kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

[ করোনাকাল ]

অতীত ফিরে এলো

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অতীত ফিরে এলো

সেই সময়। সদরঘাট এলাকা

বয়স এখন পঞ্চাশের কাছে তাঁর। দেখতে গাট্টাগোট্টা। শিল্পী মানুষ। ক্যানভাসে যেমন আঁকেন, আবার ভাস্কর্যও গড়েন। দিন কয়েক আগে শামসুল আরেফিন মিঠুর বাসায় গিয়েছিলেন আবু সালেহ শফিক

শামসুল আরেফিন মিঠু পড়েছেন খুলনা চারুকলায়। তারপর সাভারে এসে একটি পাট কারখানায় নকশাকারের কাজ নিয়েছিলেন। অনেক দিনই ছিলেন সেখানে। চাকরি করতে করতেই খ্যাপ (কমিশনড) মারতেন। যেমন—সুরভি, সুন্দরবন লঞ্চে (ঢাকা-বরিশাল রুটের) ছিল তাঁর আঁকা শখানেক ছবি। তারপর একদিন এক স্থপতির সঙ্গে আলাপ হলো। কথাবার্তায় দুজনের মিলে গেল অনেক কিছুতে। তাঁরা ভাবনা বিনিময় করতে থাকলেন। তখন গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল তৈরি হচ্ছিল। একটা সুইমিংপুল হচ্ছিল হোটেলের আট অথবা নয়তলায়। কর্তৃপক্ষ চাইল পুলধারের দেয়ালে টেরাকোটা বসাতে। খণ্ড খণ্ড সেই পোড়ামাটির ফলকে বাংলার রূপ ফুটে উঠবে। স্থপতি বন্ধুটি যুক্ত ছিলেন ওয়েস্টিন গড়ার কাজে। মিঠুকে তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। মিঠু একটি পরিকল্পনা দাখিল করলেন কর্তৃপক্ষের কাছে। কর্তৃপক্ষ কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে মিঠুকে টেরাকোটা গড়ার দায়িত্ব দিল। সাভারে বংশী নদীর ধারে মিঠু একটি স্টুডিও বানিয়ে নিলেন। সেখানে দিনরাত কাজ চলল। নকশা করা, মাটি জোগাড়, চুলা বানানো, নকশা পোড়ানো ইত্যাদি। মিঠু আধা বিমূর্ত ঢংয়ে গড়লেন কৃষকের ধান কাটার দৃশ্য, শাপলা ফুল ইত্যাদি। তারপর পেলেন গুলশান আর বনানীর হোটেল সিক্স সিজনস আর রেইনট্রিতে টেরাকোটা লাগানোর কাজ। একসময় মিঠু টেরাকোটাশিল্পীই হয়ে উঠলেন। ফুরসত পান না। চাকরিও ছেড়ে দিতে হলো। তবে মাঝেমধ্যে অ্যাক্রিলিকে আঁকেন মাইকেল জ্যাকসন। এই পপতারকা মিঠুর মেজো ছেলে শাফির খুব প্রিয়। ছেলেকে খুশি করতেই বাবার এই প্রয়াস। মাঝখানে বরিশালে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য গড়ার একটা কাজ পেলেন। গড়লেন ৭ই মার্চে ভাষণদানরত বঙ্গবন্ধু। এভাবে চলছিল ঠিকঠাক।

 

হানা দিল করোনা

ছেলে-মেয়েদের স্কুল গেল বন্ধ হয়ে। দেশে ঝুলল তালা। মিঠু বাসায়ই সারা দিন। ছেলেদের ছবি আঁকা শেখান, নয়তো স্ত্রীকে রান্নার কাজে সাহায্য করেন। সেইসঙ্গে একটি খাতা বাঁধাই করলেন। রাত বাড়লে মিঠু বসেন খাতাটি নিয়ে। সেটির নাম দিয়েছেন করোনা ডায়েরি। জলরঙের কথা মনে পড়ল তাঁর। মাধ্যমটি তাঁর অনেক প্রিয়। ছাত্রজীবনে জলরঙের কাজও অনেক করেছেন। জলরঙে তিনি যেন ইমপ্র্রেশনিস্ট। মানে আঁকতে থাকেন অনুভূতি। বংশীর পানি তাঁর ছবিতে ধরা দেয় সংগীতধারা হয়ে। আঁকেন বুড়িগঙ্গার নৌকা বা জাহাজ বা বাড়ির ধারের ধানক্ষেত। কিছু দৃশ্য করোনার আগে বিভিন্ন সময় তিনি মোবাইল ক্যামেরায় ধরে রেখেছিলেন। সেসব ছবি দেখে স্মৃতিটাকে ঝালাই করে নেন। তারপর একসময় মন তাঁকে নিয়ে গেল ছেলেবেলায়। সেই সব বৃষ্টির দিনে, যখন কড়ইগাছে কাক ভিজতে দেখতেন। তারপর মনে পড়ল হরি কাকার কথা। স্বরূপকাঠির বাড়ির ধারের খালে নৌকা ভেড়াতেন হরি কাকা। তিনি ছিলেন জেলে। মাছ ধরে ফিরতেন। কোনো কোনো বিকেলে আবার জাল মেরামত করতে বসতেন। তারপর একবার পলো (মাছ ধরার বাঁশের তৈরি এক ধরনের গোলাকার ফাঁদ) নিয়ে কয়েকজন মাছ-ধরাকে ফিরতে দেখেছিলেন—মনে পড়ে তা-ও। করোনার ডায়েরির পাতার পর পাতা ছবি হয়ে উঠতে লাগল শৈশবের স্মৃতি। আরেকটু বড় হয়ে প্রথমবার যখন বাড়ি থেকে এলেন ঢাকার সদরঘাটে, দেখলেন মুড়ির টিন বাস। সেই বাসটির গড়ন তাঁকে গোড়াতেই টেনেছিল। তিনি অনেকক্ষণ দেখেছিলেন আর গেঁথে নিয়েছিলেন মনে। সেটিই আঁকলেন এই করোনাকালে।

 

আরো অতীতে

এরপর মিঠু ইন্টারনেট থেকে কিছু আলোকচিত্র নামালেন। সবই ঢাকার ছবি। কোনোটি উনিশ শতকের শেষে তোলা, কোনোটি বা বিশ শতকের শুরুতে। একটি ছবিতে যেমন লেখা আছে—‘১৯০০ শতকের প্রথম দিকে সদরঘাট এলাকা’। কে তুলেছিলেন ছবিটি, জানার সুযোগ হয়নি। তবে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে গচ্ছিত আছে। ছবিটির রাস্তায় লোকজন কম। রিকশাই বেশি। একটি ঠেলাগাড়ি আছে। একটি আছে গরুটানা তেলের গাড়ি। দুটি প্রাইভেট কার আর একটি মুড়ির টিন। সুউচ্চ কোনো ভবন নেই রাস্তার ধারে। একটি ভবনের ফাসাদ (সম্মুখভাগ) দেখা যাচ্ছে প্রাচীন রোমের ধাঁচে গড়া।

মিঠু ১১৬ বছর আগের চকবাজারকেও এঁকেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে অনেক টিনের চালাঘর। একটি ঘোড়ার গাড়িও আছে।

এখন পর্যন্ত মিঠুর খাতার অর্ধেক পূর্ণ হয়েছে। ভাবছেন বাকিটা পুরা করতে আবার মনে হয় সময় লেগে যাবে। কারণ নতুন কাজ আসতে শুরু করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা