kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

[ বাঙালির বিশ্বদর্শন ]

রূপের কুণ্ড

হোমায়েদ ইসহাক মুন   

২০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রূপের কুণ্ড

ভোলে বাবা মহাদেব যাচ্ছেন পার্বতীকে বিয়ে করতে। সাঙ্গোপাঙ্গ বলল, শুভ কাজে যাচ্ছেন, সুরতটা একটু ঠিকঠাক করে যান। ভোলানাথ ভাবলেন, খাঁটি কথা। তিনি ত্রিশূল দিয়ে পাহাড়ের অনেক উঁচুতে একটি কুণ্ড তৈরি করলেন। তার স্বচ্ছ জলে নিজের রূপটা ভালো করে দেখে নিলেন। এদিক-ওদিক একটু কাটছাঁট করে সন্তুষ্টচিত্তে যাত্রা করলেন। সেই থেকে কুণ্ডের নাম রূপকুণ্ড। ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামলি জেলায় এই কুণ্ড। এটি প্রায় ১৬ হাজার ৪৯৯ ফুট ওপরে। ট্রেকিং শুরু হয় লোহাজং থেকে। তারও আট কিলোমিটার আগে গোয়ালধাম। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ওই পর্যন্তই। কলকাতা থেকে হরিদ্বার গিয়ে গোয়ালধামের বাস খুঁজলাম। রাত ৩টায় বাস ছাড়বে। ভাড়া ৩৮০ রুপি। সমস্যা হলো তখন মোটে সন্ধ্যা। অগত্যা দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে গেলাম হরকিপায়ুরি ঘাটে। গঙ্গা এখানে খরস্রোতা। অনেক মানুষ ঘাটে। সারা রাতই এখানে পুণ্যার্থীরা থাকেন। বেশ রাত করেই বাসের কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি সব সিট ভর্তি হয়ে গেছে। কন্ডাক্টরকে ডেকে এনে টিকিট দেখিয়ে তবে নিজের সিটের দখল পেলাম। পরদিন দুপুরে নামলাম গোয়ালধামে।

ভেজ থালি আর দুটি ডিমের অমলেট খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিলাম। তারপর হাঁটা দিলাম। আজ দেবালে থাকব। ১০ কিলোমিটার পথ। মানুষজন নেই বললেই চলে। উঁচু-নিচু, নীরব পথটা একাই পাড়ি দিলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা। সঙ্গে তাঁবু ছিল। তাই সমতল জায়গা খুঁজছিলাম। স্থানীয় একজনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি ফরেস্ট বাংলোর পথ দেখিয়ে দিলেন। খুব সুনসান। চৌকিদারও নেই বাংলোয়। গেটে বড় তালা। আমি উপায় না পেয়ে তাঁবু গেড়ে ফেললাম। একটু ভূতুড়ে লাগছে; কিন্তু অপূর্ব নিরিবিলি। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে বাজারের দিকে হাঁটলাম। সোয়া কিলোমিটার পথ। লোহাজংয়ের গাড়ির খবর নেব। ইয়াশওয়ান নামের একজন ড্রাইভারকে পেলাম। সে ভোর ৫টায় ফিরতি ট্রেকারদের আনতে যাবে। তারপর একটা হোটেলে ঢুকে চাওমিন খেয়ে নিলাম। বাজারে আর সময় পার না করে তাঁবুতে ফিরলাম। ঘুমিয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি। তবে মধ্যরাতে বৃষ্টি এলো। তাঁবুর দরজা দিয়ে বৃষ্টি ঢুকেও পড়ল।

 

আকেলা আয়া?

ইয়াশওয়ান চলে এলো কাটায় কাটায়। লোহাজং পৌঁছে গেলাম ৭টাতেই। ভাড়া দিলাম ৫০ রুপি। বলবীর সিংয়ের রেস্তোরাঁয় নাশতা সারলাম। বাড়তি জিনিসপত্র রেখে গেলাম সিংজির দোকানে। ফেরার পথে নিয়ে যাব। ৮টা নাগাদ লোহাজং থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আজ ওয়ান ভিলেজ হয়ে গেরলিপাতাল গিয়ে থামব। পথে যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, জানতে চাইছে, আকেলা আয়া? হ্যাঁ, বলার পর যখন বলি ঢাকা থেকে। তখন আরো অবাক হয়। বড় বড় গাছ আর ছোট ছোট লোকালয় পার হয়ে ওপরে উঠছি। মাঝেমধ্যে পানি আর এনার্জি বার খাই। দারুণ সুন্দর পথ। ওয়ান ভিলেজ পার হওয়ার পরই জঙ্গল শুরু হয়ে যায়। নদীও পেলাম। কালীগঙ্গা নাম।   অনেক দূরে কয়েকজন ট্রেকার দেখলাম। অনেক পাখি আর বৃক্ষে পরিপূর্ণ এই বন। শুধু উঠছি আর উঠছি। গাছের গুঁড়ি আর পাথর বাঁধানো আঁকাবাঁকা রাস্তায় উঠছি আর উঠছি। কখনো কখনো কুয়াশা এসে ঢেকে দিচ্ছে চারধার। আবার সব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। সাপের চূড়ার মতো পেঁচানো এই পথ। বিচিত্র সব পোকার ডাকে মুখর। ট্রেকিং স্টিক ঠুকে ঠুকে এক পা-দুই পা করে এগিয়ে যাচ্ছি। আরো খানিক গিয়ে টেম্পোরারি একটা ধাবা পেলাম। নুডলস, পানি, জুস পাওয়া গেল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে আবার রওনা হলাম। ৩টায় পৌঁছলাম গেরলিপাতাল। এখানকার ধাবাটায় বসতে না বসতেই বৃষ্টি নামল। মুষলধারে বৃষ্টি।

 

আহা বেদনি বুগিয়াল

এর মধ্যে পথে দেখা হওয়া ক্রেজি পিকসের পাঁচু বলল, বেদনি বুগিয়াল বেশি দূরে না। ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। সেখানে তাদের টেন্ট পিচ করা আছে। চাইলে আমিও তাদের সঙ্গে থাকতে পারি। হারিস, মমতা, ধাবান আর পূজা এসেছে ক্রেজি পিকসের সঙ্গে। তারা সবাই মুম্বাইয়ে চাকরি করে। বৃষ্টি মাথায় করেই হাঁটতে হাঁটতে আমরা ‘বেদনি বুগিয়াল’ চলে এলাম। সন্ধ্যা লাগবে অল্প পরেই। ফ্রেশ হয়ে চা পেলাম। এখানে আরো ট্রেকারের সঙ্গে পরিচয় হলো।  পাহাড়ের মধ্যখানে বিশাল জায়গাজুড়ে ফাঁকা এক মাঠ। অনেক তাঁবু পড়েছে মাঠে। গোধূলিবেলায় সোনা ঝরছে মনে হলো। হিমহিম হাওয়ায় চায়ের কাপ হাতে আমি পৃথিবীর ওপরে তখন।

রাতের জন্য খিচুড়ি রাঁধতে চাইলাম। ১২ হাজার ফুট উঁচুতে রান্না করা সোজা নয়। পাঁচুর বন্ধু প্রকাশ স্টোভ দিল। তবে চাল ভালো ফুটল না। আধাসিদ্ধ খিচুড়ি গিলেই শুয়ে পড়লাম। সকালেও আবার সেই খিচুড়ি। আজকের গন্তব্য বেইজ ক্যাম্প বাগুয়াবাসা। পাঁচু বুদ্ধি দিল, অনেকটা চড়াই সামনে, ব্যাকপ্যাক গাধার পিঠে দিয়ে দাও। সেমতো ৩০০ রুপি গুনে গাধার মালিকের জিম্মায় ব্যাগ দিয়ে দিলাম। বাগুয়াবাসা পৌঁছলাম ভালোভাবেই। তবে বেদনি বুগিয়ালের পর বড় গাছ পাইনি। এত উচ্চতায় থাকার কথাও নয়। বাগুয়াবাসা পাথর দিয়ে ঢাকা এক প্রান্তর। ক্যাম্প থেকে একটু ডানে তাকালে পর্বত ত্রিশূল (সাত হাজার ১২০ মিটার) এবং নন্দাঘুণ্টি (ছয় হাজার ৩০৯ মিটার)। প্রকাশ এসে পরদিনের পথ সম্পর্কে জানাল আর কাঁটাওয়ালা জুতা পরার কৌশল দেখাল। এখন এই উঁচুতে গোলাবজামুন আর সনপাপড়িটা কাজে লাগছে।

 

মিশন রূপকুণ্ড

রাত ৩টার সময় বের হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টি। আগেভাগে রওনা না দিতে পারলে সূর্যের তাপে বরফ গলতে শুরু করবে এবং আবহাওয়া খারাপ হতে থাকবে। এতে নেমে আসাটা কষ্টকর হবে। ৪টা নাগাদ বৃষ্টি ধরে এলো। কর্নফ্লেক্স আর স্যুপ খেয়ে সবাই লাইন ধরে হাঁটা দিলাম।

এখানে বরফ বেশি শক্ত নয়। অনেকটা পেঁজা তুলার মতো। তাই মাইক্রো স্পাইকসেই কাজ হয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু বরফগলা ঝিরি পেরিয়ে ওপরের দিকে উঠছি। ঠাণ্ডা, উচ্চতা আর অক্সিজেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তবে শেষমেশ যখন রূপের কুণ্ডের সামনে দাঁড়ালাম—সব কষ্ট উবে গেল। লেকটা পুরো বরফে ঢাকা। আমরা ১৬ হাজার ৪৯৯ ফুট উঁচুতে। একে স্কেলিটন লেকও বলে। কারণ এখানে মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে ১৯৪২ সালে। বরফ গলে গেলে নির্দিষ্ট জায়গায় সাজিয়ে রাখা কঙ্কাল আর খুলি দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এগুলো নবম শতকের মানুষের কঙ্কাল। আধঘণ্টার মতো থাকলাম কুণ্ডে। উচ্চতার কারণে মাথায় ব্যথা হচ্ছিল। নেমে যাওয়াটাই সমাধান। ওদিকে আবহাওয়াও খারাপ হতে শুরু করেছে।      ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা