kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

[ বিশ্ব বিচিত্রা ]

আহা সেই সব ঘ্রাণ

২৪ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আহা সেই সব ঘ্রাণ

ষোড়শ শতকের অনেক গন্ধই মিলিয়ে গেছে বাতাসে। সেই কবে! কিন্তু ইউরোপের বিজ্ঞানীরা বাতাস থেকেই চার শতকের ঘ্রাণ ফিরিয়ে আনতে উঠেপড়ে লেগেছেন। খবর পেয়েছেন আল সানী

প্রকল্পের নাম ওডেওরোপা। প্রকল্পের বাজেট ধরা হয়েছে ২৯ কোটি টাকা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হরাইজন ২০২০ কর্মসূচির আওতায় আছে প্রকল্পটি। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা। সঙ্গে আছেন নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স আর স্লোভেনিয়ার বিজ্ঞানীরাও। আড়াই লাখ চিত্রকর্ম, হাজারের বেশি পুস্তক, কারখানার চিমনি, রেলের বগি, আসবাব, ভবন নির্মাণসামগ্রী, পোশাক-আশাক, খাওয়ার চামচ-থালা ইত্যাদির তালিকা করা হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে পুরোদমে গবেষণা শুরু হবে। চলবে তিন বছর। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন ১২০টি হারিয়ে যাওয়া গন্ধ ফেরত আনা যাবে। তারপর সব তথ্য ও গন্ধ এক জায়গায় করে প্রকাশিত হবে এনসাইক্লোপিডিয়া অব স্মেল হেরিটেজ।

 

কয়েক ধাপে হবে

প্রথম ধাপে প্রাকৃতিক ভাষা বোঝার উপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) উন্নয়ন ঘটানো হবে। পরের ধাপে পেইন্টিং, প্রিন্ট, বই, নথি ইত্যাদির তথ্য সাতটি ভাষায় রূপান্তর করা হবে।  শেষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ভর করে পুরনো গন্ধকে নতুনভাবে সামনে আনা হবে। আমরা সাধারণত জাদুঘরে গিয়ে কোনো বস্তুকে চোখে দেখতে পারি, পারি ছুঁতেও। প্রকল্পটি সফল হলে নির্দিষ্ট বস্তুর ঘ্রাণও নেওয়া যাবে। 

মধ্যযুগের শিল্পকর্মই গবেষকদের প্রধান টার্গেট। নেদারল্যান্ডসের চিত্রশিল্পী গেরটেট টট সেট জন্সের অ্যাডোরেশন অব দ্য ম্যাজাই (১৪৮০ থেকে ১৪৮৫ সালে আঁকা) চিত্রকর্মটিকে তাঁরা প্রথম আমলে নিয়েছেন। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে শিশু যিশুকে সম্মান জানাতে তিনজন জ্ঞানী ব্যক্তি উপহারসামগ্রী ও সুগন্ধি নিয়ে এসেছেন। পরীক্ষামূলকভাবে গবেষকরা সুগন্ধিযুক্ত রেসিন পুড়িয়ে ছবিটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। চেষ্টা ছিল যিশুকে দেওয়া সুগন্ধির ঘ্রাণ দর্শকদের পাইয়ে দেওয়া। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলকাম লাইব্রেরির সুবিশাল গ্রন্থ ভাণ্ডারে গিয়ে গবেষকরা দেখেছেন বইগুলোতে পুরনো দিনের গন্ধ সে রকম আর নেই। অথচ সে সময়কার মানে ষোলো বা সতেরো শতকের কালিতে ঘ্রাণ উদ্রেককারী উপকরণ মেশানো হতো। কেমন ছিল সে গন্ধ? গবেষকরা প্রাচীন নথিতে খুঁজে পেলেন, অনেকটা তামাক পাতার মতো; আবার পুরোপুরি তামাক পাতার মতোও নয়। পাঁচ শ বছরের গন্ধ যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তার গ্রাফ তৈরি করবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। তারপর গন্ধগুলোর নমুনা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পাঠানো হবে। শুঁকে নিয়ে তাঁরা জানাবে, গন্ধ কিসের মতো? গবেষণা হবে গন্ধগুলোর কোনটি খুশি, রাগ বা মিশ্র অনুভূতি জোগান দেয় তা নিয়েও।   

  

সেসব দিনের গন্ধ

পনেরো শতকের শেষের দিকের ইউরোপে তামাক সেবনের চল হয়। তবে শুরুতে ইউরোপীয়দের তামাকের গন্ধ ভালো লাগেনি। সতেরো শতকে এসে এটি খুব জনপ্রিয় হয়। মাত্র এক শ বছরে কী এমন পরিবর্তন হলো যে তা এতটাই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠল? জানতে চান গবেষকেরা। আর সে জন্য তাঁদের এটাও জানতে হবে কেমন ছিল পনেরো শতকের তামাকের ঘ্রাণ আর কেনই বা তা মানুষের মস্তিষ্ক নিতে পারেনি। আবার ১৬৩০ সালে ইতালিতে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। তখন এক বিজ্ঞানী দাবি করেছিলেন, পুরুষ ছাগলের শরীর থেকে নিঃসৃত গন্ধ প্লেগ ঠেকাতে পারে। কথাটি তখনকার ইউরোপে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকরা নথি ঘেঁটেও দেখলেন তাতে মোটামুটি এমন লেখা, প্লেগ রোগী যদি পুরুষ ছাগলের (এদের গন্ধ উৎকট হয়) সঙ্গে বসবাস করে তাহলে সে প্লেগ থেকে রেহাই পাবে। এখন গবেষকদের কাছে চ্যালেঞ্জ হলো, ওই সময় ছাগলের গন্ধ কতটা উৎকট ছিল তা খুঁজে বের করা। পরের ঘটনাটা ১৭৩৭ সালের। আইরিশ ব্যবসায়ী জর্জ বার্কলে পানির সঙ্গে পাইন টার মিশিয়ে বিশেষ এক সিরাপ তৈরি করেন। তিনি স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে শুনেছিলেন, এই সিরাপ জ্বরের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। সিরাপটা খুব তেতো আর কটু গন্ধের ছিল। অল্প কিছু বিক্রি হলেও একসময় এটি জনপ্রিয়তা হারায়। এখন ওডেওরোপার গবেষকরা চাইছেন সেই কটু গন্ধ ফিরিয়ে আনতে।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হেরিটেজ সায়েন্সের অধ্যাপক মাতিহা স্ট্রিলিক পুরনো বইয়ের গন্ধ নিচ্ছেন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা