kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

বইগুলোও বুঝি কাঁদে!

দীনেশ রাউতের মেয়ে রুখিয়া। রংপুরের খোর্দবাগবাড় মিশনপাড়ার গরিব মানুষ দীনেশ। তাঁর আশা-ভরসা ছিল ওই রুখিয়াই। কিন্তু মেয়েটা বেশি দিন বাঁচতে পারল না। এখন তার পড়ার টেবিল আঁকড়ে কাঁদেন দীনেশ ও তাঁর স্ত্রী। সীমান্ত সাথী গিয়েছিলেন দেখতে

২০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বইগুলোও বুঝি কাঁদে!

রুখিয়ার পড়ার টেবিলের সামনে তার মা সুমতি

প্রদীপ বলেই জানত মিশনপল্লীর লোক রুখিয়াকে। গরিব সাঁওতাল মেয়ে। শহরে লেখাপড়া করে। ভাবত, একদিন সে জ্বলবেই। আচার-ব্যবহারও ভালো ছিল রুখিয়ার। টিনশেড বাড়িতে দুটি মাত্র ঘর। ঘরে জানালাও নেই। দিনের আলো ঢোকার পথ পায় না। উত্তর দুয়ারি ঘরটায় থাকত রুখিয়া। ঘরের ভেতর একটি টেবিল, একটি আলনা, দুটি কাঠের বাক্স আর একটি চৌকি। মাটির ভিটি।

 

টেবিলটা যেমন

ঘরের ভেতর ফাঁকা জায়গা তেমন একটা নেই। টেবিলটা সাধারণ কাঠের। ওপরে একটা চাদর বিছানো। টেবিলের নিচে কাঠের তাকের ওপর একটি পানির বোতল, একটি ফুটবল আর একটি টিনের ডিব্বা। এটাতে বুঝি মুড়ি রাখত রুখিয়া! টেবিলের ওপর রুখিয়ার বইপত্র—বাংলাদেশের অর্থনীতি, ইতিহাস, গণিত, বাংলা ও ইংরেজি অভিধান, ডায়েরি ইত্যাদি। বইয়ের ওপর মা মেরির ছোট্ট প্রতিমা। আছে খাতা-কলমও। শেকসপিয়ারের শ্রেষ্ঠ রচনাসমগ্রও আছে। আছে গীতাবলী ও মঙ্গলবার্তা বাইবেলসহ কিছু ধর্মপুস্তক। ডায়েরির পাতায়ই রুখিয়া লিখে গিয়েছিল তার মৃত্যুর কারণ।

 

মিশনপাড়া

রংপুরের বদরগঞ্জ পৌর শহর থেকে পার্বতীপুর সড়কের দক্ষিণ বরাবর গেলে টেকসেরহাট। সেখান থেকে আরো দক্ষিণে রুখিয়াদের বাড়ি। রংপুর-পার্বতীপুর রেলপথ পেরোতে হয়। দিগন্তজোড়া আমনের মাঠ পেরিয়ে তবেই মিশনপাড়া। এই পাড়ার বেশির ভাগ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। তারা আসলে কৃষি শ্রমিক। তবে তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা সাপ ধরা। মোট ৯৫টি সাঁওতাল পরিবারে মানুষ প্রায় ৪০০। সাপ ধরার গ্রাম বলেও জানে অনেকে। এখানকার বেশির ভাগ মানুষই কষ্টে দিন চালায়। দারিদ্র্য যেন এ গাঁয়ের সব ঘরের অনাহূত অতিথি। গ্রামে ঢুকতেই মানুষের চোখে-মুখে দেখলাম দুঃখ-রাগ-অভিমান। জানলাম, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এখানে। দীনেশ রাউতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আগেই, আর বাড়িতে গিয়ে রুখিয়ার মা সুমতির সঙ্গে দেখা হলো। মেয়ে হারানোর যন্ত্রণায় বোবা হয়ে গেছেন। মেয়ের ছবি বুকে নিয়ে ঘোরেন। রুখিয়ার টেবিলে কাটে তাঁর বিনিদ্র রজনী। কিছুতেই মানতে পারছেন না মেয়ের এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। উল্লেখ্য, গত ৫ অক্টোবর প্রতারক আনিছুলের হাতে নিহত হয় রুখিয়া।

 

রুখিয়া ব্যতিক্রম

রুখিয়া ছিল ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। মিশনপাড়ার ছেলে-মেয়েরা প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডিই পেরোতে পারে না। অনেকের তার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। ব্যতিক্রম ছিল রুখিয়া। কাছের খোলাহাটি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে রংপুর কারমাইকেল কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু রুখিয়া বাঁচতে পারল না। বইপুস্তক টেবিলজুড়ে সাজানো-গোছানো। রুখিয়ার ঘরটা রাস্তার ধারে। টেবিলটা পূর্ব কোণে। রুখিয়ার মা কাঠের বাক্স দুটি খুলে দেখালেন, তাতে আরো কিছু বই। টেবিলের নিচের বলটা ছোট ভাইয়ের। টিউশনির টাকায় কিনে দিয়েছিল। আলনাটাও কিনেছিল টিউশনির টাকায়। বইয়ের পাতায় হাত বোলাতে থাকেন সুমতি। চৌকির ওপর টাঙানো মশারিও খোলা হয়নি। সেমতোই আছে রুখিয়ার বালিশ-কাঁথা। সুমতি কান্না থামাতে পারেন না।

 

গোলাপগাছটিও আছে

সেটা ছিল রবিবার। মিশনপাড়ায় ছুটির দিন। তখন বিকেল প্রায়। মলিন ছিল বিকেলটা। রুখিয়াদের ঝুপড়ি বাড়ির আঙিনায় তাজমহল নামের গোলাপগাছ দেখেছিলাম। সুমতি বললেন, ‘রুখিয়া নিজের হাতে এই গাছ লাগিয়েছে। ফুলও ফুটেছে। আঙিনার শোভা বাড়িয়েছে। ওই পেয়ারা আর পিচফলের গাছও রুখিয়া নিজের হাতে লাগিয়েছে।’ পেয়ারাগাছের নিচে মাটির চুলায় হাত বোলাতে লাগলেন সুমতি। মায়ের যেন কষ্ট কম হয় তা ভেবে রুখিয়া বানিয়েছিল চুলাটি। সুমতি আবার কাঁদতে থাকলেন।

স্বপ্নের মৃত্যু

সবার বড় রুখিয়া। ছোট বোনটির বিয়ে দিতে হয়েছিল আগেই। ছোট ভাই মিঠুনও প্রাইমারির চৌকাঠ ডিঙাতে পারেনি। বাবা দীনেশ রাউত মাঝেমধ্যে বিষধর সাপ ধরেন। তাতে কিছু রোজগার হয়। মা সুমতি ডাক পড়লে মজুরি দিতে যান। এর মধ্যেই রুখিয়া পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। কারণ তার পড়াশোনায় আগ্রহ ছিল, টিউশনের টাকা আর হাতের কাজ করে রোজগারও করত। দীনেশ-সুমতি ভাবতেন, একদিন বড় চাকরি পাবে রুখিয়া। ভাঙা ঘর ঠিক হবে। কিন্তু রুখিয়াকে বাঁচতে দিল না আনিছুল। রুখিয়াকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করেছে সে। সরল বিশ্বাসের মূল্য দিতে হলো মিশনপাড়াকে।

 

বাঁশবাগানের ছায়ায়

মিশনপল্লীর গির্জার পেছনে কয়েক শ গজ পথ গেলেই বাঁশবাগান। রুখিয়া সেখানে শুয়ে আছে। প্রতিদিনই স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউ না কেউ এসে চোখের জল ফেলে যায়। আজ রবিবার বিকেলে প্রার্থনা সেরে রুখিয়ার সমাধিতে এসেছেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও সমাজ উন্নয়ন সমিতির নেতা বিমল টুডু, ধীরেন ঋষি, মানিক সরেন, বিজয় উরাও প্রমুখ।

 

বড় মনের মানুষ

মিশনপল্লীর চার্চের বারান্দায় দেখা হয় বৃদ্ধ রাজদেব রাউতের সঙ্গে। বললেন, ‘এই গ্রামে সবাই ওকে (রুখিয়াকে) দাম দিত (মূল্যায়ন করত)। কেউ অসম্মান করত না। ও ছিল আমাদের চোখের আলো। মেয়েটা ছিল লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী। ছোটদের বলত, আমার মতো লেখাপড়া করিস। ও ছিল বড় মনের মানুষ।’ বৃদ্ধা মালতি রাউতেরও দেখা পেলাম। সম্পর্কে রুখিয়ার নানি। তিনি বললেন, ‘কলেজ থেকে এসেই আমাদের খোঁজখবর নিত। কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত না। ও ছিল আমাদের গর্বের ধন।’

 

তার যত পুরস্কার

সুমতি বলেন, ‘পুরস্কার হিসেবে ক্রেস্ট, থালা-বাসন, জগ, বাটি পেয়েছে রুখিয়া। স্কুলে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে পেয়েছে মানপত্র।’ ছোট ভাই মিঠুন বলল, দিদি যেখানেই যেত সেখান থেকে কোনো না কোনো পুরস্কার নিয়ে আসত। ও ছিল আমাদের ভরসা। সেই আলোটা নিভে গেল। দিদি আমাকে বলত, তোরা ভাবিস না। একদিন লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নেব। তোদের চিন্তা করতে হবে না। দিদি বলত, ‘এখন বিয়ে করব না। যদি পুলিশে চাকরি পাই, তাহলে আর কষ্ট থাকবে না।’

 

রুখিয়ার ডায়েরির পাতা

৫ অক্টোবর সোমবার। দুপুরবেলা মায়ের সঙ্গে রুখিয়ার শেষ কথা হয়। বলে, রংপুরে বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। চিন্তা করিস না। কাল ফিরব। ওই দিনই সে ডায়েরিতে লিখে গিয়েছিল, ‘আজ ৫-১০-২০২০ আমাকে আনিসুল দূরে কোথাও ডেকেছে। যেখানে ও নিজের হাতে আমাকে হত্যা করবে। এ কথা ও নিজে বলেছে যে ও আমাকে নিজের হাতে হত্যা করবে। আমার সব কিছুর জন্য আনিসুল দায়ী।’ রুখিয়ার পড়ার টেবিল থেকেই উদ্ধার করা হয় ডায়েরিটি। এতে রুখিয়া আরো লিখে গেছে, ‘প্রতিবেশী আনিসুল আমার সঙ্গে রিলেশন করতে চায়। কুপ্রস্তাব দেয়। রাজি না হলে আমাকে হত্যার হুমকি দেয়। একপর্যায়ে আমার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক করে। পরে প্রতারণা করল সে। আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে। একসময় আমার জীবনটাই অতিষ্ঠ করে তুলল আনিসুল। আমার জীবনটাই নষ্ট করে দিয়েছে। শেষে রুখিয়া লেখে, ‘ও আমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে কাঁদিয়েছে।’

 

রুখিয়ার মরদেহ পাওয়া গেল

নিখোঁজের পরের দিন ৬ অক্টোবর ভোরবেলা। বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের ঘুনুরঘাট এলাকার পাশেই আঞ্চলিক মহাসড়ক। পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের পাঁচপুকুরিয়ার শালবাগান থেকে অজ্ঞাত হিসেবে রুখিয়ার লাশ উদ্ধার হয়। উদ্ধারের সময় তারই ওড়না দিয়ে রুখিয়ার হাত-পা গলার সঙ্গে বাঁধা ছিল। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত ছিল মুখ। পরে মধ্যপাড়া পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায় লাশ। ওই দিনই পরিচয় নিশ্চিত হতে দিনাজপুর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি তদন্তদল মাঠে নামে। মৃতের হাতের আঙুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র মিলিয়ে ঠিকানা নিশ্চিত হয়। জানা যায়, মেয়েটির নাম রুখিয়া। সাঁওতাল মেয়ে সে। পরিবারের ভরসাস্থল ছিল। স্বপ্নটা নিভে গেল।

ছবি: লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা