kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ কার্তিক ১৪২৭। ২৯ অক্টোবর ২০২০। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

[ খাদ্য চক্কর ]

আলু যেভাবে বদলে দিল পৃথিবী

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আলু যেভাবে বদলে দিল পৃথিবী

ভ্যান গঘ ১৮৮৫ সালে নেদারল্যান্ডের নুনেনে এঁকেছিলেন পটেটো ইটারস

ধান, গম আর যবের পরই আলুর অবস্থান। পৃথিবীর একটি প্রধান খাদ্য আলু। ইউরোপে এসেছিল মধ্য ১৫ শতকে। তার পরই জিতে নিল বিশ্ব। লিখেছেন আবু সালেহ শফিক

আট হাজার বছর আগের কথা। আন্দেজ পর্বতের ধারেকাছের লোক আলুকে ঘরের শস্য করে তুলেছিল। তার পর অনেক অনেক বছর চলে যায়। ইনকা সভ্যতা ধ্বংস হয় ইউরোপীয়দের রোগব্যাধি আর হামলা-মামলায়। আমেরিকা তখন ইউরোপীয়দের কাছে নতুন পৃথিবী। সেখান থেকে একটা নতুন শস্য নিয়ে এসে রোপণ করা হয় মধ্য ইউরোপের দেশ স্পেনে। শস্যটিকে অনেক ঝড়-ঝাপটা সইতে হচ্ছিল। পারছিল না স্পেনের আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে। গ্রীষ্মে সেখানে দিন অনেক বড় এবং গরমও কম নয়। তাই শস্যটির ফলন ভালো হচ্ছিল না। ১৫৮০ সালে স্পেন থেকে আয়ারল্যান্ডে পৌঁছে শস্যটি।  আয়ারল্যান্ডে শস্যটি ভালোই মানিয়ে নিল। সেখানে ঠাণ্ডা আবহাওয়া শরৎকাল পর্যন্ত বরফমুক্ত থাকে। তারপর অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, জার্মানি, পর্তুগাল যেতে যেতে ১৬ শতক চলে আসে। শস্যটিকে আমরা আলু নামে চিনি। শুরুতে ইউরোপীয়রা আলুকে সহজভাবে নেয়নি। সন্দেহ আর ভয় কাজ করেছে। গবাদি পশুকেই বেশি খাওয়াত, নিজেরা শুধু ঠেকায় পড়লে খেত। অনেকে ভাবত ডাইনি বা শয়তানের তরফ থেকে এসেছে এ শস্য। শেষে ১৬৬২ সালে ব্রিটিশ রয়াল সোসাইটি আলু চাষে উৎসাহ দেওয়া শুরু করে। তবে তাতে ফল খুব বেশি ভালো হয় না, অন্তত তত দিন পর্যন্ত যত দিন না যুদ্ধ বাধে; বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৭৪০ থেকে ১৭৪৮ সাল। ইউরোপের ছোট-বড় প্রায় সব দেশ এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল) আর ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যকার সেভেন ইয়ারস ওয়ার (১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ সাল) আলু জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখে।

 

সফল অভিবাসী

খাবারের ইতিহাস লেখিকা রেবেকা আর্ল তাঁর বই ‘ফিডিং দ্য পিপল : দ্য পলিটিকস অব দ্য পটেটো’তে লিখেছেন, ‘আলু পৃথিবীর সবচেয়ে সফল অভিবাসী। এটা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের শস্য নয়, ভারতের কৃষকও কিন্তু বলতে ছাড়বে না যে এটা আমাদেরই ফসল। যুদ্ধ ছাড়াও ইউরোপীয়দের আলুর জগতে যাওয়ার আরেকটি কারণ—এটি দেখা যায় না, মানে গমের ক্ষেত দেখে কর সংগ্রাহকরা সহজেই ফসলের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারে আর ফসল তোলার সময় ফিরে এসে পারলে পুরোটাই দাবি করে।  কিন্তু আলু থাকে মাটির নিচে। তাই রাজার লোকেরা বেশি সুবিধা করতে পারত না।

প্রতি একরে এত পরিমাণ শস্য আলু বাদে আর কিছু থেকে মেলে না। ১৮ শতকের আয়ারল্যান্ডে ভূমিহীন ছয়জনের একটি পরিবারের জন্য এক একর জমি আলু এবং একটি দুধেল গরু যথেষ্ট ছিল খাদ্যচাহিদা জোগানে। অল্প কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই আলু পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একটি বড় কারণ এর পুষ্টিগুণ। অন্য শস্যের তুলনায় এটি চাষ করাও সহজ। মাটির নিচে থাকায় এটি যুদ্ধের হাত থেকেও বেঁচে যায় সময় সময়।

আলু নিয়ে গবেষণা করে পেরুর প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল পটেটো সেন্টার। লিমার কাছেই এই প্রতিষ্ঠানটি। এখানে হাজার রকমের আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর সিনিয়র কিউরেটর রেনে গোমেজ বলেছেন, ‘লেক টিটিকাকার কাছে আন্দেজের উঁচু জায়গায় আলুর চাষ করা হতো প্রাচীনকালে। সেকালের মানুষ আলু শুকিয়ে রেখে দিত, যা কয়েক বছরেও নষ্ট হতো না।’ ১৫৩২ সালে স্পেনীয়রা পৌঁছায় ইনকা সাম্রাজ্যে। তারা সোনা-রুপার খোঁজে এসেছিল। কিন্তু বুঝতে পারেনি ওসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটা কিছু তারা পেয়েছে, যেটা দুর্ভিক্ষ ঠেকাবে (১৫ থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত ইউরোপে দুর্ভিক্ষ লেগেই থাকত। শুধু ফ্রান্সে ওই সময়ের মধ্যে কম করেও ৪০টি দুর্ভিক্ষের কথা বলেছেন ইতিহাসবিদ ফারনান্দ ব্রুডেল)। তারা আলুকে আটলান্টিক পার করে ইউরোপে নিয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম এইচ ম্যাকনেইল বলেছেন, ইউরোপের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে আলুর ভূমিকা আছে। ১৭৫০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে ইউরোপকে বিশ্বের অনেক জায়গা দখলে এনে দিতে আলুর ভূমিকা আছে। স্পেনীয়রা প্রথম দেখায় গোলগাল কিম্ভূত শস্যটি দেখে অবাক বনেছিল। এটি বীজ থেকে হয় না জেনে আরো বিস্মিত হয়েছিল। ইউরোপীয়রা এমনটি আগে দেখেনি। 

 

কর্তারা যা করেছেন

ইউরোপে আলুর গুরুত্ব কিন্তু রাজা মানে কর্তাব্যক্তিরাই বেশি বুঝেছিলেন, অন্তত সাধারণ প্রজাদের চেয়ে। ইংল্যান্ডে ১৭৯৫ সালে যেমন বোর্ড অব অ্যাগ্রিকালচার আলু চাষে উৎসাহ দিয়ে একটি পুস্তিকা (প্যামফ্লেট) প্রকাশ করেছিল। পরপরই দৈনিক দ্য টাইমস আলুর পক্ষে সম্পাদকীয় ছাপিয়েছিল। নেদারল্যান্ডসেও একই রকম কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। ফ্রান্সের ফ্যাকাল্টি দ্য প্যারিস ১৭৭১ সালে ঘোষণা করেছিল আলু ক্ষতিকারক নয়, বরং উপকারী। প্রুশিয়ার (জার্মানির একাংশ) রাজা ১৭৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ থেকে রেহাই পেতে প্রজাদের আলু চাষের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবু যখন কৃষকরা উৎসাহ দেখাচ্ছিল না, তিনি নিজের একটি ক্ষেতে আলু চাষ করিয়েছিলেন এবং খুব পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন। এ দেখে লোকে ভাবল এখানে নিশ্চয়ই মহার্ঘ কিছু চাষ হচ্ছে। রাজা পাহারা কিছু আলগা করতেই তা চুরি করতে লোক ভিড় করে এবং এটা নিয়ে নিজেদের বাগানে চাষ করে।  আলুকে জনপ্রিয় করতে ফ্রান্সের এক ফার্মাসিস্ট পারমেন্তিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।  সেভেন ইয়ারস ওয়ারের সময় প্রুশিয়ানদের হাতে তিনি বন্দি ছিলেন। বন্দিদশায় তিনি শরীর ভালো রাখতে আলু খেতেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৭৬৩ সাল থেকে বাকি জীবন আলুর জন্য কাজ করে গেছেন। সময়টাও ছিল পারমেন্তিয়ারের পক্ষে।

১৭৭৫ সালে গদিতে বসেছিলেন রাজা ষোড়শ লুই। রুটির দাম তখন অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল বিক্ষোভ। পারমেন্তিয়ার তখন বলে যাচ্ছিলেন, ‘রুটির কথা ভুলে যাও, বেশি করে আলু খাও।’ তিনি কর্তাব্যক্তিদের জন্য একটি ভোজের আয়োজন করেছিলেন, যার সব পদ ছিল আলুর তৈরি। তাঁর প্রেরণায় রাজা কোটের বোতামে গুঁজেছিলেন আলুর ফুল আর সেটিকে কানের দুল করেছিলেন রানি। 

আমাদের দেশে গেল নব্বই দশকে একটি পোস্টার ছাপানো হয়েছিল। তাতে একটি স্লোগান ছিল ‘বেশি করে আলু খাও, ভাতের ওপর চাপ কমাও।’

মন্তব্য