kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

[ যারা বুঝতে পেরেছিল ]

পৃথিবীর জ্বর আসছে

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পৃথিবীর জ্বর আসছে

ভারতের মানুষ বন্দনা শিবা। প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনের জন্য সারা বিশ্বে সম্মান পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ভাবনা ও বই পাঠ্য। সৈয়দ আশফাকুল হাসান লিখেছেন তাঁকে নিয়ে

বন্দনার বাবা বন পাহারা দিতেন, আর মা কিষানি। ১৯৫২ সালে তাঁর জন্ম। ভারতের দেরাদুনে। পড়েছেন নৈনিতাল ও দেরাদুনের কনভেন্ট স্কুলে (রোমান ক্যাথলিক নানরা পাঠদান করেন)। প্রকৃতির কাছাকাছি বড় হয়েছেন বলেই বুঝি নির্জনতা তাঁর প্রিয়। আর প্রিয় কাজ ভাবনা-চিন্তা করা। প্রকৃতিকে আরো ভালো করে বুঝতে চেয়েই পদার্থবিদ্যায় ভর্তি হয়েছিলেন। এতে স্নাতকোত্তর হয়ে যোগ দেন আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে। আইনস্টাইন তাঁর প্রেরণা।

 

চিন্তায় বাঁক

বন্দনার বোন ডাক্তারি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে। দিনরাত চলছিল অনুশীলন। বোন একদিন জানতে চাইল বিকিরণ বিষয়ে। পারমাণবিক প্রক্রিয়া যেভাবে সম্পন্ন হয় আর তা যেসব কাজে লাগে তা নিয়ে বন্দনার পরিষ্কার ধারণা ছিল। কিন্তু এ থেকে যে বিকিরণ হয় তার ক্ষতির দিকগুলো বিশদ খেয়াল করেননি। তাই ভাবলেন, ‘আমি তো একচোখা বিজ্ঞানী।’ বন্দনা তারপর চাইলেন বিজ্ঞানের সামগ্রিক দিকটা বুঝতে। পিএইচডির জন্য বেছে নিলেন কোয়ান্টাম থিওরি। ১৯৭৭ সালে কানাডায় পাড়ি জমানোর আগে শৈশবের স্মৃতিমাখা জায়গাগুলো ঘুরে বেড়াতে গেলেন। দেখলেন, যেখানে ওকগাছের সারি ছিল, সেখানে এখন আপেলবাগান। আর যে ঝিরিতে তিনি সাঁতার কাটতেন, সেখানে পানি এখন এতই কম যে গোড়ালিও ভেজে না। তিনি বুঝলেন, মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তবে ধাবার চাওয়ালা তাঁকে জানালেন, চিপকু নামের একটি সংগঠন গাছ কাটার বিরোধিতা করে আসছে। সত্তরে শুরু হওয়া আন্দোলনটি অহিংস। যখন কেউ গাছ কাটতে আসে, তখন গাঁয়ের মানুষ দল বেঁধে গাছের গুঁড়ি জাপটে (চিপকে) ধরে থাকে। বন্দনা এরপর শীত বা গ্রীষ্ম—যখনই দেশে আসতেন, চলে যেতেন গাঁয়ে। স্বেচ্ছাসেবী হয়ে চিপকুর সঙ্গে কাজ করতেন। তাঁর পিএইচডি শেষ হয় ১৯৭৯ সালে।

 

সব কিছুই সম্পর্কিত

কোয়ান্টাম থিওরি বলে, পৃথিবীর সব কিছুই একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। শক্তির রূপান্তরের মাধ্যমে কেবল অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ১৯৮২ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘পাহাড়ের রানিকে উলঙ্গ করে ফেলা হচ্ছে।’ কর্মকর্তারা এতে নড়েচড়ে বসেছিলেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয় বন্দনা শিবাকে একটি চুনাপাথরখনির (বিরাট এলাকাজুড়ে) অবস্থা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়। প্রাথমিকভাবে তিনি দেখলেন পানির সমস্যা। আরেকটু খতিয়ে দেখলেন, পানির উৎস আর খনিটি একই স্তরে বিদ্যমান। তাই খনির কাজের জন্য পানির প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। তাতে স্থানীয়দের পানির সমস্যা হচ্ছে। তিনি পরামর্শপত্রে অবিলম্বে খননকাজ বন্ধ করতে বললেন। তিনি প্রতীকীভাবে বললেন, খননকাজে যদি ১ টাকা লাভ হয় তাহলে পানির সংকটে ক্ষতি হচ্ছে ১০ টাকা। তিনি দেখালেন সংবিধানে লেখা আছে, যদি ব্যবসার কারণে জীবনব্যবস্থা ব্যাহত হয় তাহলে সেই ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। সুখের কথা, শেষমেশ চুনাপাথরখনির খননকাজ বন্ধ হয়।

 

তারপর পরিবেশবিজ্ঞানী

চুনাপাথরখনি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই মূলত বন্দনা পরিবেশবিজ্ঞানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ওই বছরই তিনি একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, পরে যা রিসার্চ ফাউন্ডেশন ফর সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড ইকোলজি নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮৮ সালে বন্দনা ভারতের পরিবেশবাদীদের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এই বছরই তাঁর বই ‘স্টেয়িং অ্যালাইভ : উইমেন, ইকোলজি অ্যান্ড সারভাইভিং ইন ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত হয়।

 

নব্বইয়ের দশক

১৯৯০ সালে বন্দনা নারী ও চাষাবাদ বিষয়ক একটি রিপোর্ট জমা দেন। ১৯৯১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নয়াবীজ। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি জৈব চাষ পদ্ধতি, কৃষকের অধিকার, বীজ তৈরি ও সুরক্ষা পদ্ধতি নিয়েও কাজ করতে থাকে নয়াবীজ। এই আন্দোলন এরই মধ্যে ভারতজুড়ে ১২২টি সামাজিক বীজভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। প্রায় তিন হাজার প্রজাতির ধান সুরক্ষিত হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া ভিত্তিক চাষাবাদ থেকে কৃষকদের সরিয়ে আনার চেষ্টা করছে নয়াবীজ। গেল দুই দশকে নয়াবীজ প্রায় ৯ লাখ কৃষককে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের উপায় জানিয়েছে। তারা বীজে, খাদ্যে স্বনির্ভরতার ব্যাপারগুলো হাতে-কলমে শিখেছে। টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার ব্যাপারেও জেনেছে। হাতে-কলমে শিক্ষা লাভ করেছে। বন্দনা ১৯৯৩ সালে মারিয়া মাইসের সঙ্গে মিলে ‘ইকোফেমিনিজম : রিকানেক্ট আ ডিভাইডেড ওয়ার’ লিখলেন। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতিবাদী নারী আন্দোলনের একজন অগ্রবর্তী সৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর ‘মনোকালচারস অব দ্য মাইন্ড : বায়োডাইভারসিটি, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার’ বইটিও ওই বছরেরই। তিনি একই বছর রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন। বিশ্বের চলমান সংকটের যাঁরা উত্তর খুঁজে বেড়ান, সুইডেন থেকে তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। যা হোক, তিনি ভোগবাদী বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ১৯৯৭ সালে ‘বায়োপাইরেসি : দ্য প্লান্ডার অব নেচার অ্যান্ড নলেজ’ নামের বই লিখে। ১৯৯৯ সালে তিনি মনসান্টোর (যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাগ্রোকেমিক্যাল কম্পানি) নিয়ম ও পেটেন্ট দাবিকে অবাস্তব ও অযৌক্তিক দাবি করেন। সেই সঙ্গে বলেন, দেশে দেশে কৃষকদের জিন প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে তাদের স্বাধীনতা হরণ করছে মনসান্টো। এই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রায় দুই বছর প্রাণহানির হুমকিতে ছিলেন। ১৯৯৮ সালে নয়াবীজ যুক্তরাষ্ট্রের রাইসটেক কম্পানির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ২০০১ সালে বাসমতি চালকে পেটেন্ট অবমুক্ত করতে সমর্থ হয়।

 

তিনি ভয় পাননি

২০০০ সালে বন্দনা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ভাষণ দেন। ২০০১ সালে লেখেন ‘ওয়াটার ওয়ার’ নামের বই।  ২০০৩ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে পরিবেশের নায়ক আখ্যা দেয়। একই সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম তাঁর নামে নানা বিষোদ্গার করেছে। ১৯৯৯ সালে উড়িষ্যায় সাইক্লোন আক্রান্তদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ত্রাণ সহায়তা দেয়। বন্দনা দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ফুড পাঠিয়ে আমাদের গিনিপিগ বানিয়েছে।’ পাল্টাপাল্টি নিউ ইয়র্কারের সাংবাদিক লেখেন, ‘এই খাদ্য যুক্তরাষ্ট্রের লোকদেরও দেওয়া হয়েছে।’ বন্দনা এটিকে দুষ্ট তথ্য আখ্যা দেন। বন্দনাকে নিয়ে বা তাঁর অংশগ্রহণে অনেকগুলো প্রামাণ্য ও তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে; যেমন—‘ফ্রিডম অ্যাহেড’, ‘নরমাল ইজ ওভার’, ‘দিস ইজ হোয়াট ডেমোক্রেসি লুক লাইক’ ইত্যাদি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা