kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

[ বিশাল বাংলা ]

একটি বিরাট ছিদ্রযন্ত্র

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একটি বিরাট ছিদ্রযন্ত্র

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বোরিং মেশিন দিয়ে চট্টগ্রামে চলছে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণের কাজ। দেখে এসেছেন আসিফ সিদ্দিকী

নদীর তলদেশ দিয়ে গাড়ি চলছে। ভাবতেও একটু গোল বাধে। তবে সেটা কিন্তু এখন বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। চট্টগ্রাম কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে তৈরি হচ্ছে দেশের প্রথম টানেল বা সুড়ঙ্গপথ। নাম বঙ্গবন্ধু টানেল। ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল সেই ২০০৮ সালে। তবে কাজ শুরু করতে কিছু দেরিই হয়ে গেল। ২০১৯ সালে শুরু হয়েছে কাজ। নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ বলছে, ৫৭ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। মধ্যিখানে করোনা হানা না দিলে আরো এগিয়ে যেত।

 

অপেক্ষা নয় বেশিদিন

২০২২ সালেই খুলে দেওয়ার কথা আছে। চার লেনের এই টানেলে ৮০ কিলোমিটার গতিতে বছরে ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করবে। টানেলটি হলে কর্ণফুলীর দুই পারই জমে উঠবে। দক্ষিণ এশিয়ায় পানির নিচে যত টানেল আছে তার মধ্যে আমাদেরটিই সবচেয়ে দীর্ঘ।

 

ছিদ্রযন্ত্র বা বোরিং মেশিন

দেখতে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। চারতলা সমান উঁচু। এর নাম টিবিএম বা টানেল বোরিং মেশিন। পতেঙ্গা নেভাল একাডেমির কাছে মাটির ১২ মিটার গভীরে বসানো হয়েছে যন্ত্রটি। নদীর তলদেশে মাটি কেটে চট্টগ্রাম শহরপ্রান্ত থেকে ওপারে আনোয়ারা উপজেলার দিকে ছুটে চলেছে। এর সম্মুখভাগে আছে ধারালো যন্ত্রপাতি। ২৪ ঘণ্টায় এটি ১০ মিটার পথ তৈরি করতে পারে। সেই সঙ্গে এর লেজসদৃশ পেছনভাগ গোল চাকতি বসিয়ে শক্ত দেয়াল তৈরি করছে। কাটা মাটি পাইপ দিয়ে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। নদীর ওপর থেকে কিন্তু বোঝার উপায় নেই কী বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে ভেতরে। পুরো মেশিনটির ওজন দুই হাজার ২০০ টন। এর ব্যাস ১২ মিটারের বেশি। চীনা কম্পানি ‘টানহেং মেকানিক্যাল’ দেশটির জিয়াংসু প্রদেশের কারখানায় টানেল বোরিং মেশিনটি তৈরি করেছে। মেশিনের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্নভাবে জাহাজে করে দেশে আসে; এরপর প্রকল্প ইয়ার্ডে সেটি জোড়া দিতে লাগে দুই মাস। এরপর চলে ট্রায়াল রান। গতবছরের শুরু থেকে এটি দিয়ে খননকাজ শুরু হয়। খননকাজ তদারক করা হচ্ছে প্রকল্প এলাকায় স্থাপিত রিয়েল টাইম রাডারের মাধ্যমে। ফলে কাজের অগ্রগতি ও তদারকি হচ্ছে একেবারে নিখুঁত।

 

সাড়ে তিন কিলোমিটার

টানেলটির দৈর্ঘ্য হবে সাড়ে তিন কিলোমিটার। খননের পর সেই মাপ অনুযায়ী সিমেন্ট-কংক্রিট ও রডের বৃত্তাংশ (সেগমেন্ট) বসবে। এটিও তৈরি হচ্ছে চীনে। জাহাজে করে আনা হচ্ছে দেশে। মোট ২০ হাজার বৃত্তাংশ বসবে। এখন পর্যন্ত ১০ হাজার এসে পৌঁছেছে। করোনার আঘাতে চীনা কারখানা বন্ধ ছিল। এখন আবার কাজ শুরু হয়েছে।

 

একটি শেষ

দুটি অংশে হবে এই টানেল, যার প্রত্যেকটিকে বলা হচ্ছে টিউব। পাশাপাশি থাকছে টিউবগুলো। প্রতি টিউবে গাড়ি চলাচলের জন্য থাকছে দুটি লেন (সড়কের মতো)। টিউব দুটির একটি দিয়ে গাড়ি যাবে, অন্যটি দিয়ে আসবে। প্রতিটি টিউবের প্রস্থ ১০ দশমিক ৮ মিটার (৩৫ দশমিক ৪৩ ফুট)। প্রতিটি লেনের প্রস্থ ৩ দশমিক ৬৬ মিটার। দুটি টিউবের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্ব থাকবে ১১ মিটার (৩৩ ফুট)। নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানান, বাঁ পাশের টিউবটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে গত ৩ আগস্ট। সফলভাবে একটি টিউবের কাজ সম্পন্ন করায় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে টুইটারে পোস্ট দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্‌যাপন করা হয়েছে। কারণ নিজ দেশের বাইরে প্রথম এত বড় টানেল তৈরি করছে চীন। ফলে বিষয়টি তাদের জন্যও আনন্দের।

 

জাহাজ চলাচলে অসুবিধা হবে না

নদীর তলদেশে সর্বোচ্চ ৩৬ মিটার বা ১১৮ ফুট এবং সর্বনিম্ন ১২ মিটার গভীরে নির্মিত হচ্ছে টানেলটি। ফলে কর্ণফুলী নদীতে পণ্যবাহী বিশাল জাহাজ চলাচলে সেটির ব্যাঘাতের কোনো সুযোগ নেই। কারণ এই নদী দিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ মিটার গভীরতা বা ড্রাফটের (জাহাজের যে অংশটি পানিতে ডুবে থাকে) জাহাজ চলাচল করে।

 

জমে উঠছে

কর্ণফুলী নদীর অপর পারে বিনিয়োগ শুরু হয়েছে আগেই। এখন এতে গতি বৃদ্ধি হচ্ছে। সরকার আনোয়ারায় একটি ইকোনমিক জোন স্থাপন করছে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ চায়না ইকোনমিক জোনও হচ্ছে। চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘টানেল নির্মাণের ফলে কর্ণফুলীর ওপার ঘিরে বিনিয়োগের নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হবে। এটিকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল হবে সেখানে। আর এশিয়ান হাইওয়ে ও নতুন সিল্ক রুটে প্রবেশ করবে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক করিডর।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা