালে নিয়মিত রাজস্ব আদায় হতো। তিনি লখনউকে সুরক্ষিত করতে পাঁচ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। ১ নভেম্বর ১৮৫৮ মহারানি ভিক্টোরিয়া সমগ্র ভারত ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কাছ থেকে নিজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। হজরত মহল রাজ্য হারান। তিনি ফৈজাবাদের দিকে চলে যান। সেখানে তিনি মৌলভী আহমদ উল্লাহ শাহ্ এবং মারাঠা নেতা নানা সাহেব ধুণ্ডুর সঙ্গে জোট বেঁধে ব্রিটিশদের প্রতিরোধ করেন। পরে শিখ ও গুর্খা সেনাদের সঙ্গে নিয়ে ব্রিটিশরা অগ্রসর হলে হজরত মহল তরায়ের গহিন জঙ্গলে আশ্রয় নেন। ১৮৫৯ সালে তিনি নেপালে রওনা হন, তাঁর সঙ্গে তখন এক লাখ অনুসারী ছিলেন। তাঁরা স্থির করেছিলেন হিমালয়ে আশ্রয় নেবেন এবং সুযোগ পেলেই ইংরেজদের আক্রমণ করবেন। তবে নেপালের রাজা রানা জং বাহাদুর চতুর ছিলেন; তিনি অনুগামীদের ভাগিয়ে দিয়ে হজরত মহল ও বিরজীস কদ্রকে একরকম গৃহবন্দি করেন। 

 

শেষ জীবন

কাঠমাণ্ডুতে হজরত মহল তাঁর পুত্র বিরজীস কদ্রকে নিয়ে অতি সাধারণভাবে জীবন কাটিয়ে দেন। আর কখনোই ব্রিটিশের রাজত্বে ফিরে আসেননি। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ক্ষমা করে পেনশন, খেতাব ও সম্পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল চার-চারবার। প্রতিবারই তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ১৮৭৪ সালে মৃত্যু হলে তাঁকে কাঠমাণ্ডু জামে মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা