kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কচ্ছপের সঙ্গে ১০ দিন

২৪ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কচ্ছপের সঙ্গে ১০ দিন

ছবি : লেখক

গত বছরই হোমায়েদ ইসহাক মুন ভারতের ধরমশালায় একটি এনিম্যাল রেসকিউ সেন্টারে স্বেচ্ছাসেবক হয়েছিলেন। দেশে এবার একটি কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্রে কাজ করেছেন। বলছেন সে অভিজ্ঞতা

বান্দরবানের পাহাড়ে ধান কাটার সময়। কার্তিক বা অগ্রহায়ণ মাস। ধান কাটা শেষ হলেই পাহাড়ে জ্বলে আগুন। নতুন ফসল ফলানোর প্রস্তুতি নিতেই এ কাজ।  তেমন একটি পাহাড়ের জল-জংলায় লুকিয়ে ছিল এক কচ্ছপ। গরমের আঁচ পেয়ে এগোতে থাকল; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পাকা আর শুকনো ধানের চিটায় আগুন দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। কচ্ছপটির খোলস ঝলসে যায় আগুনে। খোলসের ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে প্রাণপণে বাঁচতে চেয়েছিল। দেখতে পেয়ে পাহাড়িরাই তাকে বাঁচায়। আরাকান জংলি প্রজাতির কচ্ছপটি এখন আছে ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের (সিসিএ) কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্রে। দুর্ঘটনায় আহত হওয়া আরো কিছু কচ্ছপও আছে এখানে।

 

সম্মতি পেলাম

ভাওয়াল ন্যাশনাল ফরেস্টের ৬ নম্ব্বর গেট দিয়ে ঢুকে বেশ খানিকটা বুনো পথ হেঁটে গেলে পাওয়া যায় প্রজনন কেন্দ্রের  দরজা। কেন্দ্রটি পাহারা দেয় তিনটি কুকুর নাম—লক্ষ্মণ, জ্যাক আর লালমিয়া। নতুন কারোর গন্ধ পেলেই ঘেউ ঘেউ করে ওঠে।  আগেও একবার এসে ঘুরে গিয়েছিলাম। দেখে-শুনে ইচ্ছা হয়েছিল স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার। সিসিএর শাহরিয়ার সিজার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগ্রহের কথা জানালাম। তিনি ভেবেচিন্তে সম্মতি দিলেন। সিসিএতে অনেক দিন থেকেই কাজ করছেন ফাহিম জামান। প্রথমেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলো। প্রাণীদের সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন। বলা যায় প্রাণিকুল সংরক্ষণকাজে নিজেকে সমর্পণ করেছেন।

 

বৃষ্টি হয়েছিল সে রাতে

দিনের অনেকটাই গেছে আলাপ-পরিচয়ে।  ফাহিম আর সিজারের কাছে সিসিএ সম্পর্কে জানলামও অনেক কিছু। রাতে বৃষ্টি এলো। সিজার আর ফাহিম ভিজে ভিজে কচ্ছপের বাচ্চাগুলোকে একটু উঁচু জায়গায় নিয়ে রাখছিলেন; নইলে যে ঠাণ্ডায় মরবে। এর মধ্যে একটা বাচ্চা মারাও গেল। চেনার সুবিধার জন্য বাচ্চাগুলোর খোলসের ওপর নম্বর দিয়ে রাখা হয়েছে। যদি এগুলোর ৫০ শতাংশও বাঁচে তাহলেই সফল ধরা যাবে। পরদিন সকালে বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপের কিছু ডাটা এন্ট্রি দিলাম। যেমন—উচ্চতা, ওজন, দেহের মাপ ইত্যাদি।  কেন্দ্রে কমল ২৪ ঘণ্টা থাকেন। বাড়ি তাঁর শ্রীমঙ্গল। তাঁর বড় ভাইয়ের নাম চঞ্চল। সাত বছর হতে চলল তিনি সিসিএতে কাজ করছেন। এর মধ্যে চার বছর ধরে আছেন শ্রীমঙ্গলের পাইথন প্রজেক্টে। কেন্দ্রে চঞ্চল এসেছেন একটি রান্নাঘর তৈরির কাজে সহায়তা দিতে। পাইথন প্রকল্পের লোমহর্ষক সব গল্প শুনলাম তাঁর কাছে। কমল অনেক ছোট চঞ্চলের চেয়ে। ফুটবল খেলতে ভালোবাসেন কমল আর রান্নার কাজও করেন। আমিও যেহেতু রান্নাবান্না ভালোই পারি, তাই কমলের সঙ্গে হাত লাগালাম। কচ্ছপ দেখাশোনা, খাবার দেওয়া ইত্যাদি কাজের জন্য আছেন রউফ ভাই। বাড়ি তাঁর জঙ্গল লাগোয়া। আগে তিনি ভাওয়াল বনের সংরক্ষিত হরিণ দেখাশোনা করতেন। খুব রসিক মানুষ। রউফ ভাই ওই দিন লেকে একটা ছোট মাছ ধরেছিলেন। ফাহিম মাছ কেটে দিলেন আর আমি দোপিয়াজা করলাম।

 

যেভাব গেল দিন

কেন্দ্রের ডান দিকে স্বেচ্ছাসেবকদের থাকার জায়গা আর বাঁ দিকটা কচ্ছপের জন্য। কিছু বাঁশের বেঞ্চিও পেতে রাখা আছে। গাছতলার ছোট্ট উঠানটি মায়াবী। দুটি গাছের মাঝখানে হ্যামক ঝুলিয়ে কাজের পরে এখানে বিশ্রাম নিই আর বই পড়ি।

আজ প্রায় সারা দিনই বৃষ্টি হলো। গান শোনা, ছবি দেখা, পানি আনতে যাওয়া—এই করেই দিন পার করলাম।  কেন্দ্রের সীমানা পার হয়ে একটু দূরে জেসমিন নামের একটি বন বাংলো আছে। গাছের সারি পার হয়ে সেখান থেকে পানি আনতে হয়। বন সুনসান নীরব, তবে বানরের উৎপাত আছে। অনেক গাছ আর অনেক পাখি ভাওয়াল বনে। এর মধ্যেই এই কেন্দ্র—কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র।

শুরুর কথা

সিজার বলছিলেন, ‘২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশের বন্য প্রাণীদের নিয়ে কাজ শুরু করি। আমি বিশ্বাস করি, বন না বাঁচলে বন্য প্রাণী বাঁচবে না। আলিকদম-থানচি রিজার্ভ ফরেস্ট, সাংগু-মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টে ঘুরে বেড়িয়েছি উভচর আর সরীসৃপ জরিপের কাজে। প্রথমবার এক বনে গিয়ে যা দেখেছি, পরের বারই দেখি সব তেমন নেই। হয় বন্য প্রাণী শিকার করা হয়েছে, নয়তো শতবর্ষী বৃক্ষ নিধন। ওই জরিপ কাজে গিয়েই বেশ কিছু বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপের সন্ধান পাই। কয়েকটি পাহাড়ি পাড়ায় কচ্ছপের খোলসও পাই।  এর মধ্যে পাহাড়ি শিলা কচ্ছপও ছিল। এর পর থেকেই ভাবনা আসে একটি সংরক্ষণ প্রকল্প দাঁড় করানোর।

বান্দরবানের পাহাড়ি কচ্ছপ দিয়েই শুরু। ২০১২ সালে  সন্ধান পাই, নাম ডিবা কচ্ছপ। এটিও বিপন্ন প্রজাতির।’

চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে সাত প্রজাতির কচ্ছপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো অ্যাকুয়াটিক, নয়তো সেমি অ্যাকুয়াটিক। সিসিএ চারটি কচ্ছপ প্রজাতি নিয়ে কাজ করছে—নাম পাহাড়ি শিলা কচ্ছপ, পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ, আরাকান জংলি কচ্ছপ ও ডিবা কচ্ছপ।  ভাওয়াল পার্কে জায়গা পাওয়ার পর এক ডজনেরও বেশি কচ্ছপ বান্দরবানের গহিন বন থেকে উদ্ধার করে আনা হয়। এরা প্রায় ৫০টি বাচ্চা দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে।  যাদের বয়স এক বছর হয়ে গেছে তাদের প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছিল; কিন্তু করোনার প্রকোপ শুরু হয়ে যায় তার মধ্যেই। এখানে বলার মতো ব্যাপার এই যে, শিলা কচ্ছপ ৩০ কোটি বছর ধরে আছে পৃথিবীতে। বিলুপ্তই হয়ে যাচ্ছিল। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ওদের টিকে থাকার সময়কাল বাড়িয়ে দিচ্ছে সিসিএ।

 

কচ্ছপ পালন

প্রাপ্তবয়স্ক কচ্ছপের খাবার দেওয়া হয় দুদিন পর পর, এক বেলা করে। বাচ্চাদের দেওয়া হয় প্রতিদিন। খাবারের তালিকায় থাকে নানা ধরনের শাকসবজি, কচু, কেঁচো ও মাছ। রউফ ভাই প্রতিদিন সাতসকালে এক গামলা সবজি নিয়ে বসেন আর তা কুচি কুচি করে কাটেন। তারপর কচ্ছপগুলোর কাছে নিয়ে যান। ওরা যতই লুকিয়ে থাকুক একটা সময় গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে আসে। ব্যাপারটা দেখতে খুব ভালো লাগে। কচ্ছপগুলো অবশ্য এখন রউফ ভাই, সিজার বা ফাহিমকে বন্ধুই মনে করে। 

 

কেটে গেল ১০ দিন

টেরই পেলাম না কিভাবে ১০ দিন কেটে গেল। এখানটা শান্ত। বিশাল লেকে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো যায়। বানরগুলো শুধু নীরবতা ভাঙে। অচেনা পাখির ডাকও শোনা যায় দূর বা কাছ থেকে। সোনাবউ, রাতচরা, পেঁচারা এখানে ভালোই আছে। এই বনে শালের সঙ্গে কাক ডুমুর, অর্জুন, হরীতকী, শিমুল, পলাশ, বনচালতাও আছে অনেক। এখানে এসেই জানলাম, কচ্ছপগুলো যখন পাতা গোছান শুরু করে তখন বোঝা যায় তাদের ডিম পাড়ার সময় হয়েছে। সেটা মার্চ থেকে এপ্রিল।   ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে আসতে লাগে  চার থেকে পাঁচ মাস। সিসিএর উদ্যোগে বান্দরবানের বেশ কয়েকটি পাড়ায় স্থানীয় শিকারিদের বোঝানো হয়েছে কচ্ছপ সংরক্ষণের গুরুত্ব। তারপর তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কচ্ছপ উদ্ধার ও সংরক্ষণে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এদের বলা হচ্ছে প্যারাবায়োলজিস্ট। কোনো কোনো পাড়ায় স্কুলও চালায় সিসিএ।  সেখানেও ছাত্র-ছাত্রীদের বন আর বন্য প্রাণী সংরক্ষণে উৎসাহী করা হয়। প্রায় দেড় শ ছাত্র-ছাত্রী আছে ওই সব স্কুলে। এখানকার কোনো কচ্ছপের নাম বিগবয়, তো কোনোটির নাম দিলরুবা। ফুলবানু, গোলাপি, হেক্টরও আছে। প্রতি মাসে কচ্ছপের ওজন, উচ্চতা, স্বাস্থ্যের গঠন ইত্যাদি নথিবদ্ধ করা হয়। 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা