kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

ওমর, কিপ ইট আপ

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ওমর, কিপ ইট আপ

সিঙ্গাপুরপ্রবাসী শ্রমিক ওমর ফারুকী শিপন। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পেয়েছেন সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট পদক। দেশটির প্রেসিডেন্ট হালিমা ইয়াকুব তাঁকে বলেছেন, ওমর, কিপ ইট আপ। পিন্টু রঞ্জন অর্ক শুনেছেন পুরো গল্প

আমার জন্ম চাঁদপুরের মতলবে। সাত ভাই-বোনের মধ্যে আমি চতুর্থ। বাবা বর্গাচাষি। অন্যের জমিতে কামলা খেটেছি, মাটিও কেটেছি। বাবা বলতেন, ‘পড়াশোনার খরচ দেওয়া সম্ভব না, গার্মেন্টে চলে যা।’ বড় ভাই নারায়ণগঞ্জের একটি হোসিয়ারিতে কাজ করতেন। এসএসসির পর ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জে চলে আসি। লজিং থাকতাম। টিউশনিও করতাম। এভাবে এইচএসসি পাসের পর সরকারি তোলারাম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হই। পাশাপাশি একটি স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করতাম। ২০০৯ সালে অনার্স পাস করলাম। এরপর বিভিন্ন জায়গায় চাকরির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।

 

সিঙ্গাপুরগামী বিমানে

২০০৬ সালে বড় ভাই সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। এরই মধ্যে মা ব্রেইন স্ট্রোকে কোমায় চলে যান। মাকে দেখতে দেশে ফেরেন তিনি। সে সময় সিঙ্গাপুর থেকে আলপাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানির প্রতিনিধিরা এসেছিলেন ঢাকায়। ২০০৯ সালের নভেম্বরে ইন্টারভিউ দিলাম। ডিসেম্বরের ২৯ তারিখে সিঙ্গাপুরগামী বিমানে চড়লাম।

 

বেতন ১৬ ডলার

‘মেরিন ট্রেড ওয়ার্কার’ হিসেবে সিঙ্গাপুর আসি। মানে কম্পানি চাইলে আমাকে দিয়ে যেকোনো কাজ করাতে পারত; কিন্তু তারা আমার পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট ছিল। কিছুদিন পর আমাকে ফায়ার সেফটি ডিপার্টমেন্টে নিয়োগ দিল। মানে বাংলাদেশের ফায়ার ফাইটারদের মতো আমার কাজ। আলপাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানিতে বছর দুয়েকের মতো ছিলাম। দৈনিক ১৬ ডলার করে পেতাম।

 

মন মানত না

প্রথম দিকে মন মানত না কিছুতেই। মা হাসপাতালে, আমি দূর দেশে। হাড়ভাঙা খাটুনি। কষ্ট সীমাহীন। লোকজন বলত, ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। আমার কম্পানিতে বাংলাদেশি এক বড় ভাই ছিলেন। বললেন, এখানে কিছু কোর্স করে সার্টিফিকেটগুলো জমা দিলে ভালো বেতন মিলবে। এরপর হেলথ, সেফটি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর কিছু কোর্স করি। কোর্সগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর কিপাল শিপইয়ার্ড লিমিটেডে যোগ দিলাম। আগে ছিলাম সেফটি কো-অর্ডিনেটর। এখন সিনিয়র সেফটি কো-অর্ডিনেটর। এখন কম্পানিতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নতুন শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিই আমি।

 

ধার করে বই পড়তাম

সিঙ্গাপুরে আসার বছর দুয়েকের মাথায় লেখালেখি শুরু করি। প্রচুর বই পড়তাম। অফিসে সুমন কৃষ্ণ দে নামের এক বাংলাদেশি অফিসার ছিলেন। তিনিও বই দিতেন। দেশ থেকে আমরা একসঙ্গে ৪৫ জন এসেছিলাম। আসার সময় একেকজন ১৫-২০টি করে বই নিয়ে এসেছিল। তাদের কাছ থেকে বই নিয়ে পড়তাম।

 

আমাদের কথা কেউ লেখে না

একদিন প্রবাসীদের দুঃখগাথা ফেসবুকে পোস্ট দিলাম। দেখে সুমন ভাই বললেন, ‘আপনার লেখার হাত তো ভালো।  চালিয়ে যান।’ এরই মধ্যে একদিন হার্ট অ্যাটাকে এক বন্ধু মারা যায়। ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। তাকে নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিলাম। হাজারের বেশি শেয়ার হলো লেখাটি।  প্রবাসীদের অনেকেই বললেন, ‘ভাই, আমাদের কথা কেউ লেখে না। আপনি লিখুন।’ তখন থেকে প্রবাসীদের সঙ্গে গল্প শুরু করলাম। একেক দিন একেকজনের কাহিনি ফেসবুকে তুলে ধরতাম। ২০১৫ সালে ফেসবুকে একটা পেজ খুললাম—‘সিঙ্গাপুরে আমরা প্রবাসী বাংলাদেশি’। এখন পেজটির ফলোয়ার অর্ধলাখেরও বেশি। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকও আমার লেখা প্রকাশ করল। এরই মধ্যে প্রবাসীদের নিয়ে ৫০টির মতো গল্প লিখেছি। সেখান থেকে ২০টি গল্প নিয়ে ‘মাইগ্র্যান্ট লাইফ : স্টোরিজ অব রিভারিস্ট’ নামে ২০১৯ সালে একটি বই প্রকাশিত হয় বাবুই প্রকাশনী থেকে। কয়েক দিন আগে বইটি সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে তালিকাভুক্ত হয়। অ্যামাজন ডটকমেও বইটি পাওয়া যাচ্ছে।

 

করোনা এলো

করোনার শুরুতে এখানকার প্রবাসীরা আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। ফেসবুক-ইউটিউবে নানা গুজব প্রবাসীদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। করোনায় অনেক বাংলাদেশি মারা গেছে, সিঙ্গাপুর সরকার লাশ গুম করেছে—এমন গুজবও ছড়িয়েছিল। দেশে চলে যেতে চাইছিলেন বহু শ্রমিক। কেউ কেউ বললেন, ‘ভাই, এখানে মরলে লাশও তো পাঠাবে না, দেশে গিয়ে মরলেও ভালো ইত্যাদি।’ ভাবলাম, এখনই কিছু করা উচিত। ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে করোনাভাইরাস নিয়ে লেখালেখি আরম্ভ করলাম। সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের গুরুত্বপূর্ণ নিউজ অনুবাদ করে পেজে শেয়ার করতাম। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি মন্ত্রণালয় ওয়েবসাইটে যে তথ্য বা নিউজ প্রকাশ করত, সেগুলো বাংলা করে ফেসবুক পেজে দিতাম। যারা পড়তে পারত না, তাদের জন্য ছোট ছোট ভিডিও বানিয়ে আপলোড দিয়েছিলাম। সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. মুনতাসিরের সহযোগিতায় চিকিৎসকদের নিয়ে ফেসবুকে পাঁচটি লাইভ শো করেছিলাম। সেখানে প্রখ্যাত সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডেইল ফিশার, ডা. গোয় ওয়েই লিয়ং, ডা. তাম ওয়া ঝিয়া, ডা. যুবায়ের আমীন প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন। ঘরবন্দি সময়ে প্রবাসীদের বিনোদন দিতে সংগীত প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেছিলাম। ফাইনালে বিচারক ছিলেন শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ।

 

আমিই তখন শিরোনামে

আমাদের এসব কর্মকাণ্ড গণমাধ্যমের নজর এড়ায়নি। ‘শ্রমিকের ফেসবুকে ৫১ হাজারের বেশি ফলোয়ার’ শিরোনামে সিঙ্গাপুরের জাতীয় দৈনিক দ্য স্ট্রেইটস টাইমস নিউজ করে জুনে। সেটি ভাইরাল হয়। হোয়াট আর ইউ ডুয়িং নামে সিঙ্গাপুরের একটি অনলাইন শিরোনাম করেছে ‘দি ইনফরমেশন অ্যাম্বাসাডর ফর বাংলাদেশি মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারস’। তখন সিঙ্গাপুরের পুলিশ ও জনশক্তি মন্ত্রণালয় মনিটর করে—আমি কী লিখছি। তারা দেখল—না, সরকারবিরোধী কিছু নয়, সঠিক তথ্যই তুলে ধরছি। এরপর জনশক্তি মন্ত্রণালয় থেকে ফোন আসে। সেখানকার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ওমর, ইউ ডুয়িং এ গ্রেট জব।’ পরে সিঙ্গাপুর পুলিশ এবং বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকেও কল আসে। তারাও সাধুবাদ জানিয়ে বলে, ‘কোনো প্রবাসী বিপদগ্রস্ত হলে জানাবেন। আমরা পাশে আছি।’

 

কাজটা সহজ হয়ে গেল

এরপর আমার কাজটা সহজ হয়ে গেল। তখন প্রবাসী শ্রমিকদের কেউ ঝামেলায় পড়লে সরাসরি জনশক্তি মন্ত্রণালয়ে ফোন করতাম। সমাধান হয়ে যেত। সিঙ্গাপুরে দুই ধরনের ডরমিটরি আছে। একটা শ্রমিকদের থাকার উদ্দেশে নির্মিত ডরমিটরি। এগুলোতে সরকারি প্রায় সব সুযোগ-সুবিধা মিলত। আরেকটি ফ্যাক্টরিসংলগ্ন ডরমিটরি। খাবার থেকে শুরু করে অন্যান্য সংকট ছিল মূলত এগুলোতে। লকডাউনে অনেক প্রবাসীর খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছিল। কারণ সবাই তখন ডরমিটরিতে বন্দি। অনেকের শুকনো খাবারও ফুরিয়ে গিয়েছিল। এসব বিষয়ে হাইকমিশনকে অবহিত করি। তারা প্যাকেটভর্তি খাবার জায়গায় জায়গায় পাঠিয়ে দিত। অনেক এনজিওকেও খাদ্যসংকটে থাকা শ্রমিকদের তালিকা দিয়েছি। তারাও খাবার পৌঁছে দিত।

 

কোথাও ভুল হচ্ছে!

গত মাসে সিঙ্গাপুর প্রেসিডেন্ট অফিস থেকে ফোন আসে। একজন কর্মকর্তা জানালেন, প্রেসিডেন্টস ভলান্টিয়ারিজম অ্যান্ড ফিলানথ্রপি অ্যাওয়ার্ডের জন্য তুমি মনোনীত হয়েছ। ই-মেইলে ফরমটা পূরণ করে দাও। গুগল থেকে জানলাম, এই অ্যাওয়ার্ড শুধু সিঙ্গাপুরিয়ানদের জন্য। বললাম, ‘আপনার বোধ হয় ভুল হচ্ছে। আমি তো প্রবাসী শ্রমিক।’ যাহোক, কিছুদিন পর ফিরতি মেইল এলো। তাতে লেখা, ‘কংগ্র্যাচুলেশনস। পিপল অব গুড ক্যাটাগরিতে তুমি নির্বাচিত হয়েছ।’

 

আমি তাকে চিনি

১৬ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট হালিমা ইয়াকুব আমাদের হাতে অ্যাওয়ার্ড তুলে দেন। এর আগে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে তাঁর সেক্রেটারি বললেন, ‘উনি ওমর ফারুকী শিপন। প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘আই নো হিম। ওমর, কিপ ইট আপ।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা