kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

[ হারিয়ে যাচ্ছে ]

গরিবের এসি

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গরিবের এসি

মাটির ঘর আগে সব গ্রামেই ছিল। অনেকে বলত, গরিবের এসি। এখন বলা ভালো, মাটির ঘর বিলুপ্তপ্রায়। তাহলে কেমন আছেন কারিগররা, জানতে গিয়েছিলেন এস এম শাহাদাত

১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে মাটির ঘরের চাহিদা কমে যায়। বন্যায় ধসে পড়েছিল অনেক ঘর। তাই কারিগরদের ডাক পড়েনি বেশি।

কেমন আছেন তাঁরা

গেল শতকের মাঝমাঝি থেকেই ভাটা শুরু। ইট-পাথরের দালান তৈরি হতে থাকে। দিনে দিনে আরো বাড়ে। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে মাটির ঘরের কারিগরদের হা-পিত্যেশ। এখন যেমন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের শতাধিক কারিগর কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। কারিগরদের কাছে জানা গেল, কম করেও ৩০০ বছরের মাটির ঘরের ইতিহাস। তার আগে ছনের বা তালপাতার ঘরে থাকত মানুষ। রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া, দাউদপুর, ভোলাব ও মুড়াপাড়ায় কারিগরদের বাস। নব্বইয়ের দশকের আগে ওই সব এলাকার বেশির ভাগ ঘরই ছিল মাটির।

কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বরুনার ঈমান আলী কারিগর। বয়স ৬৫ বছর। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। পরেন পাঞ্জাবি। বললেন, ‘চায়ের দোকানেই বেশি সময় যায়। এহন মাটির ঘরের কদর নাই। আগে মসজিদ, ঘর সবই বানাইত মাটি দিয়া। একটা ঘর বানাইতে এক মাস লাইগা যাইত। মাটির ঘরে গরমের সময় ঠাণ্ডা লাগত। অহন তো মানুষ পাকা বাড়ি বানাইয়া এসি লাগায়।’ ঈমান আলীর ওস্তাদ ছিল শহর আলী। খামারপাড়া গ্রামের ডা. আফতাবউদ্দিনের দোতলা মাটির ঘর বানিয়েছিলেন ২৭ হাজার টাকায়। দুই মাস সময় লেগেছিল। ঈমান আলী আরো বলেন, ‘অনেক কষ্টে আছি বাপ। পাঁচটা মাইয়া বিয়া দিছি, একটু জমি আছিল হেউডা বেইচ্যা। একটা পোলা। পোলায় অটো চালাইয়া যা কামায় কোনো মতন সংসার চলে।’

আরেক কারিগর আব্দুল হাই। বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই। বলেন, ‘মাইনসের বাসা বাইন্ধা দিলাম। আর অহন আমার থাহনের কষ্ট অয়। খাওয়ার কষ্ট অয়। কেউ খোঁজখবর লয় না।’

রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের জাঙ্গীর এলাকার সিরাজুল ইসলাম। বয়স ৭২ বয়স। দুই মেয়ে এক ছেলে। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকেও বিয়ে করিয়েছেন। ছেলের টিউশনির টাকায় চলে সংসার। সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জীবনে হাজার হাজার ঘর বানাইলাম। অহন আমার ঘরটাই ভাঙাচোরা। লগের (সাথে) মানুষরা কয়, মিয়া তুমি কত ঘর বানাইলা। আর তোমার থাকনের ঘরটা নড়বড়ে। তহন শরম লাগে। যহন ঘর বানাইছি, তহন যদি জানতাম জীবনডা এমুন অইব, তহন নিজের ঘরটা আগে ঠিক করতাম।’ 

সিরাজুল ইসলামের মতো একই রকম আছেন কারিগর রমিজউদ্দিন, লাল মিয়া, চাঁন মিয়া, অলিউল্লাহ। তাদেরও সংসারে অভাব। এখন অলস আর আড্ডা দিয়ে সময় কাটান।

মুড়াপাড়া ইউনিয়নের হাউলিপাড়া এলাকার কারিগর সুরুজ আলী বলেন, ‘কার্তিক মাস থেইক্যা চৈত্র মাস পর্যন্ত আছিল মাটির ঘর বানানোর সিজেন। এই সময় ধুম পড়ত ঘর বানানোর। আমাগো ছয় মাসের কাম আছিল। বাহি ছয় মাস বইস্যা বইস্যা খাইতাম।’ এখন কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। শিশুদের মতো কান্না করে বলেন, ‘বাজান, অনেক কষ্টে আছি। একটা পোলা। বিয়া কইরা অন্যহানে গেছেগা। আমরা বুড়া-বুড়ি কোনোমতে খাইয়া বাঁইচ্যা আছি। সরকার থেইক্যা ভাতা পাই, এইডা দিয়া চলি।’

দাউদপুর ইউনিয়নের আগলা এলাকার কারিগর নরেশ আলী। বয়স ৯০ ছুঁই ছুঁই। এখনো শক্তপোক্ত মানুষ। কথাও বলেন ঠাস ঠাস। বললেন, ‘আমাগো কি ভালা থাহার কতা? মাডির ঘর বানানের কাম ছাড়ছি ২০ বছর অইছে। এরপর থেইক্যা আর ভালা নাই। আগে কাম করছি, খাইছি। অহন কামও নাই, খাওনও নাই। গ্রামের পর গ্রাম ঘর বানাইছি।’

 

যেভাবে ঘর

প্রথমে লাল মাটি নিয়ে ছানা (দলা) করতে হয়। সঙ্গে মেশাতে হয় তুষ। এরপর এটা গর্তে রাখতে হয় এক সপ্তাহ। তারপর ঘরের লাইন টেনে লদ্দা (মাটির দলা) বসাতে হয়। একেকটি ছোট মাটির ঘর তৈরি করে নব্বই সালের আগে পাওয়া যেত চার হাজার টাকা। আর বড় দুই তলা ঘর বানিয়ে পাওয়া যেত ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা