kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

[ সুলুকসন্ধান ]

পীতজ্বর

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পীতজ্বর

শিল্পীর আঁকায় পীতজ্বরের কাল

আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় চালান হয় পীতজ্বর। ইউরোপীয়রা আফ্রিকানদের দাস করে নিয়ে এসেছিল আমেরিকায়। আমেরিকা থেকে ইয়েলো ফিভার ছড়ায় কমপক্ষে ২৭টি দেশে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে নাকি অসুখটির জন্ম আফ্রিকায়। লিখেছেন আল সানী

১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর। ক্রিস্টোফার কলম্বাস আবিষ্কার করলেন আমেরিকা। খবরটি দ্রুতই ছড়াল ইউরোপে। ঝাঁকে ঝাঁকে ইউরোপিয়ান যেতে শুরু করল আমেরিকায়। ইউরোপও তখন মহামারির দখলে। তার ওপর আবার খাবারের সংকট। সেখানে গিয়ে ইউরোপীয়রা দেখল, বেশ তো জমি উর্বর। ধান ফলে, আলু হয় মায় তুলা, রেশমও। তাই দেরি না করে তাড়াতে থাকল স্থানীয়দের; কিন্তু এত বড় জায়গা আবাদ করা কী মুখের কথা। তারা আফ্রিকার কথা ভাবল। সেখান থেকে লাখ লাখ মানুষকে দাস বানিয়ে নিয়ে গেল আমেরিকায়। এসব মানুষে সুবিধা অনেক। তাদের গায়ে অনেক শক্তি, আবার অনুগতও।  আফ্রিকা এমন জায়গা যেখানে বৃষ্টি হয় না, আবার প্রচণ্ড গরম। তাই মহামারিও হানা দেয় সুযোগ পেলেই।

ওদিকে  মায়ানরা (স্থানীয় আমেরিকান) হঠাৎ করেই জ্বরে ভুগতে থাকল। সেই সঙ্গে ক্ষুধামান্দ্য, মাংসপেশিতে ব্যথা আর ক্লান্তি। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না। ইতিহাস বলছে, বার্বাডোস দ্বীপে ১৬৪৭ সালে এবং গুয়েদালুপ দ্বীপে ১৬৪৮ সালে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে ওই জ্বর। আক্রান্তরা দেখতে হলদেটে। তাই নাম হলো পীতজ্বর বা ইয়েলো ফিভার। গোড়ায় শুধু আফ্রিকানরা মারা যাচ্ছিল বলে সাদা মানুষরা তেমন মাথা ঘামাচ্ছিল না। 

 

ফিলাডেলফিয়ায় জ্বর

ইউকাটান (এখনকার মেক্সিকোয়) থেকে ইয়েলো ফিভার উত্তর আমেরিকায় যায় ১৬৬৮ সালে। বোস্টনে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে ১৬৯১ সালে। এর কয়েক বছর পরই ছড়িয়ে পড়ে ফিলাডেলফিয়ায়। এটি তখনকার আমেরিকার বৃহত্তম শহর। মারা পড়ে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। পীতজ্বর ফ্রান্স আর ওয়েলসে দেখা দেয় উনিশ শতকের গোড়ায়। ছড়িয়ে পড়ে স্পেনেও। জিব্রাল্টার প্রণালী ধরে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ মারা পড়ে।  ওই সময় বিজ্ঞানী, গবেষক কেউই রোগটির কারণ জানতে পারছিলেন না। বুঝতে পারছিলেন না কিভাবে ছড়ায়। প্রথমে অনুমান করা হচ্ছিল আক্রান্ত ব্যক্তির জামা-কাপড় থেকে ছড়ায়। তাই পোশাক পোড়ানো উৎসব চলল; কিন্তু মহামারি থামল না। এর মধ্যে আমেরিকান গবেষক স্টাবিন্স ফার্থ (১৭৮৪-১৮২০) নিজের ওপরই পরীক্ষা চালানোর কথা ভাবলেন। তিনি আক্রান্ত ব্যক্তির বমি সংগ্রহ করে নিজের হাতের ক্ষতের ওপর লাগাতে থাকলেন। তিনি প্রস্রাব আর লালাও ব্যবহার করতে শুরু করেন; কিন্তু তিনি সুস্থ থাকলেন। তাতে অন্তত এটা প্রমাণ হলো যে অসুখটি লালা, প্রস্রাব বা বমি দিয়ে ছড়ায় না।

 

কিউবা জানল

কার্লোস ফিনলে কিউবার বিজ্ঞানী। প্রথম তিনিই ১৮৮১ সালে অনুমান করেন মশার কামড়ে ছড়ায় এই রোগ। তাই তিনি মশক নিধনের পরামর্শ দেন। তারপর বিজ্ঞানী হেসি লাজির কথা বলতে হয়। তিনি সন্দেহ করেছিলেন এডিস এজিপ্টি মশাকে। তিনি নিজে মশার কামড় খাওয়া শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর শরীরে পীতজ্বরের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। শেষে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৮৯০ সালের ঘটনা এটি। লাজির আবিষ্কারে ভর করেই ১৯০০ সালে আমেরিকান আর্মির ওয়াল্টার রিড নিশ্চিত হন মশাই এই জ্বরের বাহক। তাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া গিয়েছিল। তবে প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়েছিল অনেক পরে।  

 

একটি ডাচ জাহাজে চড়ে এসেছিল

পনেরো শতকে ডাচদের একটি জাহাজ নিয়ে এসেছিল ২০ জন আফ্রিকানকে দাস করে। সেটা ছিল দাস ব্যবসার শুরুর কাল। দাস ব্যবসা তার পর থেকে বিশাল এক লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়। বাজারে আফ্রিকানদেরই চাহিদা ছিল বেশি। কারণ তারা লম্বা হতো আর কর্মঠও। ইতিহাস বলছে, ১৬৮০ থেকে ১৭০০ সাল মাত্র ওই ২০ বছরে প্রায় দেড় লাখ আফ্রিকান নাগরিক দাসে পরিণত হয়। শেষে কি না আফ্রিকারই এক বিজ্ঞানী, নাম ম্যাক্স থেইলর, আবিষ্কার করেন পীতজ্বরের প্রতিষেধক। ম্যাক্স জন্মগ্রহণ করেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় ১৮৯৯ সালে। তাঁর বাবা ব্যাকটেরিওলজিস্ট ছিলেন। ম্যাক্স পড়াশোনা করেন কেমব্রিজে। তিনি সেখানে অ্যামিবিক আমাশয় ও ইঁদুরের কামড়ে হওয়া জ্বর নিয়ে গবেষণা করেন; সেই সঙ্গে পীতজ্বর নিয়েও।

 

ম্যাক্সের কথা

তিনি প্রথমে খুঁজে পান পীতজ্বর ব্যাকটেরিয়া নয়, ভাইরাসঘটিত এক অসুখ। ম্যাক্সের আগে ইঁদুরের ওপরই বেশি পরীক্ষা চালানো হতো। ম্যাক্স পরীক্ষা চালালেন বানরের ওপরও। ১৯৩০ সালে তিনি রকফেলার ফাউন্ডেশনে যোগ দেন। পুরোদমে ইয়েলো ফিভার নিয়ে কাজ করতে থাকেন। ১৯৩৭ সালে ম্যাক্স খেয়াল করলেন তাঁর বানানো প্রতিষেধক দিয়ে কিছু ইঁদুর সুস্থ হয়ে উঠছে। ১৯৩৮ সালে চালান হিউম্যান ট্রায়াল ব্রাজিলে। এতেও সাফল্য পান ম্যাক্স। শেষে ১৯৫১ সালে ম্যাক্স নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা